বশির মিঞা দাঁড়িয়ে উঠল। ভেতরে মেহেদি নেসার সাহেবকে উদ্দেশ করে বললে–জনাব, ছোটমশাই এসেছেন
জীবনে অনেকবার অনেক রকম অন্যায় অপমান সহ্য করতে হয়েছে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই হিরণ্যনারায়ণকে। মুর্শিদাবাদে নতুন নবাব হওয়ার পর থেকেই সেটা বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন যে-ঘটনা ঘটল তার যেন আর তুলনা নেই।
ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল যে-লোকটা সে যে মেহেদি নেসার তা প্রথমে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি।
কিন্তু ছোটমশাইয়ের কপালে বুঝি তখন আরও অনেক দুঃখ আছে।
কই? কোথায়? কে? কার কথা বলছিলে?
ছোটমশাই বললে–বৃন্দাবন, আমার বজরাতে এরা ঢুকেছে কেন? কারা এরা?
বৃন্দাবন আগে থেকেই ভয়ে ভয়ে কাঁপছিল। তার মুখ দিয়ে আর কোনও উত্তর বেরোল না। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্য-পাদে ইতিহাস যখন সন্ধিস্থলে এসে থেমে গেছে, যখন পন-অ্যুদয়ের চিরন্তন বন্ধুর পথের মাঝখানে এসে ইতিহাস আর একবার থমকে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সেই সময়েই ছোটমশাই হঠাৎ মেহেদি নেসার সাহেবকে চিনতে পারলে। আর সঙ্গে সঙ্গে মেহেদি নেসারের চোখের চাউনিতে বুঝতে পারলে, এবার আর একবার ন্যায়-অন্যায়ের মুখোমুখি তাকে দাঁড়াতে হবে।
তুমি অত্যাচারী হতে পারো, তুমি ন্যায়-অন্যায়ের আইন কানুনের বহির্ভূত হতে পারো, কিন্তু আমি আমার সামর্থ্য দিয়ে শক্তি দিয়ে মনোবল দিয়ে তোমাকে পরাজিত করব। আজকের আমার এই দুর্দশার কারণ তুমিই, আর কেউ নয়। পশুশক্তিতে তুমি আমার চেয়ে প্রবল হতে পারো, কিন্তু আমিও হীনবীর্য নই। তুমি যদি আমাকে আঘাত করো সে-আঘাত দ্বিগুণ হয়ে তোমার বুকে গিয়েই বাজবে। মৃত্যুই যদি আমার অনিবার্য পরিণতি ধার্য হয়ে থাকে তো সে-মৃত্যুর আগে তোমার সঙ্গে আমি শক্তি পরীক্ষা করে নেব।
বৃন্দাবন, এদের বার করে দে বজরা থেকে; এ আমার বজরা! না বলে ওরা আমার বজরায় ওঠে কেন?
বৃন্দাবনকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলার অর্থ বোঝবার মতো বুদ্ধি আর কারও না থাক, মেহেদি নেসার সাহেবের আছে।
আপনি অত গোঁসা করছেন কেন জনাব, আমরা আপনার মেহমান!
ছোটমশাই কেমন নরম হয়ে এল। মেহেদি নেসার যা তোক তার পক্ষে তো এত নরম হওয়া স্বাভাবিক নয়।
এদিকে নিজামতের কাজ নিয়ে এসেছিলুম, ঘাটে বজরা না পেয়ে আপনার বজরায় উঠেছি। মেহমানদের সঙ্গে কী করে কথা বলতে হয় তা হাতিয়াগড়ের জমিনদার ছোেটমশাইকে তো আর শিখিয়ে দিতে হবে না। আপনি হয়তো আমাকে চিনতে পারছেন না জনাব আমার নাম মেহেদি নেসার।
মেহেদি নেসারের নাম শুনেও ছোটমশাইয়ের কোনও ভাবান্তর হল না।
মেহেদি নেসার আবার বললে–আসুন, জনাব, ভেতরে আসুন, এ তো আপনারই বজরা, আমরা শুধু সওয়ার, শুধু আপনার বজরায় আমরা ওপার পর্যন্ত যাব, তারপরে আপনার বজরা আপনারই থাকবে
ছোটমশাই আস্তে আস্তে বজরায় উঠল। তারপর নিজের ঘরের ভেতরে ঢুকল। বিছানায় বসে হুকুম দিলে–বৃন্দাবন, বজরা ছেড়ে দে–
মেহেদি নেসারও সামনে এসে বসল। বসে হাসতে লাগল দাঁত বার করে।
বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবাকে কোথায় রেখে এলেন জনাব?
