তা হলে?
বশির মিঞাই তো গোল বাধালে। নৌকো আটকে যাবার পর কী করবে বুঝতে পারেনি কান্ত। নাপিত বলেছিল–চলুন বাবু, হাঁটা-পথেই যাই, যদি ঘোড়াটোড়া ভাড়া পাওয়া যায় তো তাই নেওয়া যাবে
শাহি রাস্তার অবস্থাও ভাল নয়। কোথায় ঘোড়া! হাঁটা-পথে হেঁটে গেলেও এক প্রহর লাগবার কথা। কী করবে বুঝতে পারেনি কেউ। শেষে ভাগ্য ভাল, জোয়ার আসতে দেরি হয়নি। সেই নৌকোতেই চারজনে মিলে বৈঠা বাইতে বাইতে এসেছে। ঘেমে নেয়ে একেবারে প্রাণ বেরিয়ে গিয়েছে।
শোভারাম তাড়াতাড়ি ভেতর বাড়ির দাওয়ার কাছে গিয়ে ডাকলে–নয়ান
নয়ানপিসি এল। সব শুনে বললে–তা এখন আর কী করবে দাদা, এখন তো আর করবার কিছু নেই
বলে আবার বাসরঘরে গিয়ে ঢুকল। বললে–ওরে মেয়েরা, তোরা বরকে বিরক্ত করিসনে বাছা, বর এখন একটু ঘুমুবে–
নন্দরানি বললে–তুমি যাও তো এখেন থেকে নয়ানপিসি, বর এখন আমাদের, আমরা যা করাব। তাই করবে
নয়ানপিসি চলে যেতেই নন্দরানি বললে–আজকের রাত্তিরে বর কি একা মরির, বর আজকে আমাদের সকলের, কী ভাই বর, রাজি তো?
উদ্ধব দাস বললে–ঠাকরুনরা যেমন নিবেদন করবেন, তেমনই হবে
ও মা, বর যে দেখছি খুব সেয়ানা রে, বলি হ্যাঁ গো বর, কনেকে কোলে করতে পারবে তো?
উদ্ধব দাস বললে–কোলে তো আগে করিনি কখনও, ঠাকরুনরা বললে–করতে পারি
ওলো, বরের কথা শোন, তা তোমার বুঝি আগে আর বিয়ে হয়নি?
উদ্ধব দাস বলে–না।
নন্দরানি বললে–সকলের সামনে মরিকে কোলে করতে হবে কিন্তু, আমরা সকলে দেখব
উদ্ধব দাস বলে উঠল–তা আপনারা যদি নিবেদন করেন তো আপনাদের কোলে তুলতে পারি
সবাই হেসে লুটোপুটি খেতে লাগল। তারাময়ী বললে–ওমা, কী অসভ্য বর ভাই
তা হোক, কথাটা তারাময়ী বললে–বটে, তবু বরকে নিয়ে মেয়ে-মহলের যেন আনন্দ কৌতূহলের শেষ নেই।
নন্দরানি এগিয়ে এসে বললে–তা আমাকে কোলোকরা দিকি ভাই, দেখি তোমার কত ক্ষমতা
তারপরেই হঠাৎ ভয় পেয়ে সরে এল। বললে–ওমা, এবর যে সত্যি সত্যি হাত বাড়ায় গো, না, অত রসে কাজ নেই, নে লো তারা, মরিকে ধরে বরের কোলে বসিয়ে দে তো
মরালী এতক্ষণ ঘোমটায় মুখ ঢেকে চুপ করে বসে ছিল। একজন কানে কানে গিয়ে কী বললে। বলতেই মরালী কান সরিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রইল
ওমা, মরি যে কাঁদছে লো!
সবাই অবাক হয়ে গেল। এমন এক-বিয়েওলা বর পেয়েও মন ভরেনি মেয়ের। বুড়ো হোক, যাই হোক, এবরের সঙ্গে তো ঘর করতে পারবে তবু। এবরের সঙ্গে এক ঘরে তো শোবে। তবু কান্না! আর আমাদের!
