মেহেদি নেসার সাহেব কোথায়?
তিনি তো এখানে নেই খোদাবন্দ! তাকে খুঁজেছিলাম
তা হলে ইয়ারজান সাহেবকে ডাক! বল, ওদের বেত মারতে হবে না। লড়াই খতম হয়ে গেলে আমিই সকলকে বেত মারব।
নেয়ামত কুর্নিশ করে চলে যাচ্ছিল।
মির্জা মহম্মদ হঠাৎ ডাকলে–শোন
নেয়ামত ফিরে দাঁড়াল। নবাব মির্জা মহম্মদ গদি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। এমন কখনও হয়নি আগে। নবাব যাকে যা হুকুম দিয়েছে, বরাবর তখনই সে তা তামিল করেছে। আজ কিন্তু নবাবের মনে হল নবাব আজকে নিজেই যাবে।
মির্জা মহম্মদ উঠে বাইরের দিকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আবার মনে পড়ল। জড়োয়ার তলোয়ারখানা কোমরে ঝুলিয়ে নিয়ে বললে–চল, আমি নিজেই যাচ্ছি–
বলে তাঁবু থেকে বেরোল। পেছন পেছন নেয়ামত চলতে লাগল।
*
সেদিন কেষ্টনগরের রাজবাড়ির অতিথিশালার ভেতর থেকেই উদ্ধব দাসের গান শোনা গেল
আমি রব না ভব-ভবনে।
শুনো হে শিব শ্রবণে ॥
যে-নারী করে নাথ,
পতিবক্ষে পদাঘাত…
রান্নাবাড়ির লোকজন যে-যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
বলে-ওই গো, দাসমশাই এয়েচে—
রসুই বামুন হাতা-খুন্তি ফেলে এল। উদ্ধব দাস তখন পুঁটুলিটা নামিয়ে রেখে হাত-পা ধুচ্ছে আর গুনগুন করে গান গাইছে।
রসুই বামুন বললে–কী গো দাসমশাই, অ্যাদ্দিন কোথা ছিলে?
উদ্ধব দাস সেকথায় কান না দিয়ে বললে–মুগের ডাল রেঁধেছ?
রসুই বামুন বললে–কোন মুগের ডাল খাবে তুমি বলো না, ঘোড়া মুগ না সোনা মুগ?
উদ্ধব দাস বললে–আমার কাছে সবই সমান, আমার ঘোড়ারও দরকার হয় না, সোনারও না। ওসব নিয়ে রাজা-মহারাজা নবাবদের কারবার।
পথে যুদ্ধ দেখে এলে নাকি দাসমশাই?
উদ্ধব দাস বললে–পথে একটা ধাঁধা বানিয়েছি গো, ওই যুদ্ধ নিয়ে, শুনবে?
বলেই আরম্ভ করল-বলো তো এর কী উত্তর হবে?
উভয় পক্ষের রাজা হয়ে ক্রোধমন।
সম্মুখ সংগ্রামে দেহে দিল দরশন ॥
উভয় পক্ষের সৈন্য সংহার হইল।
এক বিন্দু রক্ত কিন্তু ভূমে না পড়িল ॥
এ হেন অদ্ভুত যুদ্ধ কেবা দেখিয়াছে।
পদাতিক জয়ী হলে সেনাপতি বাঁচে ॥
হঠাৎ সরখেল মশাই ঢুকে পড়ল। উদ্ধব দাস জিজ্ঞেস করলে–কী গো প্রভু, মুখটা অত উদ্বিগ্ন কেন?
সরখেল মশাই রেগে গেল। বললে–তুমি থামো, ঘর-সংসার তো করলে না! তোমার ধাঁধা শুনলে আমার পেট ভরবে?
আজ্ঞে প্রভু, সংসারটাই তো ধাঁধা!
দুর আহাম্মক, সংসারটা করলি কবে যে বলছিস সংসার ধাঁধা। সংসার করলে বুঝতিস এ ধাঁধা নয়, গোলকধাঁধা!
বলে রসুই বামুনের দিকে চেয়ে বললে–কী রে, দেওয়ানমশাই ইদিকে এয়েচে দেওয়ানমশাই গেলেন কোথায়?
