কে বললে–মরিয়ম বেগম আপনার আওরত? মরিয়ম বেগম নবাবের জেনানা, চেহেল সুতুনের সম্পত্তি, নিজামতি মাল
সঙ্গে সঙ্গে একটা চড় গিয়ে পড়ল মেহেদি নেসারের গালে। ছোটমশাই গায়ের যত জোর ছিল সমস্ত জোর দিয়ে চড়টা মেরেছিল। মেহেদি নেসার চড়টা সামলে নিতে একটুখানি সময় নিলে বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বশির মিঞাকে বললে–বশির, কাছি আন–শিগগির বজরার কাছিটা আন। বেত্তমিজকে বাঁধ, বেঁধে ফেল শিগগির। আমি বেওকুফকে দেখাচ্ছি মজা।
বশির আর দেরি করেনি, লম্বা কাছিটা আনতেই ছোটমশাই দাঁড়িয়ে উঠে বাধা দিতে গিয়েছিল, কিন্তু তার আগেই দুজনে মিলে আচ্ছা করে কষে বেঁধে ফেলেছে ছোটমশাইকে।
আরও জোরে বাঁধ, শালা জমিদার বাচ্চাকে আমি কুত্তা দিয়ে খাওয়াব–বাঁধ বাঁধ–আরও জোরে বাঁধ
বৃন্দাবন তখন সবই দেখেছে। মাঝিমাল্লারা সবাই এতক্ষণ সব দেখছিল। এবার তাদের দিকে নজর পড়ল মেহেদি নেসারের।
বললে–মুর্শিদাবাদে গিয়ে ওদেরও বেঁধে কুত্তা দিয়ে খাওয়াতে হবে–জোরসে চালাও, জোরসে
গঙ্গার স্রোতের ওপর বৃন্দাবনরাও ভয়ে ভয়ে আরও জোরে দাঁড় বাইতে লাগল। ছোটমশাই তখন নিজের বিছানার ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। কথা বলবারও ক্ষমতা নেই। মুখের ভেতরে কাপড় গুঁজে দিয়ে বশির মিঞা তার বাকরোধ করে দিয়েছে।
*
লক্কাবাগের ভেতরে পাঁচিলটার ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তখন চারদিক দেখছিল কর্নেল ক্লাইভ। এককালে এখানেই শিকার করতে আসত নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা। এইখানে এসেই কত রাত কাটিয়ে গেছে দলবল নিয়ে। সেদিন নবাব কল্পনাও করতে পারেনি, একদিন এখানে এসে টেন্ট খাঁটিয়ে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে।
হঠাৎ ফ্লেচার এসে হাজির।
কী খবর ফ্লেচার?
খবর ভাল কর্নেল।
মিরজাফরসাহেবের সঙ্গে দেখা হয়েছে? কোনও নিউজ আছে নতুন?
ফ্লেচার বললে–না কর্নেল, ওদিকে যাইনি, পাছে কেউ ডাউট করে। এখন নবাবের টেন্টের নিউজ আনতে গিয়েছিলাম। সেখানে খুব কমোশন চলছে
কেন? হোয়াই?
নবাবের পার্সোন্যাল স্টাফ যারা তারাও নবাবের এগেনস্টে।
কী করে জানলে?
ফ্লেচার বললে–নবাবের সোনার একটা কলকে ছিল, ভেরি ভ্যালুয়েবল থিঙ, কস্টলি প্রপার্টি, সেটা কে নাকি চুরি করে নিয়েছে। নবাব অর্ডার দিয়েছে সবাইকে বেত মারতে
তারপর?
তারপর সমস্ত স্টাফ রিভোল্ট করবে বলছে।
কখন রিভোল্ট করবে? আজকে?
