কে যুদ্ধ করবে না? কে? কারা?
হাতের পিস্তলটা বাগিয়ে নিয়ে সামনের দিকে উঁচু করে বললে–কে? কারা?
আশেপাশে, সামনে যারা ছিল তারা সবাই স্থাণুর মতো চুপ হয়ে গেল। আর কারও মুখে কথা নেই।
বৃষ্টি হয়েছে তাতে কী হয়েছে? বৃষ্টিতে ভিজলে মানুষ মরে যায়? আর মরতেই তো সবাই ফাইট করতে এসেছ তোমরা। কেউ বাঁচবার জন্যে যুদ্ধ করতে আসে? একদিন তো মরতেই হবে। কে চিরকাল বেঁচে থাকতে এসেছে পৃথিবীতে? কে? নাম বলল। আমি তাদের গুলি করে মারব। নাম বলো? তুমি? তুমি? ইউ?
কেউ উত্তর দেয় না।
ক্লাইভ আবার বলতে লাগল–সবাই লেকের ধারে যাও, ইন এ বডি গিয়ে ট্রেঞ্চ খোঁড়ো, ওখান থেকে এনিমি লাইনের দিকে ফায়ার করো। যাও-কুইক
আর অর্ডারের সঙ্গে সঙ্গে সেপাইগুলো যেন মেশিনের মতো খালের ধারে চলে গেল। সেখান থেকে সবাই নবাবি ফৌজের দিকে ফায়ার করতে লাগল।
ফায়ার, ফায়ার
ক্লাইভের শরীরের ভেতরে তখন যেন দশটা ক্লাইভ ঢুকে পড়েছে। একটা মানুষের বুকে এত সাহসও থাকে। একটু ভয়-ডরও নেই মানুষটার। একলা এতগুলো সেপাইয়ের সমানে মওড়া নিয়েছে। সকাল থেকে খাওয়ার সময় পায়নি। বৃষ্টিতে ভিজেছে। সর্দিকাশির ভয়ও কি নেই?
পাশেই আয়ার কুট দাঁড়িয়ে ছিল।
ক্লাইভ জিজ্ঞেস করলে জেনারেল ল’ কখন আসছে? কিছু খবর পেয়েছ?
না কর্নেল!
যদি জেনারেল ল’ এসে পড়ে তো তুমি মরবার জন্যে তৈরি থাকবে। এখান থেকে এক পা কেউ পেছোতে পারবে না। নবাবের হাতে বন্দি হওয়ার চেয়ে আমরা বরং সবাই মরব, সেও ভাল। কিন্তু কোম্পানির নামে ডিসগ্রেস দিতে দেব না–ফায়ারফায়ার–
হঠাৎ নজরে পড়ল দূরে নবাবের আর্মি ডানদিকে সরে যাচ্ছে। কমান্ডার মিরজাফরের ফৌজ ওটা।
কুট, ওরা ওদিকে যাচ্ছে কেন? কী মতলব?
আয়ার কুটও বুঝতে পারছে না। হতবাক হয়ে দেখতে লাগল সেই দিকে।
ওরা কি আমাদের এনসার্কেল করতে আসছে নাকি?
কুট বললে–না কর্নেল, তা কী করে হয়? মিরজাফর যে আমাদের ওয়ার্ড দিয়েছে। ও তো আমাদের বিট্রে করবে না
ক্লাইভ বললে–কিছু বলা যায় না,নবাবের ওমরাহদের বিশ্বাস নেই। ওরা সব করতে পারে। ওরা ওদের গডকে পর্যন্ত বিট্রে করতে পারে, বি কেয়ারফুল!
কিন্তু না, মিরজাফরের আমি এক ফার্লং সরে গিয়ে আবার হল্ট করল। কী মতলব কে জানে। গোড়া থেকেই ক্লাইভ ওদের সন্দেহ করে এসেছিল। ওদের কথার ওপর নির্ভর করে এত দূরে এসে এত ঝুঁকি নেবার মানুষ নয় ক্লাইভ।
ক্লাইভ বললে–আই অ্যাম রেডি–ওরা যদি আমাদের ঘিরে ফেলে তো আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব ওদের ওপর।
কুট বললে–কিন্তু ওদের সঙ্গে আমরা পারব কেন কর্নেল? ওদের আর্মি আর আমাদের আর্মি? আমাদের তো গুঁড়িয়ে পিষে ফেলবে।
যুদ্ধ কি নাম্বার দিয়ে হয় কুট?