বলতে বলতে আর সেখানে দাঁড়াল না সরখেল মশাই। সোজা আবার বাইরের দিকে চলে গেল।
উদ্ধব দাস হাহা করে হেসে উঠল। বললে–গোলকধাঁধা আমাকে চেনাতে এসেছে, দেখলে তো?
বলে আবার গান আরম্ভ করে দিলে:
হরি হে, গোলক ধাঁধায় ঘুরে ঘুরে মরি।
এবার তরী ভিড়াও ঘাটে ভবসাগর তরি ॥
ওদিকে দেওয়ানমশাই তখন বলছেন–দেখাই পেলিনে? তা বাইকে জিজ্ঞেস করলিনে কেন ছোটমশাই কোথায় গেছেন?
আজ্ঞে, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেউ বলতে পারলে না।
তা হলে দাঁড়া, আমি মহারাজকে বলে আসছি।
সরখেল মশাই বললে–আজ্ঞে, ছোটমশাই সেই এক মাস আগে হাতিয়াগড় থেকে মুর্শিদাবাদে যাবার নাম করে বেরিয়েছেন, তারপর আর তার পাত্তা নেই–জগা খাজাঞ্চিবাবু খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন–
কালীকৃষ্ণ সিংহমশাই বললেন–আচ্ছা তুই যা, আমি মহারাজকে গিয়ে বলছি
বলে দেওয়ানখানা থেকে বেরিয়ে রাজবাড়ির দিকে চলতে লাগলেন।
*
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তখন গৃহিণীর সঙ্গে কথা বলছিলেন অন্দরমহলে।
গৃহিণী বলছিলেন তোমার হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে দেখলাম। মেয়েটা ভাল, একেবারে গোবেচারা মানুষ, কিন্তু ওর সঙ্গের ঝি-টা হাবাজ মাগি। আমাকে বলে কিনা বশীকরণ জানে উচাটন জানে, বাটি-চালা নল-চালা সব জানে। আরে, অতই যদি জানবি তুই তো ওই ফিরিঙ্গি সাহেবটাকে উচাটন করলেই পারতিস!
মহারাজ হেসে বললেন–তা ঝিরা একটু জাঁহাবাজই হয়।
ঝিরা জাঁহাবাজ হলেই হল? কই, আমার তো পদ্মকে দেখেছ তুমি, সে অমনি করে আঁহাবাজি করুক দিকি আমার কাছে। আমি ঝামা দিয়ে তার নাক ঘষে দেব না! কিন্তু যাই বলল, রানিবিবি কিন্তু সোয়ামি বলতে অজ্ঞান।
মহারাজ বললেন–ওই হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইও তাই। যে-দিন থেকে স্ত্রী নিরুদ্দেশ সেই দিন থেকেই একেবারে দিশেহারা হয়ে গেছেন। একবার হাতিয়াগড়, একবার মুর্শিদাবাদ, কেষ্টনগর, আর একবার সুতোনুটি করছেন। ওঁদের খাওয়াদাওয়ার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?
গৃহিণী বললেন–আমি তো ওদের ছুঁই না
কেন? ছোঁও না কেন?
ফিরিঙ্গি সাহেবের খানা খেয়েছে, জাত-জন্ম আছে নাকি ওদের যে ছোঁব?
তা হলে ওঁরা কার রান্না খাচ্ছেন? বাবুর্চি খানসামার রান্না?
না, তা কেন, ওই যে ঝি-টা আছে, ওই-ই নিজে রান্না করে নেয়। ওরা তো মুখে বলে ফিরিঙ্গির ছোওয়া খায়নি। কিন্তু মুখের কথায় বিশ্বাস করে তো আর ওদের রান্নাবাড়িতে ঢুকতে দিতে পারা যায় । তাই তো আর বেশিদিন থাকতে চাইছে না এখানে। তা হ্যাঁগো, ওদের কবে পাঠাবে হাতিয়াগড়ে?
মহারাজ বললেন–হাতিয়াগড়ে তো পাঠালেই হল না। অনেক ভেবেচিন্তে তবে পাঠাতে হবে। সেই জন্যেই তো ছোটমশাইকে কেষ্টনগরে ডেকে পাঠিয়েছি। সরখেল গেছে আমার চিঠি নিয়ে। ওদিকে নবাবও আবার ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে গেছে।
