সচ্চরিত্র বললে–তোমার আমি যে সর্বনাশ করেছি বাবাজি, তার আর শেষ নেই। আমার জন্যেই তোমার বিবাহে বাধা পড়ল, তোমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। তা কি আমি ভুলে গেছি ভেবেছ?
সে যা হবার হয়েছে, তার জন্যে আমার আর দুঃখ নেই। সেই মরালীবালাকে মেহেদি নেসার এখানে ধরে এনে রেখেছে শুনলাম। এখন আপনি তাকে বাঁচান।
সেকী বাবাজি? সে যে নষ্টা মেয়ে। সে যে এখন মরিয়ম বেগমসাহেবা হয়ে গেছে। সে যে নবাবের সঙ্গে রোজ শোয়। তাকে কেন ধরতে গেল?
খবরদার!
হঠাৎ কান্ত চিৎকার করে উঠল।
খবরদার বলছি, মরালীর নামে অমন কথা বলবেন না! আপনি নিজের চোখে শুতে দেখেছেন যে বলছেন?
সচ্চরিত্র বললে–না না, এখনকার কথা বলছিনে। এখন তো নবাব ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেছে। কিন্তু এককালে তো শুত। যখন নবাব এখানে ছিল তখন তো শুয়েছে।
কান্ত বললে–আপনি নিজের চোখে শুতে দেখেছেন? আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুন তো?
না না, তা কী করে দেখব? আমি আমার কাজকর্ম ছেড়ে কি তাই দেখতে গেছি, না কেউ তা আমাকে দেখতে দেবে? নেয়ামত কি তেমনি লোক? নেয়ামতকে দেখেছ তো তুমি? সে এখানকার খোদ খিদমদগার। সে গেছে নবাবের সঙ্গে লড়াইতে। সে এখানে থাকলে দেখাতাম তোমাকে।
কান্ত বললে–না দেখে অমন কথা বলবেন না আপনি মরালীর সম্বন্ধে!
সচ্চরিত্র বললে–তা না-হয় বলব না বাবাজি, ভাল হলেই তো ভাল। আমি কি চাইনা যে মেয়েটার চরিত্র ভাল থাকুক? এই আমারই দেখো না, আমার বাবা আমার নাম রাখলে সচ্চরিত্র, আমি নিজেও কত চেষ্টা করলুম, কিন্তু চরিত্রটা কি ঠিক রাখতে পারলুম? নিজের অনিচ্ছেয় তো আমাকে ম্লেচ্ছ-মাংস খেতে হল? জাত তো আমি খোয়ালুম! আর এই বুড়ো বয়েসে এখন তো এই মদের গন্ধের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। এতে আর চরিত্রের কি কিছু থাকে?
হঠাৎ সচ্চরিত্র বললেও গোলমালটা কীসের বাবাজি? এমন তো হয় না? কী হয়েছে, তুমি কিছু জানো?
কান্ত বললে–ওসব কথা থাক, আপনি বলুন আমার একটা উপকার করবেন?
কী উপকার, বলো বাবাজি?
কান্ত বললে–শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়েকে ওরা এখানে যে আটকে রেখেছে, আমার মনে হয় ওকে ওরা কোতল করবে
কেন বলো তো? কোতল করবে কেন? কী করেছে ও?
তা জানি না, মেহেদি নেসার ভেবেছে, ও মেয়েটাই সব সর্বনাশের গোড়া। জানেন তো, একবার মরালী সফিউল্লা সাহেবকে খুন করেছিল? সেই থেকেই রাগ আছে ওর ওপর। এখন নবাব গেছে লড়াই করতে, এই সুযোগে ওকে কোতল করতে চায়।
মেহেদি নেসার লোকটা বড় খারাপ বলে মনে হয় বাবাজি!
