কান্ত বললে–আমি ছাড়া পেয়ে দরকার নেই, তুই দয়া করে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ছেড়ে দে, তা হলেই আমি আর কিছু চাই না
না বললে–আমি বেগমসাহেবাকে ছাড়ব না।
কান্ত বললে–তুই যা চাইবি আমি তাই-ই দেব; তুই যদি মোহর চাস তো তাই-ই দেব, আসরফি চাইলে তাও দেব।
মোহরের কথা শুনে বশির মিঞা যেন কেমন নরম হয়ে এল।
বললে–আসরফি কোথায় পাবি তুই?
সে যেখানে পাই যেমন করে পাই, তুই যত আসরফি চাস আমি দেব।
কোথা থেকে আসরফি পাবি তুই?
তোর আসরফি পেলেই তো হল। সে যেখান থেকে পারি আমি জোগাড় করব।
তারপর বশির মিঞার বোধহয় লোভ হতে লাগল। মাঝিমাল্লারা তখন প্রাণপণে পঁাড় টানছে। তাদের দিকে একবার চেয়ে দেখলে। তারপর হাত-পা বাঁধা কান্তর কাছে এসে সরে বসল।
বললে–সত্যি বলছিস তুই আসরফি দিবি আমাকে?
কান্ত বললে–সত্যি দেব, তুই আমার পুরনো বন্ধু, তোর কথায় আমি বেভারিজ সাহেবের নোকরি ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি। তুই সেদিন আমার উপকার না করলে আমি উপোস করতুম। তোকে কি মিথ্যে কথা বলতে পারি?
কত দিবি?
তুই যত চাইবি। মুর্শিদাবাদে আমার একজন লোক আছে, আমার উপকারের জন্যে সে যত আসরফি চাইব তত দেবে। সে আমায় খুব ভালবাসে
দেখ–বশির মিঞা আরও কাছে সরে এসে বসল। বললে–দেখ, তুই আমার প্রাণের দোস্ত, কিন্তু ভাই, আমার টাকার বড় টানাটানি চলছে, আমার দুটো বিবি, আমি তাদের ভাল তরিবত করতে পারি না টাকার অভাবে। তার জন্যেই তোর কাছ থেকে টাকা নিচ্ছি। শালা নিজামতে নোকরি করে যা পাই তাতে চলছে না। অথচ নিজামতের কাজে আমি কত খাঁটি তা তো দেখছিস নিজের ফুপা সে-ও আমাকে গালাগালি দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দেয়, আর ওই যে মেহেদি শালা হারামজাদা বসে আছে, ও কি কম শয়তান ভেবেছিস?নবাবের সঙ্গে দোস্তি করে নবাবের কম নেমকহারামি করেছে। সব শালা চোর জুটেছে নিজামতে! তাই তো বলছি এ-নিজামত আর বেশিদিন চলবে না!
চলবে না? চলবে না মানে?
কান্তর কেমন আশা হল যেন। যদি না চলে তো মরালী তো ছাড়া পাবে?
বশির মিঞা বললে–চুপ, অত জোরে কথা বলিসনি। শালা শুনতে পাবে। তুই তঅ জানিস লক্কাবাগের মাঠে লড়াই শুরু হয়ে গেছে!
লড়াই? কীসের লড়াই?
ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে নবাব তো লড়াই করছে এখন। সেখান থেকেই তো আসছি আমরা। মুর্শিদাবাদে তোদের সবাইকে রেখে মেহেদি শালা আবার সেখানে যাবে! জবর লড়াই শুরু হয়ে গেছে সেখানে রে। সেই লড়াইতেই তো সব ফয়সালা হয়ে যাবে!
কী ফয়সালা হবে?
সে-সব তোকে বলব না। সব বানচাল হয়ে যাবে। দেখছিস না মেহেদি শালা বসে বসে কেবলই তাই ভাবছে, ওর এদিকে তেমন মন নেই। ওবজরায় রয়েছে হাতিয়াগড়ের রাজা, আর এবজরায় রাজার আওরত! ছোটমশাই জানেও না তার রানিবিবিকে আমরা ধরে নিয়ে চলেছি।
ছোটমশাই? ছোটমশাই রয়েছে ওই বজরাতে?
