নবাব সেই কথাই একদিন জিজ্ঞেস করেছিল মৌলবি সাহেবকে।
নিজামতের মৌলবি সাহেব। বরাবর নিজামত থেকে মাসোহারা পেয়ে নিজের নোকরি বজায় রেখেছে পুরুষানুক্রমে। কখনও কল্পনাও করেনি যে, একদিন আবার মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছে তার বিদ্যে বুদ্ধির পরীক্ষা দিতে হবে। উত্তর দিতে গিয়ে ঘন দাড়ির ভেতর বুঝি কথাটা আটকে গিয়েছিল। কিন্তু নবাবের বুঝতে ভুল হয়নি। হিসেবনবিশকে তখনই বরখাস্ত করবার হুকুম দিয়ে অব্যাহতি দিয়েছিল সেই মৌলবি সাহেবকে।
হয়তো সেই মৌলবি সাহেব সেদিন আর সকলের মতোই অভিশাপ দিয়েছিল নবাবকে। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই অভিশাপ দিয়েছিল। তা দিক। অভিশাপের ফল যদি ফলেই তো সে মৌলবির বরখাস্তের জন্যে নয়। সে ফলবে ইতিহাসের অভিশাপের ফলে। ইতিহাস যাকে অভিশাপ দেয়, তাকে সে বড় নিষ্ঠুরভাবে অভিশাপ দেয়। তাকে শুধু সে ধ্বংস করে না, নিশ্চিহ্ন করে তবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যেমন করেছে সরফরাজ খাঁ-কে।
তাঁবুর বাইরের দিকে যেতে যেতে এই কথাগুলিই মনে হচ্ছিল নবাবের। হঠাৎ ইয়ারজান সাহেব সামনে কুর্নিশ করে দাঁড়াল।
আমাকে ডেকেছিলেন আলি জাঁহা?
কোথায় থাকো তোমরা? কাউকে ডেকে পাওয়া যায় না। মেহেদি কোথায়?
ইয়ারজান বললে–সে তো আলি জাঁহার দুশমনের সঙ্গে মোকাবিলা করতে গেছে
নবাব রেগে গেল।
আমার দুশমন? আমার দুশমনের কি কমতি আছে যে মোকাবিলা করতে দূরে যেতে হবে? এখানে-সেখানে আশেপাশে যত লোক আছে, সব তো আমার দুশমন! নবাবের দুশমনের অভাব কে বললে? নবাবের দোস্তের মোকাবিলা করতে দূরে গেলে তবু তার একটা মানে থাকত। ওই যে মিরজাফর, ইয়ার লুৎফ, দুর্লভরাম দাঁড়িয়ে রয়েছে ওখানে, ওরাই কি আমার দুশমন নয়?
ইয়ারজান বললে–সেই জন্যেই তো আলি জাঁহা, আমি দুশমনির প্রতিশোধ নিচ্ছিলাম এতক্ষণ
কী করে প্রতিশোধ নিচ্ছিলে শুনি? চাবুক মেরে? যারা আমার সোনার কলকে চুরি করেছে তাদের চাবুক মেরে তুমি আমার দুশমনি দূর করবে?
হ্যাঁ, আলি জাঁহা, শালারা বড় বেইমান।
কিন্তু আর একটু দেরি করে প্রতিশোধ নিতে পারলে না? আর একটু দেরি করে প্রতিশোধ নিলে কী ক্ষতিটা হত?
