মহারাজ বললেন–তুমি জানো না বলেই ওকথা বলছ! দেশের নবাবের সঙ্গে আমরা যে সবাই জড়িয়ে গিয়েছি
তা নবাব মারা গেলে আবার একজন নবাব হবে। নবাবের মসনদ তত খালি থাকবে না
মহারাজ বললেন–এবার তো আর তা নয়। আলিবর্দি খাঁ মারা গেলে সিরাজ-উ-দৌলা নবাব হয়েছিল। এবার সিরাজ-উ-দ্দৌলা মারা গেলে আর তা হবে না। এবার ফিরিঙ্গিরা নবাব হবে।
বলো কী?
তুমি যাও, কিছু মনে কোরো না, আমি নীচেয় যাচ্ছি। এতদিন আমিও সকলের মতো ভাবতুম, সিরাজ-উ-দ্দৌলা মারা গেলেই বা ক্ষতি কী! মারা তো একদিন সবাই-ই যাবে। মসনদে তার বদলে আর একজন নাহয় বসবে, হয় মেহেদি নেসার, নয়তো মিরজাফর সাহেব, নয়তো তার ছেলে মিরন, কিন্তু রকমসকম দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছি
কেন?
সে তুমি বুঝবে না বলে নীচেয় চলে গেলেন মহারাজ। সিঁড়ি দিয়ে যাবার পথে সদর-মহলের মুখেই দাঁড়িয়ে ছিল কালীকৃষ্ণ সিংহমশাই।
কী খবর দেওয়ানমশাই? শশী আর কিছু খবর দিয়েছে?
দেওয়ানমশাই সেই খবর দিতেই আসছিল। আজকাল ঘনঘন দেওয়ান মশাইকে দেখা করতে হয় মহারাজের সঙ্গে। কখন কোন খবরটা আসে, কখন কে কী খবর পাঠায়, তার সবটা জানাতে হয় মহারাজকে। সেই অনুযায়ী নির্দেশ পাঠাতে হয় মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদের নিজামতে কে কী ভাবছে, কে কী করছে, তার ওপর নির্ভর করে কেষ্টনগরের রাজত্ব।
মিরমদনসাহেব মারা গেছে হুজুর! এইমাত্র খবর এল।
কথাটা শুনে মহারাজের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল। মিরমদন! মিরমদন মারা গেছে।
তুমি ঠিক শুনেছ?
হ্যাঁ, ঠিক শুনেছি।
তা হলে নবাবের এখন কী রকম অবস্থা? মিরজাফরসাহেব কী করছে?
অত খুঁটিনাটি কিছু জানাতে পারেনি।
ওদের ফিরিঙ্গিদের কী মতলব? লড়াইতে জিততে পারলে কি মুর্শিদাবাদের মসনদ নিয়ে টানাটানি করবে নাকি?
সেইরকমই তো হালচাল মনে হচ্ছে। মিরজাফর সাহেব সেই জন্যেই হাত গুটিয়ে বসে আছে। উচ্চবাচ্য করছে না। ফিরিঙ্গিদের বিশ্বাস করতে পারছে না
মহারাজের হঠাৎ যেন কথাটা মনে পড়ে গেল। বললেন–হ্যাঁ, ভাল কথা, সরখেল এসেছে?
হ্যাঁ, ছোটমশাইয়ের কোনও পাত্তা নেই হাতিয়াগড়ে। কেউ জানে না তিনি কোথায় আছেন।
তা হলে জগৎশেঠজিকে একবার চিঠি লিখে পাঠাও, যদি জগৎশেঠজির বাড়িতে লুকিয়ে উঠে থাকেন–
ওদিকে মহারানি অন্দরমহলের সিঁড়ি পেরিয়ে নীচেয় আসতেই পদ্ম বললে–রানিমা, তোমাকে ওরা ডাকছে
কারা রে?
ওই হাতিয়াগড়ের রানিবিবি!
কেন, আমাকে আবার কী জন্যে ডাকে? চল, দেখে আসি–
অতিথিশালায় তখন বেশ গুলজার চলেছে। অনেকদিন পরে উদ্ধব দাস এসেছে। শুধু উদ্ধব দাসই নয়। লক্কাবাগের আশেপাশের গায়ের কিছু কিছু লোকও পালিয়ে এসে জুটেছে। উদ্ধব দাস সকলকেই চেনে। সবাই মিলে তাকে গান গাইতে ধরেছে।
উদ্ধব দাস বললে–রসের গান গাইব?
সবাই বললে–না না, তোমার একটা খেদের গান আছে, সেইটে গাও
কোনটা খেদের গান?
সেই যে তোমার বউ পালিয়ে যাবার পর যে-গানটা বেঁধেছিলে?
আর বলতে হয় না। উদ্ধব দাস ডান হাতটা কানে লাগিয়ে সুর করে আরম্ভ করে
আমি রব না ভব-ভবনে
শুনো হে শিব শ্রবণে।
যেনারী করে নাথ
হৃদিবক্ষে পদাঘাত
তুমি তারই বশীভূত
আমি তা সব কেমনে।
পতিবক্ষে পদ হানি
সে হল না কলঙ্কিনী
মন্দ হল মন্দাকিনী।
ভক্ত হরিদাস ভনে–
আমি রব না ভব-ভবনে।
কোথা থেকে সব লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে এসেছে, কিন্তু উদ্ধব দাসের গান শুনে আর দুঃখকষ্ট কারও মনে থাকে না। সবাই বাহবা দেয়। বলে বেশ বেশ দাসমশাই বেশ
কিন্তু ছোট বউরানির কানেও গেছে গানের সুরটা।
বললে–ওরে দুগ্যা, ওই
দুর্গার কানেও গেছে। আবার সেই বাউন্ডুলেটা এখানেও এসেছে নাকি? পদ্মকে ডেকে বললে–তোমার রানিমাকে ডাকো তো
কেন? রানিমা কী করবে?
