গোলাবারুদ সব বাইরে আছে, খোদাবন্দ, সব ভিজে যাবে, আমি গিয়ে দেখে আসি।
কিন্তু মিরজাফরসাহেব? মিরজাফরসাহেব কোথায়? কামান ছুড়ছে না কেন? আমাকে যে কোরান ছুঁয়ে কসম খেয়েছিল। তা হলে তার কথা রাখছে না কেন?
ঝমঝম করে চারদিকে বৃষ্টি পড়ছে। কারও মুখে কোনও কথা নেই। ওকথার কে উত্তর দেবে? কে বলবে এত ফৌজ, এত হাতি, এত সেপাই, এত কামান থাকতে মিরবকশি মিরমদন কেন হঠাৎ মারা যায়। ওই মিরমদনকেই তো কিছু আগে মির্জা মহম্মদ জিজ্ঞেস করেছিল, সে গীতা পড়েছে কিনা। গীতা পড়েনি কাফের মিরমদন। কাফেররা গীতা পড়বে না, মুসলমানরাও কোরান পড়বে না, অথচ লড়াই করতে এলে কামানের গোলা লেগে মারা যাবে। মারা যাবার আগে বেচারা মিরমদন জানতেও পারলে, কেন তার পয়দা হয়েছিল এই দুনিয়ায়, কেনই বা মারা গেল আর মারা যাওয়ার পর কোথায় যাবে সে! তাজ্জব!
হঠাৎ সিনফ্রে ঘরে ঢুকেছে-ইয়োর একসেলেন্সি, ইংরেজদের সব গোলাবারুদ বৃষ্টির জলে ভিজে গেছে, তারা সেগুলো সরিয়ে ফেলছে
তা ফেলুক, কিন্তু জেনারেল ল’ আসতে এত দেরি করছে কেন সিনফ্রে?
আপনি কিছু ভয় করবেন না ইয়োর একসেলেন্সি, আমি তো আছি। আই মাস্ট ফাইট দেম আউট। ইংরেজরা বিস্ট, ইংরেজরা সব ব্যাস্টার্ড
একবার মিরজাফরসাহেবকে আমার কাছে ডাকো তো মোহনলাল। মিরজাফর আসুক। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করব–আপনি আপনার কথার খেলাপ করছেন কেন মিরজাফরসাহেব? আপনি না কোরান ছুঁয়ে আমার কাছে কসম খেয়েছিলেন, আপনি আমাকে মদত দেবেন? আপনি না আমার রিস্তাদার? আপনি না আমার আত্মীয়? আপনি যদি এই বিপদের সময়ে আমাকে না দেখেন তো কে দেখবে মিরজাফরসাহেব?
মোহনলাল সেই বৃষ্টির মধ্যেই ছুটে বেরিয়ে গেল।
তখন লক্কাবাগের মাঠে নতুন বর্ষার ঝমঝমকরা বৃষ্টি একভাবে পড়ে চলেছে।
*
তাঞ্জামটা সেদিন যখন মতিঝিলে প্রথম এসে পৌঁছেছিল তখন ঝাপসা ভোর। সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাই চিরকাল ভোরবেলাই ঘুম থেকে ওঠে। সেদিনও ঘুম থেকে উঠেছিল। খুব ভোরে। মতিঝিলে সবাই দেরি করে ওঠে। কিন্তু চিরকালের অভ্যেস সচ্চরিত্রের একদিনে বদলানো যায় না।
হঠাৎ সদর ফটক দিয়ে তিনটে পালকি ঢুকতে দেখে কেমন অবাক হয়ে গিয়েছিল। এত ভোরে তো পালকি আসে না কারও। নবাব যখন ছিল তখন মরিয়ম বেগমসাহেবার পালকি যখন-তখন আসত, যখন-তখন যেত। কিন্তু এখন তো নবাব নেই। এখন তো নবাব লড়াইতে।
পালকি তিনটে চবুতরায় এসে থামল।
একটা থেকে নামল মেহেদি নেসার। আর একটা থেকে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই। আর একটা থেকে বোরখা-পরা একজন মেয়েমানুষ।
