পেছন দিকে হঠাৎ যেন তাঞ্জামে হুমহায় শব্দ হল। পেছন ফিরতেই কান্ত দেখলে সর্বনাশ! নানিবেগমসাহেবার তাঞ্জাম আসছে। সামনে দুটো হাতি, পেছনেও দুটো।
কান্ত থামটার আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে রইল।
নানিবেগমসাহেবা তাঞ্জাম থেকে নামবার সঙ্গে সঙ্গে, ওদিক থেকে আবার আর একটা পালকি এসে হাজির। নানিবেগমসাহেবা বোরখার ভেতর থেকে পেছন ফিরে দেখলে।
কে?
পেছনের পালকি থেকে নেমে মেহেদি নেসার সাহেব নানিবেগমসাহেবাকে নিচু হয়ে লম্বা কুর্নিশ করলে-বন্দেগি নানিবেগমসাহেবা!
মেহেদি, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে তুমি মতিঝিলে গ্রেফতার করে রেখেছ, শুনলাম?
আমি গ্রেফতার করে রেখেছি? কে বললে–সেকথা নানিবেগমসাহেবাকে? আমি গ্রেফতার করবার কে নানিবেগমসাহেবা? আমি তো কেউ নই, আমি তো আলি জাঁহার খিদমদগার স্রেফ
তা হলে কে গ্রেফতার করলে?
মেহেদি নেসার বললে–মুর্শিদাবাদের নবাব শা কুলি খান মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌল্লার হুকুমে গ্রেফতার করেছি নানিবেগমসাহেবা!
নানিবেগমসাহেবা গম্ভীর গলায় বললে–আমি হুকুম দিচ্ছি ওকে ছেড়ে দাও তুমি মেহেদি
লেকন নানিবেগমসাহেবা, আলি জাঁহার হুকুম আমি কেমন করে খিলাপ করব?
আমি আলি জাঁহার নানি, আমার হুকুম কি মির্জা মহম্মদের হুকুমের চেয়ে বড় নয়? চেহেল্-সুতুনের বেগমদের ওপর আমার হুকুমই তো সকলের ওপরে।
আপনি যখন বলছেন নানিবেগমসাহেবা, তখন আমার বলবার কিছু নেই।
হঠাৎ সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ ঠিক এই সময়ে চবুতরায় এসে হাজির হতেই নানিবেগমসাহেবা দেখতে পেয়েছে।
এ কৌন?
মেহেদি নেসার বললে–এ ইব্রাহিম খা–সরাবখানার খিদমদগার!
সচ্চরিত্র তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে কুর্নিশ করে পাশে সরে দাঁড়াল।
নানিবেগমসাহেবা তার দিকে না চেয়ে মেহেদি নেসারের দিকে চেয়ে বললে–আমাকে তুমি মরিয়ম বেগমসাহেবার কাছে নিয়ে চলো মেহেদি, ওকে আমি চেহেলসূতুনে নিয়ে যাব।
কিন্তু নবাব মির্জা মহম্মদ যদি গোঁসা করে নানিবেগমসাহেবা, তো আমার যে কোতল হয়ে যাবে!
তখন আমি আছি মেহেদি। আমার বাত মির্জা ঠেলতে পারবে না। চলো।
মেহেদি নেসার তবু বোধহয় একটু দ্বিধা করতে লাগল।
চলো–
একটু ভাল করে সোচবুঝ করে দেখুন নানিবেগমসাহেবা।
সোচবুঝ করবার কিছু নেই মেহেদি। আমি খবর পেয়েই দৌড়ে এসেছি। হাতিয়াগড়ের জমিনদারকেও তুমি গ্রেফতার করে এনেছ তাও শুনেছি, তা তার ব্যাপার মির্জা নিজে এসে ফয়সালা করবে। এখন তুমি মরিয়ম বেগমকে ছেড়ে দাও, আমি সঙ্গে করে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে যাই।
কিন্তু তা হলে সব দায়িত্ব নানিবেগমসাহেবাই নিলেন তো?
হ্যাঁ, নিলাম নিলাম, তোমার ভয় নেই মেহেদি। আমার মরিয়ম মেয়ে এমন কিছু করতে পারে না যাতে মির্জা তাকে গ্রেফতার করবার হুকুম দেবে। কী এমন করেছে ও শুনি?
নানিবেগমসাহেবা, ফিরিঙ্গি সাহেব ক্লাইভের কাছে গিয়ে মরিয়ম বেগমসাহেবা নিজামতের ফৌজি খবর ফাঁস করে দিয়েছে। চেহেল্-সুতুন থেকে পালিয়ে গিয়ে বেগমসাহেবা এতদিন সেই ফিরিঙ্গি সাহেবের কাছেই ছিল।
মরিয়ম বেগম যে ফিরিঙ্গিদের কাছে ছিল তার প্রমাণ আছে? কেউ দেখেছে?