দুর্গা বললে–তুমি ডাকো না
রানিমা আসতেই দুর্গা বললে–দেখুন রানিমা, ছোট বউরানি বড্ড ভয় পেয়ে গেছেন
কেন, কী হল?
দুর্গা বললে–ওই যে বাইরে গান গাইছে, ও কোথায় গাইছে? এদিকে আসবে নাকি ও?
মহারানি বললেন–কেন বলো তো?
আজ্ঞে, ও নোকটা খারাপ।
খারাপ? তা ও কে? কী করে চিনলে ওকে তোমরা?
দুর্গা বললে–পেরিন সাহেবের বাগানে যখন আমরা ছিলাম তখন ও আমাদের বড় জ্বালাত ক্লাইভ ওকে খুব ভালবাসত।
কেন?
ওই ছড়া কাটত কেবল, আর ছোট বউরানির সঙ্গে দেখা করতে চাইত।
মহারানি অবাক হয়ে গেলেন। বললেন–তা তোমার ছোট বউরানির সঙ্গে দেখা করতে চাইত কেন?
ও বলত ছোট বউরানি নাকি ওর বউ।
ওমা, সেকী কথা? ছোট বউরানি ওর বউ হতে যাবে কী করতে! ওর কি মাথা খারাপ?
দুর্গা বললে–না রানিমা, ছোট বউরানি তো মরালী নাম নিয়ে ক্লাইভসাহেবের ছাউনিতে ছিল, সেইজন্যে। ওর বউয়ের নামও তো মরালী কিনা–ওর বউ যে বিয়ের রাত্রেই পালিয়ে গিয়েছিল
এতক্ষণে মহারানি ব্যাপারটা সব বুঝলেন।
দুর্গা বললেও এদিকে আসবে নাকি?
মহারানি বললেন–না না, ও লোকটা তো এখানে আমাদের অতিথিশালায় প্রায়ই আসে আর গান। গায়। কিছুদিন থাকে আবার চলে যায়–এদিকে ও আসবে কী করতে?
ওদিক থেকে তখনও উদ্ধব দাসের গানের আওয়াজ আসছে
আমি রব না ভব-ভবনে।
শুনো হে শিব শ্রবণে।
পদ্ম মহারানির কাছে এল। বললে–রানিমা, মহারাজা এসেছেন, আপনাকে ডাকছেন
*
লক্কাবাগের লক্ষ আমগাছের বাগানে তখন ভারত-ভাগ্যবিধাতার এক কঠিন সংগ্রাম চলেছে। একদিকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নির্বীর্য মোগল-আধিপত্যের ধ্বংসস্তূপ, আর একদিকে ভাবীকালের বণিক সভ্যতার প্রতীক কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। পৃথিবীর ইতিহাসে যতবার অতীতকালের সঙ্গে ভাবীকালের লড়াই বেধেছে, ততবারই রাষ্ট্রবিপ্লব হয়েছে রক্তক্ষরণের পথে। ততবারই শান্তিপ্রিয় মানুষ বারবার বলেছে-না না, এ রাষ্ট্রবিপ্লব হয় হোক, কিন্তু সে যেন হিংসার পথ ধরে না আসে। সকলের অগোচরে হিংসা তখন আপন মনেই কেবল হেসেছে। রক্তপাত যা হবার হয়েছে, ধ্বংস যা হবার হয়েছে, রাষ্ট্রবিপ্লব যতটুকু হবার তাই-ই হয়েছে। কিন্তু হিংসা তা বলে থেমে থাকেনি। মানুষের বাইরের সভ্যতার মুখোশ খুলে দিয়ে হিংসা বারবার মুখব্যাদান করে অট্টহাসি হেসেছে। বলেছে–আমি আছি। কখনও যিশুখ্রিস্টের বাণী, চৈতন্যদেবের বাণী, মহম্মদের বাণী মানুষকে হতাশায় সান্ত্বনা দিয়েছে, শোকার্তকে আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু তারই পাশাপাশি আবার চেঙ্গিস খাঁ, তৈমুর লঙ, আলেকজান্ডারের আর্মি স্রোতের মতন জনপদের পর জনপদ আক্রমণ করে মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু শ্মশানভূমিতে রূপান্তরিত করে ছেড়েছে। একদিকে অত্যাচার, আর একদিকে বরাভয়-এই হল মানব সভ্যতার ইতিহাস। যখন কোনও দিক থেকে মানুষ সত্যের সন্ধান পায়নি তখন আকাশের তারায়, গ্রহনক্ষত্রে এই অনন্ত রহস্যের সন্ধান করেছে। বলেছে–হে অদৃশ্য দেবতা, উত্তর দাও, আমার চিরন্তন প্রশ্নের সমাধান করো। কিন্তু কেউ-ই তার সেই চরম আর পরম প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। মাঝখান থেকে ইতিহাস তার নিজের খেয়ালে এগিয়ে গিয়েছে–সত্য-অসত্য, সৎ-অসৎ, অত্যাচার-সান্ত্বনা সবকিছু একাকার করে দিয়ে অনাদি অনন্ত মহাকালের লক্ষ্যে পৌঁছোবার সাধনায় নির্বিকার চিত্তে সবকিছু ওলোটপালোট করে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে। আর মানুষও তেমনি করে অনন্তকাল ধরে আকাশের দিকে চেয়ে প্রার্থনা করে গেছে বলো কোনটা সত্য-সূর্য না রাত্রি? বলো কোনটা ধ্রুব, শিব না অশিব? বলো কোনটা শাশ্বত, হিংসা না অহিংসা?