প্রতিশোধ নিতে কি দেরি করা উচিত আলি জাঁহা? বেইমানরা যে আশকারা পেয়ে যাবে তা হলে। ভাববে, নবাবের ক্ষমতা নেই: ভাববে, নবাব ভীরু, নবাব কম-জোর–
হঠাৎ দূরে নজর পড়ল, সার সার তাবুর সামনে সবাইকে দাঁড় করানো হয়েছে। নবাবেরই খানসামা
বাবুর্চি খিদমদগার সব। সবাইকে মাইনে দিতে পারেনি নিজামত। তবু সবাই শাস্তির ভয়ে এখানে নবাবের সঙ্গে এসেছে। সঙ্গে এসে নবাবের খেদমত করছে। তারাই সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। পেছন। থেকে সকলের হাত বাঁধা। একজন সেপাই তাদের পিঠে সপাং সপাং করে বেত মারছে
মির্জা মহম্মদ আর থাকতে পারলে না। চিৎকার করে উঠল–থামো–থামো
পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ইয়ারজান সাহেব আর নেয়ামত। নবাবের গলার শব্দে তারাও চমকে উঠেছে।
থামো, থামো
মির্জা মহম্মদ আবার চিৎকার করে উঠল। তারপর আর দাঁড়াল না সেখানে। যেন চাবুকগুলো তার নিজের পিঠের ওপরেই পড়ছিল এতক্ষণ।
ইয়ারজান সাহেব পেছন পেছন আবার তাঁবুর ভেতরে এল।
আলি জাঁহা, আমি যদি কসুর করে থাকি তো আমাকে মাফ করুন
মির্জা গর্জে উঠল–তুমি কী রকম মানুষ ইয়ার, এই সময়েই ওদের চাবুক মারতে হয়? ঠিক এই সময়েই আমাকে এমন করে বিপদে ফেলতে হয়? তোমার একটা আক্কেল নেই?
মির্জা মহম্মদ তাকিয়ার ওপর নিজের মাথাটা গুঁজে দিলে।
আমার কসুর হলে আমাকে মাফ করুন আলি জাঁহা।
আবার মাফ চাইছ তুমি? জানো, এখন আমার চারদিকে দুশমন, তার ওপর তুমি আরও দুশমন বাড়াচ্ছ। আর একদিন পরে চাবুক মারতে পারতে না? আর একদিন আমাকে রেহাই দিতে পারতে না!
আলি জাঁহা, আপনার ভালর জন্যেই ওদের শায়েস্তা করছিলাম!
আর ভাল করতে হবে না আমার। মেহেরবানি করে ওদের ছেড়ে দাও, মেহেরবানি করে আমাকে একটু শান্তি দাও ইয়ারজান, আর একটা দিন সবুর করো। আর একদিন পরেই জেনারেল ল’ আসছে–তারপর আমি আর কিছু বলব না
ইয়ারজান এবার চুপ করে রইল। কোনও কথা বললে না।
তুমি যাও, আমার সামনে থেকে চলে যাও ইয়ারজান, আমি আর কাউকে এখানে চাই না
খোদাবন্দ!
নবাব এতক্ষণে আবার মুখ তুলল।
কে?
মিরমদন মারা গেছে।
নবাব মির্জা মহম্মদ সোজা হয়ে উঠে বসেছে। মোহনলাল এসেছে। কথাটা যেন তবু বিশ্বাস হল না। ঘোলাটে চোখ দিয়ে মোহনলালের দিকে চেয়ে দেখতে লাগল।
মোহনলাল আবার বললে–আমার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করছিল মিরমদন, সে মারা গেছে। খোদাবন্দ!
তবু নবাবের মুখে কোনও কথা নেই। নবাবের যেন বাকরোধ হয়ে গেছে।
মিরজাফর, ইয়ার লুৎফ খাঁ, রাজা দুর্লভরাম কেউ কামান ছুড়ছে না।
তবু নবাব নির্বাক।
খোদাবন্দ, আপনি কিছু হুকুম দিন। আপনি হুকুম দিলে আমি ফৌজ নিয়ে এগিয়ে যাই, আমি আর সিনফ্রে দু’জন ওদের হঠিয়ে দেব, আপনি শুধু হুকুম দিন খোদাবন্দ!
এতক্ষণে নবাবের মুখে যেন কথা ফুটল।
বললে–জেনারেল ল’র কোনও খবর আছে মোহনলাল?
তা জানি না জাঁহাপনা, জেনারেল ল’র আসতে দেরি হবে, তার আগেই আমরা লড়াই ফতেহ্ করে দেব। আপনি একবার শুধু হুকুম দিন খোদাবন্দ!
হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি এল আকাশ ভেঙে। সকলেই বাইরের দিকে চেয়ে দেখলে। বর্ষাকালের বৃষ্টি। বৃষ্টির জল লক্কাবাগের গাছপালা তাঁবু সবকিছু যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে
