অন্ধকার রাত। অন্ধকারের মধ্যে ভাল করে দেখা যায় না কিছু। কিন্তু বশির মিঞার দৃষ্টি এড়ানো শক্ত।
বললে–ওই দেখুন জনাব দেখেছেন?
মেহেদি নেসার জিজ্ঞেস করলে–এ কোথায় এলাম আমরা? এ কোন গাঁও?
জনাব, এই-ই তো মোল্লাহাটি। হাঁটাপথে এই মোল্লাহাটি দিয়েই তো হাতিয়াগড়ে যেতে হয়।
হঠাৎ যেন বশির মিঞা একেবারে লাফিয়ে উঠেছে।
জনাব, ওই দেখুন একটা আওরত বজরা থেকে ডাঙার ওপর ঝাঁপ দিলে।
মেহেদি নেসারও দেখছিল। অন্ধকার হলেও চোখ দুটোকে তীক্ষ্ণ তীব্র করে দিয়ে দেখলে বশির মিঞা ঠিকই বলেছে। একটা বজরা মোল্লাহাটির ঘাটের ওপর বাঁধা রয়েছে। একজন মেয়ে লাফিয়ে পড়ল ডাঙার ওপর।
ওই দেখুন জনাব, আর একজন আদমিও পেছন-পেছন লাফিয়ে পড়ল।
মাঝিদের ডেকে বশির মিঞা তাগাদা দিতে লাগল–চলো চলো ভাইয়া, জোরে জোরে বাও, সামনে বজরার পাশে গিয়ে ভেড়াও জলদি
সামনের বজরাটার কাছে আসতেই বশির মিঞা চিনতে পারলে–জনাব, এই তো আমাদের মরিয়ম বেগমসাহেবা আমাদের কান্তবাবু…
নামটা শুনেই মেহেদি নেসারও লাফিয়ে উঠল–মরিয়ম বেগমসাহেবা! তোব তোবা! পাকড়ো উসকো, পাকড়ো–
এ-ঘটনা যখন ঘটছে তখন মোল্লাহাটিতে রাত। রাতের অন্ধকারেই নিজামতের কানুন কায়েম হওয়া নিয়ম। কোনটা কানুন আর কোনটা বেকানুন তার কোনও সীমা নির্দেশ করা নেই আইন-ই-আকবরিতে। বাদশা আকবরের সঙ্গে সঙ্গেই আইন-ই-আকবরি বাতিল হয়ে গিয়েছিল। আসলে তখন বেকানুনের রাজত্ব। আর কোন কানুনই বা মানব? রাজা কি একটা, না বাদশা একজন? হিন্দুস্থানের সব জায়গায় তখন এক-একজন বাদশা বাদশাগিরি করতে শুরু করে দিয়েছে। বাংলা মুলুকের নবাবের কাছে তখন বাংলা মুলুকটাই হিন্দুস্থান।
মেহেদি নেসার সাহেব সেই বাংলা মুলুকের নবাবের ইয়ার। সুতরাং তামাম হিন্দুস্থানের বাদশার ইয়ার। মেহেদি নেসারের হুকুমই তখন মুর্শিদাবাদের নবাবের হুকুম।
বশির মিঞা মেহেদি নেসার সাহেবের হুকুম পেয়েছে, সুতরাং মুর্শিদাবাদের নবাবের ফার্মান পেয়ে গেছে।
সেই মোল্লাহাটির ঘাটের ওপরেই মরিয়ম বেগমসাহেবার হাতটা ধরে ফেললে বশির মিঞা।
মেহেদি নেসার বললে–ওকে এখানে আন
আর আশ্চর্য, মরালীও কোনও প্রতিবাদ করলে না। কোনও আপত্তি করলে না।
কান্ত কিন্তু রেগে গেল।
বললে–ছাড় ওকে ছেড়ে দে ও মরিয়ম বেগমসাহেবা!
বলে বশিরকে ধরতে গেল। কিন্তু মরালী বললেন, না, আমাকে ধরুক ও
‘মেহেদি নেসার সাহেব এতক্ষণ বজরার বাইরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, সব শুনছিল।
চেঁচিয়ে বললে–ওটাকেও ধর বশির ও কে?
