আমি জন্মেছিলাম এক মফসসলের জমিদারের চাকরের ঘরে। কিন্তু ভাগ্যের কোন বিধানে আমি আজকে আবার রাজরানি হয়েছি। আমারই সঙ্গে কত বেগম ছিল চেহেল্-সুতুনে। গুলসন বেগম, পেশমন বেগম, তক্কি বেগম, বব্বু বেগম, নানিবেগম, লুৎফুন্নিসা বেগম। তারা সব কোথায় গেল, আর আমিই বা কোথায়? তখন টাকা ছিল না, এখন টাকা হয়েছে..।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে মেরী বেগম চিৎকার করে উঠত। বলত–কেন তুমি খুন করতে গেলে নবাবকে? নবাব তোমার কী ক্ষতিটা করেছিল? তাকে পৃথিবীর এককোণে একটু বাঁচতে দিলে তোমাদের কোম্পানির এমন কী সর্বনাশটা হত?
একবার তো কোনও উত্তর নেই, তাই রবার্ট ক্লাইভ চুপ করে থাকত। কোনও জবাব দিত না। আর জবাবই বা দেবে কী? ক্লাইভ নিজেই কি জানত অমন হবে? নিজেই কি জানত মানুষের হিংসা অমন করে তার প্রতিশোধের পিপাসা পরিতৃপ্ত করবে।
আর অমন করে প্রতিশোধের পিপাসা পরিতৃপ্ত না হলে মরালীকেই কি এখানে এসে এই ক্লাইভের বাগানবাড়িতে বেগম মেরী বিশ্বাস নাম নিতে হত। না কান্তকেই অমন করে…
কিন্তু কান্তর কথা ভুলে যাওয়াই ভাল। তার কথা এখন থাক।
আর শুধু কান্তই নয়, কান্ত, ঘসেটি বেগম, আমিনা বেগম, নানিবেগমসাহেবা, সকলের কথাই এখন থাক। ইতিহাসের যখন বিপ্লব ঘটে, তখন কে আপন কে পর, কে দূর কে নিকট, কে আত্মীয় কে শত্রু, সে বিচার থাকে না। নির্বিচারে মানুষের প্রতিশোধের স্পৃহাকে চরিতার্থ করেই যে সে কৃতার্থ হয়। কান্না পরের কথা, অনুতাপ পরের কথা, সকলের আগে ইচ্ছার পরিপূরণ। ইচ্ছা পরিপূরণ করেই ইতিহাস তার গতিপথ সুগম করে তোলে।
নইলে ঠিক সেই ভোরবেলাই বা হাতিয়াগড়ের ডিহিদার রেজা আলি মুর্শিদাবাদে আসবে কেন?
সেই ২৪ জুন ভোরবেলা। সারা শহরে যখন হইচই হট্টগোল চলেছে, যখন রাস্তায় রাস্তায় নোকজন বেরিয়ে পড়েছে, যখন সবাই সবাইকে জিজ্ঞেস করছে ক্যা হুয়া, ঠিক সেই সময়েই কি আসতে হয় ডিহিদার রেজা আলিকে?
রেজা আলি এলেমদার লোক। সোজা আঙুলে যে ঘি বেরোয় না, এটা রেজা আলির মতো সেযুগে আর কেউ অমন করে জানত না। নোকরিতে সবাই-ই উন্নতি চায়। খোশামোদ করে থোক, কাজ দেখিয়ে হোক, পায়ে ধরে ভিক্ষে করে থোক, চাকরিতে উন্নতি হয়ই। কিন্তু যে-উপায়টা অত্যন্ত অব্যর্থ সেই উপায়টাই রেজা আলি সাহেব চিরকাল অবলম্বন করে এসেছে। সেটা হচ্ছে ওপরওয়ালাকে খুশি করা। ওপরওয়ালাকে খুশি করতে হলে জানা চাই ওপরওয়ালার দুর্বলতাটা কী। সেই দুর্বলতার জায়গাটার সন্ধান জানতে পারলে আর চাই কী? সেইখানটায় সুড়সুড়ি দিলেই তোমার কার্য সিদ্ধি!
