একজনকে পাশে দেখে কান্ত জিজ্ঞেস করলে ক্যা হুয়া হ্যায় ভাইয়া?
লোকটা কান্তর দিকে চাইলে একবার ভাল করে। তারপর হয়তো কান্তকে সন্দেহ হল, কিন্তু কিছু না বলে অন্য দিকে চলে গেল।
কান্ত চকবাজারের রাস্তা দিয়ে আরও এগিয়ে চলল। এ-সময়ে অন্যদিন এ রাস্তার এ-চেহারা থাকে না। সব যেন ছন্নছাড়া। যাকেই জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে, সে-ই সন্দেহ করে। কোতোয়ালির সামনেও অন্যদিনকার মতো পাহারাদার নেই। ইনসাফ মিঞার নহবত থেমে গেছে। আরও ওদিকে মেহেদি নেসার সাহেবের হাবেলি। ছোটমশাই আর মরালীকে নিয়ে গিয়ে কোথায় তুলল মেহেদি নেসার সাহেব?আরও ওদিকে মহিমাপুর। কান্ত সেইখানে গিয়ে দাঁড়াল। সূর্যের আলো একটু একটু করে ফরসা হচ্ছে। সমস্ত মুর্শিদাবাদটা যেন হঠাৎ বড় ফিকে হয়ে গেছে।
কিন্তু বশির মিঞাই বা কোথায় গেল? টাকার লোভ ছাড়বার পাত্র তো বশির মিঞা নয়। তা হলে হঠাৎ কী এমন হল যার জন্যে তাকে না নিয়ে বশির মিঞা চলে গেল? আর চলেই যদি গেল তো কোথায় গেল?
শহরের মধ্যে তখন আরও জোরে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। সবাই সবাইকে জিজ্ঞেস করছে-ক্যা হুয়া হ্যায় ভাইয়া?
ভিখু শেখ যে ভিখু শেখ, সারা রাত পাহারা দেয় মহিমাপুরের মহাপজির ফটকে, সেও কেমন যেন চনমন করে উঠল। বললে–ক্যা হুয়া?
শুধু মুর্শিদাবাদে নয়, শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা হিন্দুস্থানেই এখন ওই প্রশ্ন উঠেছে–ক্যা হুয়া? শিখ, মারাঠা, ফরাসি, ডাচ, সবাই ১৭৫৭ সালের ২৪ জুন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই বাইরের হল্লা শুনে। কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করেছে-ক্যা হুয়া। হোয়টস আপ?
*
খবরটা ক্লাইভ সাহেবের কাছে আগেই এসেছিল। কিন্তু তখনও বিশ্বাস হয়নি। নবাব কি এত বোকা হবে?
তখন ল্যাসিংটনকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কর্নেল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে কবর দিয়ে এসেছে। কিন্তু কাদার সময় পরেও আসবে। ওয়ার আগে, তার পরে ইমোশন। বাইরে এসে দাঁড়াতেই আকাশের সূর্য নজরে পড়ল। পুরো মনসুন।
যে-যুদ্ধ ঘটাবার জন্যে বহুদিন ধরে ইতিহাস ষড়যন্ত্র করে আসছে, এমন করে যে তার শুরু হবে সেকথা কে ভেবেছিল। কে ভেবেছিল সাতসাগর তেরোনদী পেরিয়ে এসে কোথাকার কোন একত্রিশ বছর বয়েসের একটা ছেলেকে এই লক্কাবাগের আমবাগানে এসে নিজের সমস্ত ইমোশনের গলা টিপে এমন করে সূর্যের দিকে চেয়ে হত্যা করতে হবে।
সামনে আয়ার কুট দাঁড়িয়ে ছিল।
কর্নেল হঠাৎ যেন তখন তাকে এই প্রথম দেখতে পেলে।
বললে–চুপ করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? কী চাও?
আয়ার কুট বললে–আমার সেপাইরা বলছে, তারা এবার রেস্ট নেবে–বিশ্রাম করবে
হোয়াই? কেন?
নবাবের অত বড় আর্মির সঙ্গে লড়াই করতে তাদের ভয় লাগছে। বলছে ওরা এখানে মরতে আসেনি, যুদ্ধ করতে এসেছে!
কর্নেল ক্লাইভ চিৎকার করে উঠল যুদ্ধ করা আর মরা কি আলাদা জিনিস? তুমি নিজেও কি মরতে ভয় পাও?
আয়ার কুট বললে–আমি আমার কথা বলছি না কর্নেল, আর্মি সেপাইদের কথা বলছি–তারা নাম্বারে কম!