নন্দরানি বুঝিয়ে বললে–আজকের দিনে বরের কোলে বসতে হয় রে, বরের কোলজোড়া রূপ দেখে আমরাও নয়ন সাখক করি, আয় ভাই মরি, ছিঃ
তবু কিছুতে মরালী নড়ে না। পাথরের মতন শক্ত হয়ে বসে রইল একপাশে।
অনন্তদিদি বললে–রাত পোয়ালে তখন তো আর আমরা কেউ আসব না রে, আর আসতে চাইলেও তোরা কেউ আসতে দিবিনে, আজকের মতো আমরা একটু আনন্দ করে নিই আমাদের নিজেদের তো সাদ-আহ্লাদ সব ঘুচে গেচে ছি, কথা শোন, আজ শুনতে হয়–
কিন্তু টানাটানি করেও কিছু ফল হল না। সকলকে আঁচড়ে কামড়ে একাকার করে দিলে মরালী। কিছুতেই সে বরের কোলে বসবে না।
এবার নন্দরানি এগিয়ে এল। বললে–তোরা সর দিদি, আমি দেখি
বলে–কোমরে কাপড় জড়িয়ে মরালীকে টেনে বরের কোলে বসাতে যেতেই এক কাণ্ড ঘটে গেল। নন্দরানির বুড়ি মা বাইরে থেকে আর্তনাদ করে উঠল–ও মা, অনন্ত, অনন্ত রে–
সমস্ত ঘরখানা যেন অকস্মাৎ এক নিমেষে স্তব্ধ পাথর হয়ে গেল সে কান্নার শব্দে। কী হল। কী হয়েছে! মেয়েরা সবাই এক অজ্ঞাত আতঙ্কে শিউরে উঠেছে।
কী হয়েছে জ্যাঠাইমা? কে বুঝি জিজ্ঞেস করলে।
আমার অনন্তর কপাল পুড়েছে মা! অনন্ত যে আমার মাছ না হলে খেতে পারে না গো! ও অনন্ত, অনন্ত রে–
বাসরঘর থেকে বেরিয়ে এল অনন্তবালা। সঙ্গে নন্দরানিও বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এল তারাময়ী, বেরিয়ে এল সবাই। বাইরে ভিড় হয়ে গেল এক নিমেষে। শোভারাম ছুটে এল। জিজ্ঞেস করলে কী হয়েছে বামুনদিদি?
নয়ানপিসিও এসে দাঁড়িয়েছিল। বললে–মেয়েকে করুণাময়ীর ঘাটে নিয়ে গিয়ে সিঁদুরশাখা ভেঙে দাও গে, ও আর কেঁদে কী করবে দিদি, কপালের লিখন তো কেউ খণ্ডাতে পারবে না–
ভিড় জমে গেল বাড়ির উঠোনে। বরের সঙ্গে কোনওদিন কথাও হয়নি অনন্তবালার। কথা হওয়া দূরে থাক, ভাল করে দেখেওনি বরকে কোনওদিন। সেই স্বামীর মৃত্যুসংবাদ শুনে কাতর হওয়া স্বাভাবিক কি অস্বাভাবিক সেকথাও কারও মনে এল না। স্বামীর মৃত্যু মানে জীবনের সব সাধ-আহ্লাদ থেকে বঞ্চিত হওয়া, পাথর যদি হয়েই থাকে তো সে শোকে না লোকাঁচারের সংস্কারে, কে জানে? আর কোনওদিন মাছ খেতে পারবে না অনন্তবালা। আর কোনওদিন শাঁখা-সিঁদুর-শাড়ি পরে বেরোতেই পারবে না, এ-ও কি কম ক্ষোভ, কম ক্ষতি! এর পর থেকে এই নয়ানপিসির মতো পরের বাড়ির উৎসবে-আনন্দে শুধু গতরে খেটে আনন্দ দিতে হবে। অথচ নিজেরই যেন এতদিন আনন্দ করবার কিছু ছিল!
তবু সহানুভূতির কথা শোনাল সবাই! অনন্তবালাকে নিয়ে যখন বামুনদিদি বাড়ি চলে গেল তখন সকলের মুখ দিয়েই শুধু একটা শব্দ বেরোল–আহা!
আর মেয়েরা যে-যেখানে ছিল সবাই সেই আহা’ শব্দের সঙ্গে নিজেদের জীবনের মর্মান্তিক সত্যিটাই প্রকাশ করে দিলে। অথচ এ-ঘটনা এত সত্য, এত স্বাভাবিক, এত সাধারণ যে তার কোনও প্রতিকারই নেই যেন কারও হাতে! নিতান্ত কার্যগতিকেই জামাই যাচ্ছিল নৌকো করে কোন দেশে, যাচ্ছিল হয়তো আর কোনও কন্যার পাণিগ্রহণ করতে–পথে ডাকাত পড়ে খুন করে ফেলেছে। ঘটনাটা ঘটেছে কতদিন আগে। তার পরেও কতদিন ধরে অনন্ত শাঁখা-সিঁদুর পরেছে, মাছ খেয়েছে, স্বামীর আসার প্রতীক্ষায় দিন গুনেছে, বছর গুনেছে, এতদিন পরে সে খবর হাতিয়াগড়ে এসে পৌঁছেছে। বাংলার গ্রামে গ্রামে যত বধূ ছিল সবাই একসঙ্গে অনাথা হয়ে গেল। এর বুঝি কোনও প্রতিকার নেই, কোনও সান্ত্বনাও নেই কোথাও। সেদিনকার উৎসবের মধ্যে হঠাৎ যেন কোনও অশনিপাতে সব নিঃশেষ হয়ে গেল।
