গৃহিণীর যেন এতক্ষণে একটা জরুরি কথা মনে পড়ল।
বললেন–হ্যাঁ গো, আমিও শুনছিলুম পদ্মর কাছে, কোথায় নাকি যুদ্ধ হচ্ছে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে? কীসের যুদ্ধ? এত যুদ্ধ করে কেন তোমাদের নবাব? খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই নাকি নবাবের?
মহারাজ বললেন–পদ্ম যুদ্ধের কথা জানলে কী করে?
ওমা, পদ্ম জানবে না তো কে জানবে? পদ্মর যে মেসোর বাড়ি ওখানে।
কোথায় মেসোর বাড়ি?
ওই পলাশি গাঁয়ে। যুদ্ধু লাগবার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মর মেসোরা যে সংসার তুলে সব ওর কাছে এখেনে এসে উঠেছে।
এখেনে উঠেছে মানে?
এখেনে মানে আমাদের অতিথশালায়। তা আমার ঝি, আমাদের এখানে উঠবে না তো বড়দির বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠবে? তুমি যে কী বলে? তাই ওর কাছেই শুনছিলুম, ভোরবেলা ফিরিঙ্গি পল্টনদের দেখেই ঘরদোর ছেড়ে সবাই পালিয়ে এসেছে। মাচার কুমড়ো, মাঠের ধান কিছু সঙ্গে আনতে পারেনি
মহারাজের মুখটা খানিকক্ষণের জন্যে গম্ভীর হয়ে গেল।
গৃহিণী বললেন–কী হল? পদ্মর মেসো এখেনে এসেছে বলে তোমার আবার রাগ হল নাকি?
মহারাজ হাসলেন। বললেন–তুমি বুঝবে না ছোটগিন্নি, আমি যে গম্ভীর হয়েছি কেন তা দু’দিন বাদে বুঝতে পারবে।
তার মানে? স্পষ্ট করে খুলে বলল, আমি এত হেঁয়ালি বুঝিনে–
মহারাজ বললেন–শুধু পলাশি গাঁ নয়, আমাকেও বোধহয় একদিন কেষ্টনগর ছেড়ে অন্য লোকের আশ্রয়ে গিয়ে উঠতে হবে। দিনকাল এমনই আসছে। আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি তার আভাস। তুমি ভাবো আমি দিনরাত কাব্যচর্চা করি আর ভাঁড়ামি শুনি গোপালবাবুর কাছ থেকে। কিন্তু মাথার মধ্যে সবসময় আমার ওই কথা ঘুরছে। আমি ঘুমিয়ে পর্যন্ত শান্তি পাই না, খেয়ে পর্যন্ত তৃপ্তি পাই না।
তা অত কথা ভাবো কেন তুমি?
ভাবব না? আমি না ভাবলে কে ভাববে? কাল রাত্রে তুমিও তো ঘুমিয়েছ। কিন্তু যদি জেগে থাকতে তো দেখতে পেতে আমি ওই সামনের ছাদে পায়চারি করেছি।
কেন গো? শরীর ভাল আছে তো তোমার?
শরীরের কিছু হয়নি। কিন্তু কেবল ভেবেছি, এ ভাল করলুম না খারাপ করলুম!
কী ভাল করলে? খারাপই বা কী করলে তুমি?
মহারাজ বললেন–এই যে তোমার ঝি পদ্মর মেসোরা গ্রাম ছেড়ে অতিথিশালায় এসে উঠল, এই যে তিয়াগড়ের রানিবিবি আমার অন্দরমহলে এসে উঠলেন, এই যে লক্কাবাগের মাঠে ফিরিঙ্গি পল্টনরা এসে কামান দাগতে শুরু করেছে, এর পেছনে তো সেই আমিই!
তুমি! তুমি মানে?
মহারাজ বললেন–হ্যাঁ, আমি, আমি! ছেলেদের কাউকে বলিনি সে কথা। বলবার মতো মতিগতিও নেই এখন! কেবল ভাবছি কেন আমি করতে গেলুম এসব!
