চকবাজারের কাছে আসতেই কান্ত বশীরকে জিজ্ঞেস করলে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে কোথায় রাখা হবে রে?
কেন, তোর জেনে কী ফয়দা?
বল না। আমার জানতে বড় ইচ্ছে করছে।
তুই আসরফি কখন দিবি বল?
আমাকে ছেড়ে না দিলে দেব কী করে? আমার কাছে তো আসরফি নেই, আমাকে তো জোগাড় করে আনতে হবে?
কখন জোগাড় করে আনবি?
তুই যখন ছেড়ে দিবি তখনই এনে দেব। এখন যদি ছেড়ে দিস আমাকে তো দু’প্রহর পরেই এনে দেব।
বশির মিঞা চলতে চলতে কী যেন ভাবতে লাগল। তারপর বললে–না, তোকে ছাড়তে পারব না, মেহেদি নেসার সাহেব জানতে পারলে আমার গর্দান নিয়ে নেবে। আমাকে হুকুম দিয়ে দিয়েছে। তোদের সকলকে নিয়ে ফাটকে পুরতে, কোতোয়ালির ফাটকে–
তা হলে কী হবে?
বশির মিঞা বললে–তুই এখনই নিয়ে আয়, কিন্তু কোথা থেকে আনবি?
কান্ত বললে–আমি যে দোকানে থাকি, সেইখান থেকে। সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকান থেকে। কিন্তু তুই মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ছেড়ে দিবি তো ঠিক? মেহেদি নেসার সাহেব কিছু বলবে না তো? কথা দিচ্ছিস তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি। আসরফি পেলে আমি সব করতে পারি। আরও বেশি আসরফি দিলে আমি তোকেও ছেড়ে দিতে পারি। দেনা তুই? এক হাজার আসরফি দে তুই আমাকে, তোকেও ছেড়ে দিচ্ছি।
কান্ত বললে–আমার দরকার নেই। আমি ছাড়া পেতে চাই না। আমার মরে যাওয়াই ভাল।
ততক্ষণে সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানটার কাছে আসতেই বশির মিঞা বললে–আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি, তুই গিয়ে নিয়ে আয়–
কান্তর হাতের কাছি খুলে দিলে বশির। তারপর বললে–বেশি দেরি করিসনি, যা, আমি দাঁড়িয়ে আছি এদের নিয়ে
কান্ত ছাড়া পেয়ে দোকানটার পেছন দিকের দরজায় গিয়ে আস্তে আস্তে টোকা দিলে–বাদশা ও বাদশা
অনেক ডাকাডাকির পর বাদশা উঠল। ভেতর থেকে দরজা খুলে কান্তবাবুকে দেখেই অবাক হয়ে গেছে।
কান্তবাবু আপনি? কোথায় ছিলেন অ্যাদ্দিন?
কান্ত তখন হাঁফাচ্ছে। কী বলবে বুঝতে পারছে না। আসরফির কথাটা কেমন করে পাড়বে তা-ই ঠিক করতে পারছে না। সারাফত আলি সাহেব যদি টাকা না দেয়? বাদশার নিজের তো টাকা নেই, সারাফত আলি সাহেবে কাছে টাকা চাইতে হবে। বুড়ো যদি না দিতে চায়! যদি জিজ্ঞেস করে কীসের টাকা? কীসের জন্যে এত টাকা দরকার? তা হলে কী উত্তর দেবে কান্ত? কান্ত তো সারাফত আলির কোনও সাধ মেটায়নি! হাজি আহম্মদের বংশ তো এখনও নষ্ট হয়নি। এখনও তো চেহেল্-সুতুনের মধ্যে পাপের আর দাসত্বের আর কলঙ্কের লীলা চলেছে। সারাফত আলির আরকে তো কোনও কাজ হয়নি। নবাব সুজাউদ্দিনের আমলে যা চলছিল, আলিবর্দির আমলেও যা চলছিল, যেমন করে চলছিল, তেমনি করেই তো সব এখনও চলছে! তা হলে কেন বুড়ো টাকা দেবে তাকে?
