ইয়ারজান বললে–আপনি ভয় পাবেন একথা কে বিশ্বাস করবে আলি জাঁহা।
আচ্ছা, ফিরিঙ্গি কর্নেল ক্লাইভ আমাকে ভয় করে?
নিশ্চয় ভয় করে আলি জাঁহা।
কিন্তু তা হলে কোন সাহসে আমার সঙ্গে লড়াই করতে এসেছে সে? আমার মিরবকশি তো ইচ্ছে করলেই ওদের গুঁড়ো করে দিতে পারে।
ইয়ারজান বললে–বোধহয় ওর মরবার সাধ হয়েছে আলি জাঁহা।
মির্জা মহম্মদ হা হা করে হেসে উঠল। কথাটা খুব ভাল লেগেছে নবাবের। বললে–খুব ভাল কথা বলেছ ইয়ার, খুব ভাল কথা বলেছ!
তারপর একটু থেমে বললে–কিন্তু কেউ কি সাধ করে মরতে চায় দুনিয়ায়? এমন কেউ আছে যার সাধ হয় মরতে?
কেন হবে না আলি জাঁহা। ফিরিঙ্গি কর্নেলটা তিনবার মরতে গিয়েছিল পিস্তল দিয়ে, আমি শুনেছি।
সেকী?
মির্জা মহম্মদের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। মরতে গিয়েছিল? আত্মঘাতী হতে গিয়েছিল? কেন?
তা জানি না আলি জাঁহা।
কথাটা শুনে পর্যন্ত মির্জা মহম্মদের মুখটা যেন গম্ভীর হয়ে গেছে। যে-লোক নিজের হাতে নিজে মরতে যায়, সে তো সোজা লোক নয়। সে তো সব পারে।
আচ্ছা ইয়ারজান, আগে তুমি ওকথাটা বলোনি কেন?
কোন কথাটা আলি জাঁহা?
ওই যে ফিরিঙ্গি কর্নেল বাচ্চা তিনবার গুলি করে আত্মহত্যা করতে গিয়েছল? আগে জানলে আমি অন্য ব্যবস্থা করতাম। ওরা খুব খারাপ লোক হয় জানো ইয়ারজান, যারা আত্মহত্যা করতে যায়
জানি আলি জাঁহা!
আমি কিন্তু কখনও আত্মহত্যা করব না ইয়ারজান। যারা আত্মহত্যা করে তারা হেরে যায়, অ জানো তুমি? আমি আলিবর্দি খাঁ’র মতো জিন্দগির লড়াই করে তবে মরব, তার আগে মরব না আমি। আমি যখন বুড়ো হব, যখন আলিবর্দি খাঁর মতো বুড়ো হব, তখনও লড়াই করব। লড়াই করতে করতে আমি মরব
হঠাৎ আবার মিরজাফরের কথাটা মনে পড়ে গেল।
আচ্ছা, ইয়ারজান, তুমি একবার যাও তো, তুমি নিজে একবার মিরজাফর আলির কাছে যাও তো। আমি যে তাকে গালাগালি দিয়েছি তা যেন বোলো না। গিয়ে বলো–মিরমদন মারা গেছে, তাইনবাব একবার আপনাকে ডাকছে–যাও, নেয়ামতকে দিয়ে ডেকেছি কিনা, তাই হয়তো আসছে না আর খবর নিয়ে এসো তো জেনারেল ল’ কখন আসছে সে-খবর এসেছে কিনা
সেই বৃষ্টির মধ্যেই ইয়ারজান বাইরে বেরিয়ে গেল। ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে। সামনেই মোহনলালের ফৌজ, তার সামনে সিনফ্রে। আর আরও খানিক এগিয়ে, রাজা দুর্লভরাম, ইয়ার লুঙ্ক খাঁ, আর তারও ওদিকে একেবারে শেষ প্রান্তে মিরজাফর আলির ফৌজ। বৃষ্টিতে সমস্ত ছত্রখান হয়ে গেছে। ফিরিঙ্গিদের দিক থেকে কামান ছোঁড়া খানিকক্ষণের জন্যে বন্ধ আছে। হাতির পিঠের ওপর বসে আছে। মিরজাফর।
ইয়ার জানকে দেখে মিরজাফর সাহেব হাতির পিঠ থেকে নেমে এল।
আলিসাহেব, আমাকে আবার নবাব পাঠালে আপনার কাছে!
