মেহেদি নেসারও খানিক অন্যমনস্ক থেকে পালকিতে চড়ে বসল। আর তারপর মতিঝিলের সদর ফটকের বাইরে বেরিয়ে সেপালকি চকবাজারের রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
এতক্ষণে সচ্চরিত্রর যেন সংবিৎ ফিরেছে। কান্তও থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
কী হল পুরকায়স্থমশাই? নবাব ফিরে এল কেন?
কিন্তু সে প্রশ্নের উত্তর তখন কে দেবে? মানুষের জয়যাত্রার সামনে তখন নবাবের মনদ টলমল করতে শুরু করেছে। মুর্শিদাবাদের চকবাজারের রাস্তায়, অলিতেগলিতে তখন ভীত-জাগ্রত মানুষ প্রথম প্রশ্ন করতে শুরু করেছে-নবাব ফিরে এল কেন? কী হয়েছে? ক্যা হুয়া হায়? হোয়াটস আপ?
*
এ তো ১৭৫৭ সালের ২৪ জুনের সকালের ঘটনা। কিন্তু ২৩ জুন তারিখে লঙ্কাবাগের যুদ্ধ প্রান্তরে এর শুরুটাও এই সঙ্গে বলা উচিত। একদিকে সংহত শক্তির উদগ্র মনোবল, আর একদিকে চুরি, বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র আর বিলাসিতা। যুদ্ধের সময় কি বিলাস পেশায়?কিন্তু তখনও সোনার কলকে চাই, জড়োয়ার তলোয়ার চাই। তখনও চাবুকের অত্যাচার, তখনও আমির-ওমরাহমিরকশির বিশ্বাসঘাতকতা।
মিরমদন গীতা পড়েনি, কিন্তু লড়াই করতে করতে জান দিয়েছে। সে জান দিয়ে তার জবান রেখেছে। সামনে যখন দুশমন সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে তখন তো এদের চাবুক মারা উচিত হয়নি। একথা বোঝবার মতো বুদ্ধি তোমার নেই ইয়ারজান। তোমরা আমাকে না জিজ্ঞেস করে কেন এমন করতে গেলে? এরা যদি সবাই এখন আমার দুশমন হয়ে যায়? হয়তো দুশমন হয়েই গেছে। এরা দুশমনি করলে এসময়ে কী করব আমি?
মিরজাফর আলি সাহেব।
বড় আদরের সুর মির্জা মহম্মদের গলায়। এ-আদর তো তখন ছিল না আলি জাঁহা। তখন তো তুমি তোমার মিরবকশি মোহনলালকে সেলাম করতে হুকুম দিয়েছিলে। সেদিন তো তুমি ভাবোনি একদিন তোমারও বিপদ আসতে পারে, একদিন তোমারও দুর্দিন আসতে পারে!
সকাল পর্যন্ত বেশ ছিল। কাল রাত থেকেই নবাবের সব কথা মনে পড়ছিল। সেই আলিবর্দি খাঁর কথাগুলো। সেই হোসেন কুলি খর কথা, ঘসেটি বেগমসাহেবার কথা। রাত্রেও ভাল ঘুম হয়নি। তারপর সকালবেলাতেই সোনার কলকেটা চুরি হয়ে গেল। তার মিরমদনের অপঘাত মৃত্যু।
মিরমদনের মৃতদেহটা নিজের তাঁবুর মধ্যে আনতে হুকুম দিয়েছিল নবাব।
মিরমদনের মরা মুখখানার দিকে চেয়ে দেখলেব। সত্যিইবাবের জন্যে জান দিয়ে মিরমদন বুঝিয়ে দিয়ে গেল যে, সেনবাবকে ভালবাসে। কেন আমাকে তুমি ভালবাসতে মিরমদন? আমার তো কোনও গুণ নেই। আমি তো তোমাদের কাউকে উপযুক্ত সম্মান দিতে পারিনি। আমার যে টাকা ছিল না রিমন। বিশ্বাস করো এখনও আমার টাকা নেই। আমি মহঅ জগজির কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে সকলের মাইনে মিটিয়ে দিয়েছি। আমি চরিত্রহীন, লট নবাব তোমাদের। আমার জন্যে তোমার জান দেওয়া ঠিক হয়নি মিরমদন। তুমি ভুল করেছ মিরমদন, আমি কাছি তুমি ভুল করেছ।
হঠাৎ বোধহয় খেয়াল হল সবাই চারপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ চেহেল্-সুতুলও নয়, মতিঝিলও নয়। এমনকী এ মুর্শিদাবাদও নয়। লক্কাবাগ।
মিরজাফর আলি সাহেব কোথায়?