তা জানি না কর্নেল, কিন্তু তারা বলছে নবাবের চাকরি তারা করবে না। দে আর অল এগেনস্ট নবাব
আচ্ছা তুমি যাও, আর যদি কোনও নিউজ পাও, আমাকে ইমিডিয়েটলি জানিয়ে যাবে, আই অ্যাম হিয়ার
ফ্লেচার চলে গেল। হঠাৎ ফ্রেঞ্চ-আর্মির দিক থেকে একটা কামানের গোলা এসে পড়ল কাছাকাছি। ল্যাসিংটন পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। শব্দটার সঙ্গে সঙ্গে দু’কানে হাত চাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে গেল। কিন্তু তার আগেই গোলার একটা টুকরো এসে তার গায়ে লাগতেই সে নীচেয় পড়ে গেছে।
ক্লাইভ চিৎকার করে উঠল–ব্যাটালিয়ন
তারপরে চারদিকের শব্দে আর কান পাতা গেল না। শব্দটা কমতেই চারদিকে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। ফ্রেঞ্চ-আর্মি কামান ছোঁড়া থামিয়েছে কিছুক্ষণের জন্যে। মেজের আয়ার কুট দৌড়ে এসেছে। কর্নেলের কাছে।
কর্নেল কোথায়? হোয়ার ইজ কর্নেল?
কেউ বলতে পারে না কোথায় গেল কর্নেল! আয়ার কুট ছটফট করতে লাগল। হোয়ার ইজ কর্নেল? হোয়ার ইজ কর্নেল? এখানে দাঁড়িয়ে নবাবের হিউজ আর্মির সামনে আর ফাইট করা উচিত নয়। আমরা স্ম্যাশড হয়ে যাব। আমাদের আর্মির একজন সোলজারও আর বাঁচবে না। মেজর আয়ার কুট এখানে-ওখানে সবাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল–হোয়ার ইজ কর্নেল? হোয়ার?
কর্নেল তখন ল্যাসিংটনের ডেডবডিটার সামনে দাঁড়িয়ে। নবাবের শিকার করবার ঘরের ভেতরে গিয়ে স্ট্রেচারে করে ল্যাসিংটনকে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে।
সবাই বেরিয়ে যাও, বি অফ বি অফ ইউ অল
সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল তখন। ক্লাইভ একলা পঁড়িয়ে তার দিকে চেয়ে রইল একদৃষ্টে। তুমিও ছটাকার রাইটার ল্যাসিংটন। আমি তোমাকে ওয়ার্ড দিয়েছিলাম তোমার প্রমোশনের ব্যবস্থা করব আমি। তুমি অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সই জাল করেছ, আমার জন্যে তুমি সব করেছ। কিন্তু তুমি আমার কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেলে। তবু আমি আমার কথা রাখব ল্যাসিংটন। আমি তোমাকে প্রমোশন দেব। পস্তুমাস প্রমোশন। সে প্রমোশনের ফল ভোগ করবে তোমার ওয়াইফ, তোমার সান, তোমার ডটার
কর্নেল!
মেজর আয়ার কুট ঘরের ভেতর ঢুকেই অবাক হয়ে গেছে। কর্নেল ক্লাইভের চোখ দিয়ে জল পড়ছে। ভেরি স্ট্রেঞ্জ, ভেরি স্ট্রেঞ্জ ইনডিড–
আয়ার কুট আর দাঁড়াল না সেখানে। নিঃশব্দে আবার ঘরের বাইরে চলে গেল। ফ্রেঞ্চ জেনারেল ল’ পলাশিতে আসছে আর্মি নিয়ে, সেই খবরটা দিতে এসেছিল। কিন্তু ক্লাইভের চোখের জলের সামনে তার সমস্ত মিলিটারি জ্ঞান মিলিটারি ম্যানোভার ধুয়ে ভেসে চলে গেল।
ক্লাইভ তখন ল্যাসিংটনের ডেডবডির সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাত বুকের ওপর ক্রস করে বলছে আমেন…
.
মেহেদি নেসার আর বশির মিঞা তখন বজরার বাইরে বসে আছে। বৃন্দবনরা জোরে জোরে দাঁড় বাইছে। ভেতরের ঘরে ছোটমশাই দড়িবাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে চিতপাত হয়ে।
হঠাৎ বশির মিঞা চেঁচিয়ে উঠেছে–ওই দেখুন জনাব, ওই দেখুন