কী হল আপনার কান্তবাবু? শির গোলমাল হল নাকি?
কান্ত বললে–সারাফত আলি সাহেব কোথায়?
সাহেব তো ঘুমোচ্ছ। সাহেবকে ডাকব? কিছু দরকার আছে?
না, আমিই সাহেবের কাছে যাচ্ছি।
কান্ত আস্তে আস্তে সারাফত আলির শোবার ঘরের দিকে গেল। কী বলবে সে? কী বলে টাকা চাইবে আলি সাহেবের কাছ থেকে? মরিয়ম বেগমসাহেবার জন্যে টাকার দরকার বললেই বুড়ো জিজ্ঞেস করবে, মরিয়ম বেগমসাহেবার অত টাকা কী হবে! জিজ্ঞেস করবে মরিয়ম বেগমসাহেবা কান্তর কে? আরও জিজ্ঞেস করবে মরিয়ম বেগমসাহেবা আরক খায় কিনা। সব কথার ঠিক ঠিক উত্তর না দিতে পারলে কেন তাকে অত টাকা দেবে? টাকা দিলে কি হাজি আহম্মদের বংশের সর্বনাশ হবে?
মিঞাসাহেব।
কোনও উত্তর নেই। পেছনে বাদশা দাঁড়িয়ে ছিল। সে বললে–আরও জোরে চিল্লান
রাত্রে নেশা করে শুয়েছে, সামান্য ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙবার কথা নয়। তাই সেও আবার ডাকলে–মিঞাসাহেব, মিঞাসাহেব
এতক্ষণে সারাফত আলি চোখ মেলে চাইলে। লাল লাল একজোড়া চোখ। সেই চোখের দিকে চেয়ে কান্তর ভয় লেগে গেল। আলি সাহেব যেন সেই চোখ দিয়েই বলতে চাইলে কৌন বেত্তমিজ আমার ঘুম ভাঙিয়ে দেবার সাহস করলে? কৌন?
কিন্তু কিছু বলবার আগেই আর একটা কাণ্ড হল। বাইরে যেন হল্লার মতো শব্দ হতে লাগল। এত ভোরে হল্লা কীসের? যেন অনেক লোক রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। এমন তো হয় না এই সময়ে। সবাই মিলে দোকানের বাইরে জড়ো হচ্ছে আর গোলমাল করছে। ওদিকে চেহেলসূতুনের মাথায় ইনসাফ মিঞার নহবত হঠাৎ থেমে গেল। কী হল? এমন তো হয় না। সারাফত আলি, বাদশা, কান্ত, সবাই সেই ঘরের মধ্যেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল। কার সঙ্গে কে কী কথা বলতে এসেছিল সবাই তা ভুলে গেল। বাদশা হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। সারাফত আলি অন্যমনস্ক হয়ে বললে–বাহার মে হল্লা কেঁও হো রহা হ্যায়?
ততক্ষণে গোলমাল আরও বেড়ে উঠেছে। কাও ভাবনায় পড়ল। বশির মিঞা কি মাঝিমাল্লাদের সঙ্গে ঝগড়া আরম্ভ করে দিলে।
কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে আসতেই অবাক হয়ে গেল। দলে দলে সব লোক বেরিয়ে পড়েছে। এলোমেলো আবহাওয়া। বশির মিঞাও নেই। সঙ্গের মাঝিমাল্লারাও সব কোথায় চলে গিয়েছে। কিন্তু কান্ত কিছু বুঝতে পারলে না। এসব কী করছে এত লোক? শহরে যেন অরাজক অবস্থা। এরা সব কোথায় চলেছে? বশির মিঞা গেল কোথায়? লোকগুলো যেন খুব ভয় পেয়ে গেছে মনে হচ্ছে। কী বলছে ওরা? গুজগুজ ফিসফিস করে সব কথা। যেন মহা বিপর্যয় ঘটে গেছে কোথাও।