মিরজাফর আলি সাহেব বললে–সে তো বুঝতে পাচ্ছি। মিরমদনটা তো খতম হয়েছে। আমাকে আবার ডাকছে কেন?
নবাব খুব ভয় পেয়ে গেছে আলিসাহেব, তাই আপনার সঙ্গে একটু কথা বলে সাহস পেতে চায়।
কী কথা হচ্ছিল এতক্ষণ?
ইয়ারজান বললে–কেবল মরার কথা
মিরজাফর সাহেব শুনে অবাক হয়ে গেল।
মরার কথা মানে?
ওই মিরমদন সাহেবের মুর্দাটা সামনেই পড়ে রয়েছে তো, সেইজন্যে সেইসব কথাই হচ্ছিল এতক্ষণ। মারা যাবার পর মানুষ কোথায় যায়, এইসব। মানে খুব ভয় পেয়ে গেছে নবাব
মিরজাফর বললে–পাক পাক, একটু ভয় পাওয়া ভাল। ভয়ের এখন হয়েছে কী? আমি আরও ভয় পাইয়ে দেব। এবার মোহনলালটা মরলে আর একটু সুবিধে হয়। বেত্তমিজটা অনেক কামান ছুঁড়েছে, ফিরিঙ্গিদের অনেকগুলো সেপাই মারা গেছে। ক্লাইভসাহেব খুব গোঁসা করেছে আমার ওপর বুঝতে পারছি
জেনারেল ল’ সাহেব কবে আসবে জিজ্ঞেস করছিল নবাব।
বলে দাও কালই আসবে, তা হলে সেই আশায় বসে থাকবে মির্জা।
আর বলছিল লড়াই থেকে ফিরে গিয়ে কাউকে রেহাই দেব না। সব দুশমনদের খতম করে ছাড়বে!
মিরজাফরের মুখ দিয়ে একটা গালাগালি বেরোল–আমি খতম করতে দিচ্ছি! ওই দেখো না, বৃষ্টিতে বারুদটারুদ সব ভিজে গেছে, ওরা ঢাকা দিচ্ছিল, আমি বারণ করেছি। ভিজুক, সব বারুদ ভিজে যাক–
ইয়ারজান বললে–আপনি একবার চলুন আলিসাহেব, নেয়ামতকে আগে পাঠিয়েছিল, এবার আমাকে পাঠালে। আপনি না-গেলে আমাকে মাঝখান থেকে সন্দেহ করবে নবাব
না না, সন্দেহ করলে আমাদের সব মতলব ফাস হয়ে যাবে, চলো যাই
বৃষ্টিটা যেন আরও জোরে নামল। মিরজাফর আলি ইয়ারজানকে সঙ্গে নিয়ে মির্জা মহম্মদের তাবুর দিকে চলতে লাগল।
*
কিন্তু ওদিকে তখন কর্নেল ক্লাইতে ক্যাম্পে দুর্ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে সবাই। এই বৃষ্টির সময়ে যদি হঠাৎ হামলা করে বসে নেটিভরা। যদি এই গোলাবারুদ সবার সময় হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে আমাদের লাইনের ভেতরে। ভাবতেই হৃদকম্পহল মেজর আয়ারকুটের। ল্যাসিংটন মারা গেছে। আর ল্যাসিংটনের মতো আরও কত সেপাই সার সার মরে পড়ে আছে এপাশে-ওপাশে। ঘাই হাল ছেড়ে দিয়েছে। সেপাইরা যেন আর চাইছে না যে যুদ্ধ হোক। কেউ-ই চাইছে না। মনে মনে গজরাচ্ছে সবাই।
আমরা কি টাকার জন্যে প্রাণ দিতে এসেছি নাকি এখানে?
কোথায় যেন একটা চাপা আক্রোশ’ গর্জন করে উঠছে সকলের মনে। কেউ লড়াই করবে না। সকলেরই জীবনের দাম আছে। টাকার জন্যে কেউ প্রাণ দিতে পারবে না।
ততক্ষণে জামা-প্যান্ট সব ভিজে জ্যাবজেবে হয়ে গেছে ক্লাইভের। ছাদের ওপর থেকে নীচে নেমে এল কনেল।