নেয়ামত বললে–আমি গিয়ে ডেকে এসেছি জাঁহাপনা
তা আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন?আমার হুকুম কি মানতে চায় না মিরজাফর আলি? আমি কি মুর্শিদাবাদের নবাব নই? কী মনে করেছে মিরজাফর আলি? আবার এত্তেলা দে–যা
হঠাৎ চারদিক থেকে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। বর্ষাকালে বৃষ্টি নামা নতুন নয়। কিন্তু এমন সময় কেন বৃষ্টি এল?নবাব মির্জা মহম্মদ বাইরে আকাশের দিকে চাইলে।
ইয়ারজান বললে–বৃষ্টি এল আলি জাঁহা
নবাব বললে–জেনারেল ল’ কবে এসে পৌঁছোবে ইয়ারজান?
রওনা দিয়েছে, কাল এসে পৌঁছোবে নিশ্চয়। জেনারেল ল’ এলে আর কোনও ভাবনা নেই আলি জাঁহা, সঙ্গে হাজার হাজার সেপাই আছে তার
পাশেই মিরমদনের মৃতদেহটা পড়ে রয়েছে। মির্জা মহম্মদ সেই দিকে একবার চাইলে। তারপর বললে–দেখলে তো ইয়ারজান, এতবার ডেকে পাঠালাম মিরজাফর আলিকে, তবু একবারও এল না। আমি কি তার পায়ে ধরে সেধে আনতে যাব সে মনে করেছে? সে নবাব না আমি নবাব, ইয়ারজান?
আপনিই নবাব আলি জাঁহা!
মির্জা মহম্মদ বললেন, না আমি রাগব না ইয়ারজান। এই সময়ে রাগারাগি করা ঠিক নয়। এই সময়ে সবাইয়ের সঙ্গে মিষ্টি কথা বুলতে হয়। এখন দেখাতে হয় যেন সবাইই আমার প্রিয়জন। কিন্তু ইয়ারজান, আমি তোমাকে বলে রাখছি, এই লড়াইয়ের পর আমি কাউকে রেহাই দেব না। এখন আমি সবাইকে চিনে নিয়েছি, কে দোস্ত আর কে দুশমন সব চিনে নিয়েছি–আমি কাউকে রেহাই দেবনা–
অত জোরে জোরে কথা বলবেন না আলি জাঁহা, কেউ শুনতে পাবে।
কে শুনতে পাবে? মিরমদন? মিরমদন তো মারা গেছে। জানো ইয়ারজান, খোদাতালার এক তাজ্জব কানুন। মরে গেলে কেউ আর কিছু জানতে পারে না। একদিন আলিবর্দি খাঁ মারা গেছে, একদিন সুজাউদ্দিন খাঁ মারা গেছে, আর একদিন আমিও মারা যাব। এখন আমি এখানে এই যে লঙ্কাবাগে বসে ফিরিঙ্গদের সঙ্গে লড়াই করছি, আলিবর্দি খাঁ এসব জানতেও পারছে না। আবার একদিন আমি মরে গেলেও জানতে পারব না আমার মসনদে কে বসল। জিন্দগিটা বড় তাজ্জব চিজ ইয়ারজান
আলি জাঁহা, এখন আপনি ওব কথা নাই বা ভাবলেন।
আচ্ছা ইয়ারজান, এত কথা থাকতে মরে যাওয়ার কথাই বা আমার মনে আসছে কেন বলো তো? আমি কি ভয় পেয়েছি?
