মিরজাফর আলি সাহেবের খবর কী? তার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
হ্যাঁ কর্নেল। এই লেটারটা দিয়েছে আপনাকে বলে একটা চিঠি এগিয়ে দিলে ক্লাইভের দিকে। দিয়ে বললে–মিরজাফর আলি এখনই নবাবের সঙ্গে দেখা করতে গেল–
ক্লাইভ তাড়াতাড়ি এনভেলাপটা খুলে চিঠিটা পড়তে লাগল।
ডিয়ার কর্নেল, তুমি শুনে খুশি হবে, বৃষ্টিতে আমাদের গোলাবারুদ সব ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। এখন ওগুলো না শুকোলে আর গুলি ছোঁড়া যাবে না। সব অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। তোমাকে আমি যে কথা দিয়েছিলাম সে কথা বর্ণে বর্ণে রাখছি। আমি, ইয়ার লুৎফ খা, কিংবা রাজা দুর্লভরাম কেউই তোমাদের ফৌজের ওপর ফায়ার করিনি, নবাব পাছে সন্দেহ করে তাই আমগাছগুলোর ডালের দিকে লক্ষ করে কয়েকটা গুলি ছুঁড়েছি। তোমাদের কুড়িজন সেপাই মারা গেছে শুনে খুব দুঃখিত। ল্যাসিংটনও মারা গেছে শুনলাম। কিন্তু আমাদের আরও অনেক বেশি লোক মারা গেছে। জখমও হয়েছে অনেক। তুমি শুনে খুশি হবে আমাদের মিরমদন মারা গেছে তোমাদের গুলিতে। খুব সুখবর। আমি আমার ফৌজি সেপাইদের এদিক-ওদিক নড়িয়েছি, নইলে নবাবের সন্দেহ হত। চারদিকের এই অবস্থার মধ্যে নবাব খুব ভয় পেয়ে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে। মিরমদন মারা যাবার পর এখন নবাবের আমি ছাড়া আর কোনও গতিই নেই। দেখি আমি কী করতে পারি। ইতি–
ক্লাইভ চিঠিটা ভাজ করে বললে–লোকটা দেখছি রিয়্যাল স্কাউড্রেল, কথা রাখছে
পাশে আয়ার কুট দাঁড়িয়ে ছিল। সে অবাক হয়ে গেছে।
বললে–রিয়্যাল স্কাউড্রেল বলছ কেন কর্নেল?
রিয়্যাল স্কাউড্রেল নয়।নবাব যতগুলো লোকের ওপর নির্ভর করছে সবগুলো স্কাউড্রেল। নবাবের ভাগটাই খারাপ দেখছি। সবাই, সবাই নবাবের এগেনস্টে! ওই জগৎশেঠ থেকে শুরু করে উমিচাঁদ, মিরজাফর, সবাই। ইন্ডিয়ার সত্যিই ব্যাড লাক।
কুট তবু বুঝতে পারলে না। বললে–কিন্তু তাতে তো আমাদেরই ভাল কর্নেল। তা হলে তো আমরাই জিতব
ক্লাইভ হাসল শুধু কথাটা শুনে। কিছু বললে–না মুখে। নিশ্চয়ই আমাদের ভাল। তা হলে তো আমরাই জিতব! তুমি, আমি, আমরা সবাই যা আছি তাই-ই থাকব কুট। কেউই জিতবে না। জিতবে শুধু কোম্পানি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররাই শুধু জিতবে। তারা মোটা ডিভিডেন্ড পাবে। তারা বাড়ি করবে, গাড়ি চড়বে, মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করবে। আর আমরা বউ-ছেলেমেয়ে ফ্যামিলি সব দূরে রেখে এখানে এই মশা-মাছি-জঙ্গল সাপ সব নিয়ে কেমন করে আরও ভাল করে মানুষ খুন করা যায় তারই মহড়া দেব। আর দরকার হলে ল্যাসিংটনের মতো বেঘোরে মরব।
ক্লাইভ সেখান থেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল-ফায়ার-ফায়ার
.