মরিয়ম বেগমসাহেবা? কে মরিয়ম বেগমসাহেবা?
হঠাৎ যেন বিছেয় কামড়ানোর মতো আঘাত পেয়ে চিৎকার করে উঠেছে ছোটমশাই।
হা হা করে হেসে উঠেছে মেহেদি নেসার সাহেব।
আপনি গোঁসা করছেন জনাব! কিন্তু গোসা করবেন না মেহেরবানি করে। আমার নাম মেহেদি নেসার। আমি মুর্শিদাবাদের নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজউদ্দৌলার ইয়ার। আমার কাছে লুকোতে কোশিস করবেন না, তাতে আপনারও খারাপ হবে মরিয়ম বেগমসাহেবারও খারাপ হবে–
ছোটমশাই বললে–কিন্তু মরিয়ম বেগমসাহেবা যে আমার স্ত্রী! কোথায় তাকে দেখেছেন বলুন। বলুন শিগগির
বাঃ বাঃ, জনাব মরিয়ম বেগমসাহেবাকে লুকিয়ে রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করছেন আমি কোথায় দেখেছি তাকে? বলুন, তাকে কোথায় রেখে এলেন?
ছোটমশাই চিৎকার করে উঠল–শয়তান
মেহেদি নেসার কিন্তু রাগতে জানে না! ডাকলে–বশির মিঞা
বশির মিঞা ভেতরে এল।
জনাব তো বড় বেশরম জাঁহাবাজ! তুই বজরার ভেতরে মরিয়ম বেগমসাহেবাকে দেখেছিলি?
জি হাঁ জনাব, আমি দেখেছি বেগমসাহেবা বজরার ভেতরে ছিল, আর বাইরে বসে ছিল কান্তবাবু।
আমাদের নিজামতের জাসুস!
ছোটমশাই আর থাকতে পারলে না। চিৎকার করে উঠল–বৃন্দাবন, বজরা থামা, বজরা ডাঙায় ভেড়া
চোপরাও!
বজ্রপাতের মতো গম্ভীর গলায় শব্দ করে উঠল মেহেদি নেসার। আর সঙ্গে সঙ্গে ছোটমশাই দেখলে, মেহেদি নেসারের মুখের চেহারাটা বাঘের মুখে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
ছোটমশাইয়ের সমস্ত অন্তরাত্মা রেগে আগুন হয়ে উঠল। আমার স্ত্রীর সম্বন্ধে আমারই মুখের ওপর এমন করে বলবে, আর আমি কিছু বলতে পারব না! আমরা অনেক সহ্য করেছি, তাই সাহস ওদের এত বেড়ে গেছে। হঠাৎ সোজা হয়ে উঠে বসল ছোটমশাই।
বললে–বলুন, কোথায় আমার স্ত্রীকে রেখেছেন আপনারা, বলুন?
জনাব, আমরা আপনার বিবিকে আবার কোথায় রাখব, আপনিই কোথায় তাকে লুকিয়ে রেখে এলেন তাই বলুন! আমরা এই বজরাতে আপনার বিবিকে থাকতে দেখেছি।
তারপর বশির মিঞার দিকে চেয়ে বললে–কী রে, দেখিসনি?
বশির মিঞা বললো জনাব, আমি দেখেছি মরিয়ম বেগমসাহেবাকে—
তা হলে? কোথায় তাকে রেখে এলেন বলুন?
ছোটমশাই গলা চড়িয়ে বললে–আমি যদি আমার স্ত্রীকে লুকিয়েই রেখে থাকি তো বেশ করেছি, আমার নিজের স্ত্রীকে আমি যেখানে খুশি লুকিয়ে রাখব, আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমি যা-খুশি তাই করব–