হ্যাঁ নানিবেগমসাহেবা। সবাই জানে মরিয়ম বেগমসাহেবা সেখানে ছিল। বশির মিঞা নিজে দেখেছে, দেখে এসে নবাবকে খবর দিয়েছে।
কে বশির মিঞা?
বশির মিঞা নিজামতের জাসুস, অনেক দিনের পুরনো জাসুস। সে মিথ্যে কথা বলতে যাবে না।
নানিবেগমসাহেবা যেন রেগে গেল।
বললে–মিথ্যে কথা বলবে না নিজামতের জাসুস? তুমি আমাকে শেখাচ্ছ মেহেদি? ভেবেছ আমি নিজামতের কিছুই জানি না? মিথ্যে কথা দিয়েই তো নিজামত চলছে। মিথ্যে কথার জন্যেই তো আজ নিজামত ভেঙে পড়তে চলেছে! মিথ্যে কথা কে না বলে এখানে মেহেদি? তুমি মিথ্যে কথা বলো না? তোমরা যদি সবাই সত্যি কথা বলতে তো আজ আমার মির্জার এই দুর্দশা হয়? তোমরা যদি সত্যি কথা। বলতে তো আজ এমন করে চেহেল্-সুতুন ছেড়ে আমাকে এখানে আসতে হয়? তোমরা যদি সবাই সত্যি কথা বলতে তো আজ কলকাতার ফিরিঙ্গিরা নিজামতের সঙ্গে লড়াই করতে ভরসা পায়?
বলতে বলতে নানিবেগমসাহেবা যেন হাঁফাতে লাগল।
তারপর একটু দম নিয়ে বললে–চলো, কোথায় আমার মেয়েকে রেখেছ, চলো, আমি তাকে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে যাব চলো
মেহেদি নেসার বলতে গেল কিন্তু আলি জাঁহা…
নানিবেগম বোমার মতো ফেটে উঠল–আলি জাঁহা আমার নাতি, তার সম্বন্ধে তোমায় কিছু ভাবতে হবে না। সে আমি বুঝব। মির্জা যখন লক্কাবাগ থেকে ফিরবে তখন এ-সম্বন্ধে আমি তার সঙ্গে বোঝাঁপড়া করব। তুমি কে? তুমি তো মির্জার নোকর তুমি বার করে দাও মরিয়ম বেগমকে, চলো–
সমস্ত মতিঝিলটা সেদিন নানিবেগমসাহেবার গলার শব্দে গমগম করে উঠেছিল–
মেহেদি নেসার সাহেবের মুখে তখন আর কথা নেই। আস্তে আস্তে নানিবেগমসাহেবার সঙ্গে ওপরে উঠতে যাচ্ছিল, হঠাৎ এক কাণ্ড ঘটল।
নানিবেগমসাহেবা!!!
খোজা বরকত আলি দৌড়োতে দৌড়োতে এসে তখনও হাফাচ্ছে। একটু সামলে নিয়ে বললে–নবাব চেহেল্-সুতুনে ফিরে এসেছেন নানিবেগমসাহেবা
নবাব? আমার মির্জা? ফিরে এসেছে?
মেহেদি নেসারও যেন আকাশ থেকে পড়েছে–নবাব? আলি জাঁহা? ফিরে এসেছে? কখন?
জি হাঁ, আবভি।
এক মুহূর্তে যেন ওলোটপালোট হয়ে গেল সমস্ত পৃথিবীটার। এক মুহূর্তে যেন পৃথিবীর মুখখানাই আমূল বদলে গেল। পৃথিবীর মুখখানা এক মুহূর্তে সাদা ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে এল। দিনদুনিয়ার নবাব শা কুলি খান বাহাদুর মির্জা মহম্মদ আলমগির লড়াই করতে করতে ফিরে এসেছে, এ যেন সকলের কাছে বিস্ময়। নানিবেগমসাহেবা সেই অবস্থাতেই আবার তাঞ্জামে গিয়ে উঠল। আবার সামনে পেছনে জোড়া হাতি উলটো দিকে চেহেল্-সুতুনের পথে চলতে শুরু করল। শোহনাল্লা রসুল আল্লা! খোদাতালাহ, তোমার দোয়া বান্দা চিরকাল স্মরণ করবে। তুমি শুধু আমারই আল্লাতালাহ খোদাতালাহ নও। তুমি মুর্শিদাবাদের নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দৌল্লারও খোদাতালাহ। তোমার বহুত বহুত মেহেরবান। তুমি আমাকে দেওয়ান-ই-খালসা করে দিলে, এদয়া আমি আমার জিন্দগিতে কখনও ভুলব না।