মেহেদি নেসারই হল রেজা আলি সাহেবের ওপরওয়ালা। আর সেই মেহেদি নেসারের দুর্বলতার জায়গাটা হল মেয়েমানুষপ্রীতি।
হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের দ্বিতীয় পক্ষের রানিবিবিকে চেহেল্-সুতুনে পাঠিয়ে দিয়ে রেজা আলি ভেবেছিল এবার উন্নতি একটা অবধারিত।
কিন্তু দিন যায় মাস যায় বছর যায়, উন্নতির কোনও সাড়াশব্দ নেই।
শেষকালে টনক নড়ল। নিজামতের এত বড় একটা উপকার করল রেজা আলি, অথচ উন্নতি হল তার। তখন মনে হল নিশ্চয়ই কোথাও কিছু গোলমাল আছে। তখন থেকেই লেগে-পড়ে ছিল রেজা আলি। হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির আশেপাশে চর লাগল। চর কিছু করতে পারলে না। অনেক ভেবে ভেবে অনেক খোঁজ করে ব্যাপারটা একদিন জলের মতন পরিষ্কার হয়ে গেল। রাজবাড়িতে রানিবিবি নেই। তা হলে শোভারামের মেয়েটা কোথায় গেল? শোভারামের মেয়েটাকেই যদি বদল করে দিয়ে থাকে তো রানিবিবি কোথায় গেল? কোথায় তাকে লুকিয়ে রাখা হল।
এই ভাবনাই দিনরাত পাগল করে তুলল রেজা আলিকে।
তারপর একদিন পাগলাটার সঙ্গে দেখা।
পাগলা উদ্ধব দাস। পাগলা মানুষ, গান গায় আর দুটি খায়। সেই উদ্ধব দাসই খবরটা দিলে।
রেজা আলি এমনিতে কারও খাতির করে না। কিন্তু উদ্ধব দাসকে খুব খাতির করলে সেদিন। পান জর্দা কিমাম দিলে।
জিজ্ঞেস করলে তুমি ঠিক জানো?
উদ্ধব দাস বললে–আমি ঠিক জানব না তো কে জানবে প্রভু?
রেজা আলি জিজ্ঞেস করলে–তারপর?
উদ্ধব দাস বললে–তারপর প্রভু, আমার বউ আমাকে তাড়িয়ে দিলে
তোমার নিজের বউ তোমাকে তাড়িয়ে দিলে?
আজ্ঞে, আমার নিজের বউ আমাকে তাড়াবে কেন? আমার বউয়ের সঙ্গে তো আমাকে দেখাই করতে দিলে না মাগিটা। সাহেব কত করে বললে–মাগিটাকে। ক্লাইভসাহেব যে লোকটা খুব ভাল প্রভু।
সাহেব দেখা করতে দিতে চেয়েছিল?
হ্যাঁ প্রভু, মাগিটাই যে সব্বনাশী
সে মাগিটা কে?
আজ্ঞে প্রভু, সে আমার বউয়ের ঝিউড়ি। আমার বউকে দেখাশোনা করে। মাগিটা খাভারনি মেয়েমানুষ! আমাকে দেখলে মারতে আসে তেড়ে!
কী রকম চেহারা বলো দিকিনি?
উদ্ধব দাস যে-চেহারার বর্ণনা দিলে তার সঙ্গে হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির ঝি দুর্গার চেহারা অবিকল মিলে গেল।
রেজা আলির চোখ খুলে গেল সেইদিনই। এতদিন ডিহিদারি করছে রেজা আলি, অথচ এমন বোকা কখনও বনেনি। সোজা চর পাঠালে কলকাতার বাগবাজারে পেরিন সাহেবের বাগানে। সেখান থেকে চর সন্ধান নিয়ে এসে জানাল যে কেউ নেই সেখানে। সবাই চলে গেছে। ক্লাইভ সাহেবও ফৌজটৌজ নিয়ে যুদ্ধ করতে গেছে নবদ্বীপের দিকে।
তারপর অনেক হয়রানি গেল কয়েকদিন। শেষকালে খবর পাওয়া গেল কৃষ্ণনগর থেকে।
অতিথিশালার ভিড়ের মধ্যে রেজা আলির চর হিন্দু সেজে উঠেছিল। সেখানে দেখল, উদ্ধব দাস রয়েছে। আর একদিন থাকতে থাকতেই খবর পেয়ে গেল, রাজবাড়ির অন্দরেও কোথা থেকে দু’জন কোথাকার জেনানা এসেছে। তাদের জন্যে আলাদা খাবার-থাকবার বন্দোবস্ত হয়েছে। ক্লাইভ সাহেব যেদিন যুদ্ধ করতে নবদ্বীপের দিকে গেছে সেইদিনই জেনানা দু’জন এসে রাজবাড়িতে উঠেছে। রাজবাড়ির রসুইখানা থেকেই সব খবর আদায় করে চর খবরটা দিলে রেজা আলি সাহেবকে।