তুমি যখন মিলিটারিতে ঢুকেছিলে তখন কি জানতে না যে যুদ্ধ করা মানেই মরা?
আমি বলছি কর্নেল, ওটা আমার কথা নয়, আমার সোলজারদের কথা!
ক্লাইভ বললে–চলল, আমি নিজে শুনতে চাই কে ওকথা বলছে। যারা মরতে ভয় পাচ্ছে আমি তাদের শুট করব, আমি তাদের গুলি করে মারব–চলো–
আয়ার কুট তখনও দাঁড়িয়ে ছিল।
ক্লাইভ বললে–চলো
ক্লাইভের গলার আওয়াজে থরথর করে কেঁপে উঠল আয়ার কুট। তারপর চলতে লাগল। কর্নেল তখন হাতের রিভলভারটা আরও বাগিয়ে ধরেছে।
বললে–চলো, কুইক, তাড়াতাড়ি চলো–
আর লক্কাবাগের আর-একদিকে নবাবের ছাউনির ভেতর মির্জা মহম্মদ তখন চিৎকার করে ডাকলে–নেয়ামত।
বাইরে যেন কোথায় গোলমাল হচ্ছে। এ গোলমাল যুদ্ধের গোলমাল নয়। ওদিকে মিরমদন আর মোহনলালের সেপাইরা কামান ছুঁড়ে চলেছে একটার পর একটা। গোলমাল পেছন দিক থেকে আসছে।
আবার ডাকলে–নেয়ামত!
খোদাবন্দ!
অত গোলমাল হচ্ছে কীসের? ওরা কারা?
নেয়ামত কী বলতে গিয়েও যেন থেমে গেল।
বল, কী বলছিলি, বল?
খোদাবন্দ, খিদমদগারদের বেত মারা হচ্ছে!
বেত মারা হচ্ছে? কেন?
ওরা খোদাবন্দের সোনার কলকে চুরি করেছিল।
সোনার কলকে চুরি করেছিল বলে বেত মারতে কে বলেছে?
ইয়ারজান সাহেব!
নবাব মির্জা মহম্মদ খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। বাইরে থেকে খিদমদগারদের আর্তনাদ কানে আসছে। সপাং সপাং শব্দগুলো বাতাসের বুক চিরে এসে লাগছে তাবুর দেয়ালে। মির্জা মহম্মদের মনে হল ও যেন বেত মারার শব্দ নয়, ও যেন বাংলা মুলুকের আত্মার আর্তনাদ। বহু দূর শতাব্দী থেকে যত। আত্মা বেহেস্তে গেছে, যত লোক নবাবদের হাতে জান দিয়েছে, চেহেল্-সুতুনে যত বেগম যত খোঁজা আত্মহত্যা করেছে, সবাই যেন একযোগে আজ লঙ্কাবাগের লড়াইয়ের মাঠে এসে তার জবাবদিহি চাইছে। আমি জবাবদিহি দেব কী করে? আমি কেন অন্যের পাপের উত্তরাধিকারী হব? মির্জা মহম্মদ নিজের মনেই যেন নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়ে শান্ত হল। তা, তো বটেই! আমি যেমন উত্তরাধিকারসূত্রে তোমাদের সোনার কলকের উত্তরাধিকারী হয়েছি, তেমনই উত্তরাধিকারী হয়েছি তোমাদের পাপেরও। পাপ সম্বন্ধে তো আমার কোনও জ্ঞান ছিল না আগে। তুমিই তো আমাকে শেখালে মরিয়ম বেগমসাহেবা! কেন শেখাতে গেলে? তুমি না শেখানো পর্যন্ত আমি তো বেশ ছিলাম। আমার রাত্রে ঘুম আসত না, তা না আসুক। কিন্তু এ যে আরও মর্মান্তিক। এ যে আরও কষ্টের। এতদিন তো জানতে পারিনি আমার এই অন্তরাত্মার মধ্যেই তুমি আছ। তোমাকে এতদিন অস্বীকার করেছি বলেই তো আজ আমাকে এই এদের সকলকে নিয়ে লঙ্কাবাগে আসতে হয়েছে। আমি এদের ভাগ্যবিধাতা আর নই, একথা তুমিই তো জানিয়ে দিলে মরিয়ম বেগমসাহেবা। তুমিই জানিয়ে দিলে দেশের ভাগ্যবিধাতার ওপরেও আর একজন ভাগ্যবিধাতা আছে–সে দুনিয়ার মানুষের ভাগ্যবিধাতা!