মেয়েমানুষ দেখে আরও অবাক হয়ে গেল সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ। মেয়েমানুষটার হাত দুটো নৌকোর কাছি দিয়ে বাঁধা। তাকে টানতে টানতে মেহেদি নেসার মতিঝিলের ভেতরে নিয়ে গেল। তারপর ফিরে এসে ছোটমশাইকেও. ভেতরে নিয়ে গেল। তারও হাত দুটো রশি দিয়ে বাঁধা।
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ অনেক তাজ্জব ব্যাপার দেখেছে মতিঝিলে। এতদিন চাকরি করছে এখানে, কিছু দেখতে আর বাকি নেই। কিন্তু এমন ঘটনা কখনও দেখেনি।
আর তার খানিকক্ষণ পরেই মেহেদি নেসার সাহেব যেমন এসেছিল তেমনই আবার পালকিতে চড়ে মতিঝিলের সদর ফটক দিয়ে বাইরে চলে গেল।
আর ঠিক তার পরেই চেহেল্-সুতুনের মাথা থেকে ইনসাফ মিঞার নহবতটা বাজতে বাজতে হঠাৎ মাঝপথে থেমে গেল। কী হল হঠাৎ? এমন তো হয় না। আর তারপর চকবাজারের রাস্তায় যেন লোকের আনাগোনা বাড়তে লাগল। এত সকালে কী হল? কেয়া হুয়া? কেন এত লোকের জটলা? কী। হয়েছে ওখানে?
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ হতবাক হয়ে সেখানে দাঁড়িয়েই ভাবতে লাগল–কী হল হঠাৎ?
হঠাৎ পাশের দিকে চেয়ে দেখলে, কান্তবাবু। একী বাবাজি, তুমি?
আপনি মরিয়ম বেগমসাহেবাকে এখানে আসতে দেখেছেন পুরকায়স্থমশাই?
সচ্চরিত্রর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
বললে–তুমি আবার আমাকে পুরকায়স্থমশাই বলে ডাকছ কেন বাবাজি? ওনামে তো আমাকে কেউ আর ডাকে না। তুমি আমাকে ইব্রাহিম বলে ডাকবে এখন থেকে
কান্ত বললে–তা হোক, আমার কাছে আপনি সেই আগেকার পুরকায়স্থমশাই
না বাবাজি, ওনামে ডাকলে আমার যে সব আগেকার কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায় আমি ঈশ্বর ইন্দীবর ঘটকের পুত্র, ঈশ্বর কালীবর ঘটকের পৌত্র। আমার পরিবার ছেলেমেয়ে সকলের কথা যে মনে পড়ে যায় বাবাজি–আমার যে কান্না পায়–
কান্ত এবার সোজাসুজি চাইলে পুরকায়স্থ মশাইয়ের দিকে। লোকটা যেন আরও বুড়ো হয়ে গেছে এই কদিনেই।
বললে–আপনাকে আমি ওই মুসলমানি নামে ডাকতে পারব না পুরকায়স্থমশাই, আপনি আমার কাছে এখনও হিন্দুই আছেন–আমি জাত মানি না।
পুরকায়স্থ মশাই বললে–”না বাবাজি, জাতটা মেনন, আমার নিজের জাত চলে গেলেও তোমাকে আমি বলছি বাবাজি, ওটা মেনো–ওতে তোমার পূর্বপুরুষের আত্মা পরকালে তবু একফোঁটা জল পাবে। আমি ঈশ্বর ইন্দীবর ঘটকের অধম ছেলে, আমার পিতা পরকালে জল না পেয়ে হা হা করে বেড়াচ্ছেন, আমি বুঝতে পারছি বাবাজি
ওসব কথা থাক পুরকায়স্থমশাই, আমি অন্য কাজে এসেছি। শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে মরালীবালার সর্বনাশ হয়ে গেছে, আপনি তা জানেন?
সচ্চরিত্র বললে–শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে? কী সর্বনাশ?
কান্ত সচ্চরিত্রর হাত দুটো ধরে ফেললে। বললে–পুরকায়স্থমশাই, আমার একটা উপকার করতে হবে আপনাকে। বলুন করবেন?