এ-ঘটনার বহুদিন পরে কর্নেল ক্লাইভ বিলেতে ফিরে গিয়ে এই সব কথাই ভুলতে চেষ্টা করত। সবাই জানত লর্ড ক্লাইভ শুধু লর্ডই নয়, ইংলন্ডের সবচেয়ে বড়লোক। বিরাট টাকার মালিক, বিরাট খেতাব, বিরাট সম্পত্তি, প্রতিপত্তি, প্রতিষ্ঠা।
স্ত্রী এসে জিজ্ঞেস করত–কী ভাবছ? হঠাৎ যেন চমক ভেঙে যেত লর্ড ক্লাইভের। বেঙ্গলের সেই ব্যাটল-ফিল্ডের কথা মনে পড়ত। মনে পড়ত নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার কথা। মিরজাফর, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, নবকৃষ্ণের কথা। আর মনে পড়ত বেগম মেরী বিশ্বাসের কথা।
তাস খেলবে?
তাস?
এক একদিন দমদমার বাগানবাড়িতে বারান্দায় বসে তাসও খেলেছে লর্ড। সামান্য একটা মেয়ে। বেগম মেরী বিশ্বাস তার সব লাইফ হিস্ট্রিটা বলেছিল লর্ড ক্লাইভকে। চারদিকে ঝিঁঝিপোকার ডাক। দুরে মিলিটারির আর্মি ব্যারাক। হাতি-ঘোড়া-উট। তার ওপাশে আর্মির লোকেরা মদ খেয়ে হইহই করছে।
হাতি-উটের পিলখানা পেরিয়ে কেবল বড় বড় গাছ। তাস খেলতে খেলতে একবার ওইদিকে চোখ পড়লে দেখতে পেত একটা কৃষ্ণচূড়া গাছে অসংখ্য লাল ফুল ধরেছে। বেঙ্গলিরা বলত কৃষ্ণচূড়া ইংরেজরা বলত-ক্লেম অব দ্য ফরেস্ট। বনের আগুন। বনের আগুনের শিখা। ক্লাইভের নিজের জীবনের আগুনই যেন সহ-শিখা হয়ে ওই গাছটার মাথায় ডালে ডালে জ্বলে উঠত। আর ইন্ডিয়া? ইন্ডিয়াও তখন আগুন। সমস্ত ইন্ডিয়াতেই তখন ফ্লেম অব দ্য ফরেস্ট।নবাব সিরাজউদ্দৌলা, তারপর মিরজাফর আলি, তারপর মিরকাশিম…
তাস খেলবে?
ক্লাইভ বললে–না, এখন আর ভাল লাগছে না তাস খেলতে
বেগম মেরী বিশ্বাসও বলত-না, এখন আর ভাল লাগছে না তাস খেলতে
তারপর সোজা সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে চেয়ে থাকত বেগম মেরী বিশ্বাস। এখন তো আর কোনও ভয় নেই। তখন কোনও ভয়ই আর ছিল না মরালীর। একদিন কোন এক দুর্যোগের লগ্নে ইন্ডিয়ায় গিয়ে হাজির হয়েছিল রবার্ট ক্লাইভ, আর সমস্ত দেশটা লন্ডভন্ড করে দিয়ে তবে যেন তার নিবৃত্তি হয়েছিল।
বেগম মেরী বিশ্বাস এক-একদিন লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদত।
কী হল? কাঁদছ কেন?
না, কিছু না বলে বেগম মেরি বিশ্বাস চোখ দুটো মুছে ফেলত নিজের শাড়ি দিয়ে।
কিন্তু ক্লাইভ জানত সব। এক-একটা করে প্রত্যেকটা কাহিনী যেমন উদ্ধব দাস শুনত, তেমনি ক্লাইভও শুনত। উদ্ধব দাস কাব্য লিখবে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের মতো। আর ক্লাইভ? রবার্ট ক্লাইভ তখন বলতে গেলে একাই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব-সুবাদার–ফৌজদার সবকিছু। রবার্ট ক্লাইভের এক হুকুমে তখন রাজ্য ওঠে আর রাজ্য পড়ে। কিন্তু সেইক্লাইভ সাহেবের বিধাতাপুরুষেরও তখন এমন ক্ষমতা নেই যে বেগম মেরী বিশ্বাসের দুঃখ ঘোচায়।