গৃহিণী বললেন–তা কবিরাজমশাইকে না-হয় ডাকো চ্যবনপ্রাশ খেলে তো পারো
মহারাজ বললেন–তোমাকে এত কথা বলতে যাওয়াই দেখছি আমার ঘাট হয়েছে। তুমিই যদি এত কথা বুঝবে তা হলে…।
বলতে গিয়েও থেমে গেলেন মহারাজ। বললেন–যাই, নীচেয় যাই
তা তো যাবেই, আমার কাছে থাকতে তো তোমার ভাল লাগে না।
মহারাজ বললেন–দেখো, এখন রাগ-অভিমান-অনুরাগের সময় নয়। একদিন এই আমিই ফিরিঙ্গি ক্লাইভসাহেবকে নবাবের বিরুদ্ধে তাতিয়ে দিয়ে এসেছি। একদিন এই আমিই ভেবেছি, ক্লাইভসাহেব এসে নবাবকে যুদ্ধ করে হারিয়ে দিলে আমার ভাল হবে–
গৃহিণী বললেন–ক্লাইভ সাহেব! যে-সাহেবের কাছে এই এরা এতদিন আটক হয়েছিল? সে তো খুব ভাল লোক!
ভাল লোক? কে বললে–ভাল লোক? কে বলেছে তোমায় ক্লাইভসাহেব ভাল লোক?
গৃহিণী বললেন–ওই তো ওরাই বলছিল। ওই হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের বউ। ওরা বলছিল এতদিন ছিল ওরা পেরিন সাহেবের বাগানে, একদিনও ওদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি। ওদের জন্যে সাহেবও নাকি মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল, গোরুর মাংস মুরগির মাংস পর্যন্ত খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল–ওদের ঝি-টাকে দিদি’ দিদি বলে ডাকত–
মহারাজ হাসলেন–তাই দিয়ে মানুষকে বিচার করতে নেই।
ওমা, মানুষকে আবার তবে কী দিয়ে বিচার করব?
তুমি ওদের কী জানো শুনি? কতটুকু জানো? ওরা এদেশে এসেছে ব্যাবসা করতে, ব্যাবসা করে টাকা উপায় করতে, ওরা তো ভাল ব্যবহার করবেই। ব্যাবসাদার মানুষরা কড়া করে কথা বললে–তাদের ব্যাবসা চলে? ওরা হাসলেই তো ভয় হবার কথা। ওই হাসি দেখিয়েই তো আমাদের সকলের মন ভুলিয়েছে ওই সাহেবরা। আমরা কৃতার্থ হয়ে গিয়েছি
তুমি কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না।
মহারাজ বললেন–তোমার বুঝেও দরকার নেই। বুঝলে আর তুমি মেয়েমানুষ হয়ে জন্মাতে না। আমি যাই, নীচেয় যাই
গৃহিণী বললেন–তা সারা দিন-রাত নীচেয় তোমার বিষ্ণুমহলেই থাকলে পারো? ওপরে আমার ঘরে কী করতে আসো? এরপর থেকে পদ্মকে বলব আমার একলার বিছানা করতে
বলে রাগ করে গৃহিণীই চলে যাচ্ছিলেন। মহারাজ হাতটা ধরে ফেললেন।
বললেন–রাগ কোরো না। রাগ করতে নেই আমার ওপর। যেদিন সমস্ত কেষ্টনগর জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে সেদিন রাগ কোরো আমার ওপর। মনে কোরো না আমি পাগল হয়ে গিয়েছি। নবাবের ওপর রাগ করে আমরাও তোমার মতন নবাবের পাশ থেকে সরে এসেছি। জানো, নবাবের আজকে কেউ নেই।
নবাবের কথা ভাববার সময় নেই আমার, আমার কথা কে ভাবে তার ঠিক নেই, আমার ভাবতে বয়ে গেছে নবাবের কথা!
মহারাজ বললেন–তুমি না-ভাবলেও আমাকে ভাবতেই হবে!
কেন, নবাব কি তোমাকে খাওয়ায় না পরায়? আমাদের জমিদারি আছে, জমিদারির আয় থেকে আমরা খাচ্ছি। নবাব মরল কি বাঁচল তা নিয়ে ভারী তো আমাদের মাথাব্যথা