আয়ার কুট ক্লাইভের কথাটা বুঝতে পারলে না। ক্লাইভ আবার বললে–নাম্বারই যদি আসল হত তো আমি সেন্ট ফোর্ট ডেভিড জয় করতে পারতুম না। যুদ্ধ জেতে কূটনীতি দিয়ে, ডিপ্লোমেসি দিয়ে। আমি যদি এ-যুদ্ধ না জিততে পারি তো এতদিন মিছিমিছি বেঙ্গলে এসেছি, এতদিন মিছিমিছি বেঙ্গলিদের সঙ্গে মিশেছি–
কিন্তু কর্নেল, বাঙালিদের বিশ্বাস করা উচিত নয়, তারা লায়ার!
ক্লাইভ বললে–তোক লায়ার, ইউরোপিয়ানরা লায়ার নয়? সবাই ভাল? ক্লাইমেটের জন্যে দেশে দেশে মানুষ বদলায়। সে বাইরের বদলানো, ভেতরটা সবার এক। গুলি করলে ওদের গা দিয়েও রক্ত পড়ে, আমাদেরও রক্ত পড়ে। ওদের মায়েরা ছেলেদের আমাদের মায়ের মতোই ভালবাসে। ওরাও কূটনীতি জানে, আমরাও জানি। নবাব কি ডিপ্লোমেসি জানে না বলতে চাও? ওই যে ওরা ফায়ার করছে না, কেন করছে না?
কুট বললে–কারণ জেনারেলরা নবাবের এগেনস্টে–
ভুল, ভুল। সব তোমার ভুল। নবাব চায় ওয়ারটা প্রোলংকরতে। যুদ্ধটা যাতে আরও বেশিদিন টেনে নিয়ে যেতে পারে সেই চেষ্টা করছে। ওদের আর্মি আছে, ওদের মেটিরিয়্যালস আছে, ওদের ফুড আছে, আর ওদেরই কাস্ট্রি এটা। বেশিদিন যুদ্ধ চললেই তো নবাবের লাভ। ততদিনে জেনারেল ল’ এসে যাচ্ছে
কিন্তু কর্নেল, মিরজাফর আলির কী মতলব তা তো বুঝতে পারছি না। ও কি এমন করে আমাদের কথা দিয়ে এখন কথার খিলাফ করবে?
কর্নেল বললে–কূটনীতিতে কথার খিলাফ বলে কোনও কথা নেই। যখন যেমন সিচুয়েশান, যখন যেমন অবস্থা, সেইভাবে কাজ করাই ডিপ্লোমেসি। কিন্তু এখন দেখতে হবে, ও বড় ডিপ্লোম্যাট না আমি বড় ডিপ্লোম্যাট। মিরজাফরও নিজের স্বার্থ দেখছে, আমিও আমার স্বার্থ দেখছি, এখন কে কূটনীতিতে জেতে তাই দেখতে হবে
হঠাৎ ফ্লেচার এসে হাজির হয়েছে।
কী খবর, ফ্লেচার?
ফ্লেচার বললে–মিরমদন মারা যাবার পর থেকে নবাব খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছে
ভেরি গুড। জেনারেলরা কী বলছে?
মোহনলাল বলছে এখনই সকলকে একসঙ্গে ফাইট করতে। রাজা দুর্লভরাম, ইয়ার লুৎফ খাঁ আর মিরজাফর আলি ফায়ার করছে না বলে নবাবের কাছে কমপ্লেন করেছে।
তারপর? সেই সোনার কলকেটা পাওয়া গেল?
না কর্নেল। নবাবের ফ্রেন্ড খিদমদগারদের সবাইকে বেত মারবার অর্ডার দিয়েছিল, নবাব গিয়ে সে অর্ডার বাতিল করে দিয়েছে।
কেন?
নবাব ভয় পেয়ে গেছে। বলছে এ-সময়ে বেত মারলে ওরা রিভোল্ট করতে পারে। আমাদের আমিকে হারিয়ে তারপরে সবাইকে বেত মারা হবে।
একথা তুমি জানলে কী করে?
নবারে ফ্রেন্ড ইয়ারজান সব কথা মিরজাফর আলিকে বলে দিয়েছে। মিরজাফর আলি সাহেবই আমাকে এসব কথা জালে।