খারাপ তো বটেই, নইলে মরালীকে ওইরকম গ্রেফতার করে রাখে? আপনাকে ওকে ছাড়িয়ে দিতেই হবে।
পুরকায়স্থ মশাই কী যেন ভাবলে একটু। তারপর বললে–তুমি ওধারে একটু দাঁড়াও বাবাজি, আমি দেখে আসছি মেয়েটাকে কোথায় রেখেছে।
কান্ত চুপ করে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। পুরকায়স্থ মশাই সোজা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। বুড়ো মানুষ। বিশেষ করে চকবাজারের রাস্তায় হাতির ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাবার পর থেকেই শরীর আর বইছে না। কিন্তু মেয়েটার কথা শোনা পর্যন্ত মনটা কেমন ছটফট করছিল। সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর নিজেরও তো মেয়ে ছিল। তাদের কথা মনে পড়ে গেল। তাদের সেখানে কী হচ্ছে কে জানে!
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে সামনের ঘরটাই নবাবের আম-দরবার। আশেপাশে জেনানামহল। এক পাশে আমির-ওমরাওদের বিশ্রাম করবার মহল।
সচ্চরিত্র আরও এগিয়ে গেল। ছোটমশাইকে এখানে কোথাও রেখেছে। জেনানামহলের দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল সচ্চরিত্র।
কে? কে ওখানে? কে তুমি?
কোথা থেকে শব্দটা আসছে বোঝা গেল না। নেয়ামত খাঁ নেই তাই রক্ষে। অন্য খিদমদগাররাও নবাবের তরিবত করতে নবাবের সঙ্গে লড়াইতে গেছে।
এতক্ষণে দেখতে পেলে সচ্চরিত্র। একটা মহলের ফটকের বাইরে থেকে তালাচাবি দেওয়া। ফটকের ওপরে চৌকোনো জায়গাটুকু কাটা। তার ফাঁক দিয়ে একখানা মুখ তার দিকে চেয়ে আছে।
কৌন হ্যায় তুম?
আজ্ঞে, বেগমসাহেবা, আমি ইব্রাহিম খাঁ।
আশ্চর্য, শোভারাম বিশ্বাসের মেয়ে আজ সচ্চরিত্র পুরকায়স্থকেও প্রথমে চিনতে পারেনি। তারপরই গলার সুর একেবারে বদলে গেল।
তুমি সচ্চরিত্র পুরকায়স্থমশাই?
পুরকায়স্থ মশাই বললে–মা, তুমি শান্ত হও মা, আমি তোমাকে দেখতে পেয়েই এসেছি।
আমাকে এরা হাত-পা বেঁধে এখানে ধরে নিয়ে এসেছে পুরকায়স্থমশাই, এখনই একবার নানিবেগমসাহেবাকে খবর দিতে পারো? বলবে, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে মতিঝিলের ভেতরে জেনানামহলে গ্রেফতার করে রেখেছে
কিন্তু তোমাকে ওরা ধরলে কেমন করে মা?
সে কথা পরে শুনো তুমি, আগে নানিবেগমসাহেবাকে খবরটা দিয়ে এসো, তারপরে আমি দেখব মেহেদি নেসারের কী করতে পারি। নবাবকে বলে আমি মেহেদি নেসারকে চাবুক খাওয়াব। তুমি এক্ষুনি খবরটা দাও গিয়ে।
সচ্চরিত্র নীচেয় চলে আসছিল। কিন্তু মরালী আবার ডাকলে ছোটমশাইকে এখানে কোথায় রেখেছে তুমি জানো?
না মা, আমি তো জানি না তা!
আর ওই অত হল্লা-চিৎকার হচ্ছে কেন, জানো? ও কীসের চেঁচামেচি?
তাও জানি না মা। আমিও তো শুনছি কেবল। আমি যাচ্ছি, চেহেলসুতুনে গিয়ে পিরালি খাঁ-কে খবর দিয়ে আসছি।
কান্ত নীচেয় তখনও দাঁড়িয়ে ছিল একটা থামের আড়ালে। আস্তে আস্তে ভোর হচ্ছে ঝিলের ওপর। কিন্তু যত আলো হচ্ছে আকাশে, ততই কান্তর ভয় পাচ্ছে। যদি কেউ এখনই এসে পড়ে এখানে! যদি কেউ দেখতে পায়। যদি কেউ সমস্ত বানচাল করে দেয়।