বশির মিঞা কান্তর মুখ চাপা দিয়ে দিলে। বললে–আবার চিল্লাচ্ছিস? বলছি না শালা মেহেদি নেসার সাহেব রয়েছে ওখানে, শুনতে পাবে যে!
সারা রাস্তাটাই বশির মেহেদি নেসারকে গালাগালি দিতে দিতে চলতে লাগল। সেই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কান্ত শুধু শুনতে লাগল বশিরের কথাগুলো শুনতে শুনতে বড় অবাক লাগল। এই নিজামত, এর পেছনে এত ষড়যন্ত্র! তা হলে কোথাও সুখ নেই। সবাই নবাবের বিপক্ষে! তা হলে এই যে মেহেদি নেসার সাহেব ছোটমশাইকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, মরালীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, এদের কী করবে? কে এদের বিচার করবে? কে শাস্তি দেবে? কী শাস্তি দেবে? নবাবই যদি না থাকে তো তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে কেন?
বশির মিঞা বললে–একটু কষ্ট করে থাক এখন, মেহেদি নেসার সাহেব চলে গেলেই তোর রশি আলগা করে দেব
কান্ত বললে–আমার জন্যে আমি ভাবছি না, ভাবছি মরিয়ম বেগমসাহেবার জন্যে
বেগমসাহেবার রশি আমি খুলতে পারব না।
ভোরবেলার দিকে বজরা দুটো মুর্শিদাবাদের ঘাটে এসে লাগতেই ডাঙায় নামতে হল। ঘাটে তখন লোকজন কেউ নেই। চেহেল্-সুতুনের নহবতখানা থেকে তখন ইনসাফ মিঞা টোড়ি রাগ ধরেছে। ওদিকে লড়াই বেধেছে কোথাকার লঙ্কাবাগে, আর ইদিকে ইনসাফ মিঞা তার নিত্য-নৈমিত্তিক কাজ করে যাচ্ছে। কান্ত সেই অবস্থাতেই চুপ করে সেখানে পড়ে রইল। বশির মিঞা গিয়ে দুখানা পালকি নিয়ে এল। আর একখানা পালকিতে উঠবে মেহেদি নেসার সাহেব।
ভোরের ঝাপসা আলোয় বোরখা-পরা মরিয়ম বেগমসাহেবাকে নিয়ে গিয়ে একটাতে তুলল। তুলে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। তারপর ছোটমশাই। কান্ত চেয়ে দেখলে ছোটমশাইয়ের দিকে। কখনও আগে দেখেনি ছোটমশাইকে। কিন্তু যতটা দেখা গেল তাতে মনে হল বেশ সুন্দর দেখতে। গম্ভীর মানুষটি। বাদ নেই প্রতিবাদ নেই, মেহেদি নেসারের পেছন-পেছন সোজা গিয়ে উঠল আর একটা পালকিতে। তারপর তিনটে পালকিই চলতে লাগল সার বেঁধে!
আমি?
বশির বললে–তুই আমার সঙ্গে যাবি। কিন্তু তার আগে মাঝিমাল্লাদেরও পাকড়াবার হুকুম দিয়ে গেছে মেহেদি নেসার সাহেব। ওদের না-পাকড়ালে ওরা সব বলে দেবে।
তারপর মাঝিমাল্লাদের সকলকে ডেকে বললে–চল, চল সব–সঙ্গে চল
একটা পেয়াদা নেই, পাহারা নেই। সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে বশির মিঞার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল। ভয়ে সবাই থরথর করে কাঁপছে। বজরা দুটো সেখানেই পড়ে রইল। সেদিকে আর দেখবার সাহস নেই কারও। জানে যদি বেঁচে থাকে তো বজরার কেয়ার কথা পরে ভাববে!