জনাব, এরই নাম তো কান্তবাবু।
ওকেও ধরে নিয়ে আয়।
পাশাপাশি দুটো বজরা। বাইরে নিঃসীম অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যেও যে বশির মিঞা কেমন করে দূর থেকে চিনতে পেরেছিল সেইটিই আশ্চর্য। হয়তো অন্ধকারের মধ্যে চরের কাজ করে করে চোখ দুটো তার প্রখর হয়ে উঠেছিল। নইলে মেহেদি নেসার একলা থাকলে একাজ এত সহজে সিদ্ধ হত না। নিজামতি কাজে বশির মিঞার মতো লোকের এই জন্যেই এত খাতির। বাইরে কোতোয়াল আছে, কাজিসাহেব আছে, সেপাই, মিরবকশি সবই আছে। কিন্তু নিজামতি আসলে চালায় বশির মিঞারা।
অন্য বজরার ভেতরে ছোটমশাই কিছুই জানতে পারলে না। শুধুহাত-পা বাঁধা অবস্থাতেই মনে হল বাইরে যেন কী সব গোলমাল চলছে। কাদের যেন চেঁচামেচি হচ্ছে, আরও মনে হল যেন কারা মেহেদি নেসারের ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়ল। আর তাদেরই ধরে নিয়ে যেন তাদের দুটো বজরা পাশাপাশি চলেছে।
একবার মনে হল প্রাণপণ শক্তিতে ডাকে–বৃন্দাবন-বৃন্দাবন
মেহেদি নেসার একবার পেছন ফিরে দেখলে শুধু, মুখে কিছু বললে–না। এবজরাতে তদারকি করছে মেহেদি নেসার আর ওবজরাতে বশির মিঞা। দুটো বজরা জোড়া লাগিয়ে পাশাপাশি চলেছে।
ভেতরে মরালীকে হাত-পা বেঁধে রেখে দিয়েছিল বশির মিঞা। আর বাইরে পড়ে ছিল কান্ত। কাও নড়তে-চড়তে পারছে না।
কান্ত এক ফাঁকে বললে–আমাকে তুই না-ছাড়িস বশির, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ছেড়ে দে ভাই। তোর ভাল হবে, দেখবি
বশির মিঞা বললে–চুপ কর, মেহেদি নেসার সাহেব পাশের বজরায় রয়েছে। শুনতে পাবে।
কান্ত বললে–আমি চুপি চুপি বলছি, কেউ শুনতে পাবে না–তুই একটু দয়া কর ভাই! আমাকে তুই যা-খুশি শাস্তি দে, আমায় তুই ইচ্ছে হলে খুন করে ফেল; কিন্তু মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ছেড়ে দে তুই, আমি তোর পায়ে পড়ছি
বশির মিঞা জিজ্ঞেস করলে-মরিয়ম বেগমসাহেবার জন্যে তোর এত টান কেন বল তো ইয়ার? ও কি তোর পেয়ারের আওরত?
কান্ত বললে–না, তা কেন? কিন্তু তুই তো জানিস ওর কোনও দোষ নেই, আমিই হাতিয়াগড় থেকে রানিবিবিকে একদিন সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলুম।
তুই নিয়ে এসেছিস তাতে কী? তা বলে নিজামতের কানুন খেলাপ করবি? চেহেল সুতুনের কানুন খেলাপ করবি? তুই আগে বল মরিয়ম বেগমসাহেবা আর তুই দুজনে মিলে কোথায় যাচ্ছিলি? কী মতলব ছিল তোদের?
কান্ত বললে–তোকে সত্যি বলছি আমাদের কোনও মতলব ছিল না—
তা হলে কেন চেহেল্-সুতুন থেকে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে বের করে নিয়ে এলি?
আমি বের করে নিয়ে এলুম, কে বললে?
এখনও তবু মিথ্যে কথা বলছিস? তুই যদি বের করে না নিয়ে আসিস তো কে বের করে নিয়ে এসেছে? মরিয়ম বেগমসাহেবা কি হাওয়া হয়ে উড়ে এল এখানে? কে তোকে চেহেল্-সুতুনে ঢুকতে পাঞ্জা দিলে? আমি তো ক’দিন ধরে বেগমসাহেবার তাঞ্জামের পেছন পেছন ঘুরছি, তবু আমার চোখে তুই ধুলো দিলি কী করে? সত্যি কথা বল, আমি তোকে ছেড়ে দেব
