হঠাৎ সবাই দেখলে অনেক দূরে যেন আর-একটা বজরা সাঁ সাঁ করে এইদিকেই আসছে।
কান্ত বললে–মরালী, আমার কথা শোনো, তুমি অবুঝ বোয়ো না, শেষে কী হতে কী হবে তখন তোমাকে আর বাঁচাতে পারব না
তবু মরালী কথা শুনলে না। বজরাটা ঘাটে লাগতেই কান্ত মরালীর হাতটা জোরে চেপে ধরলে।
মরালী এক ঝটকায় কান্তর হাতটা ছাড়িয়ে দিয়ে বললে–ছাড়ো, তোমার এতটুকু সাহস নেই, তুমি কি একটা পুরুষমানুষ? তুমি জানোয়ারেরও অধম। এতই যদি আমাকে ভয় তো তখন বললেই পারতে? কেন লুকিয়ে লুকিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে চেহেল সুতুনে আসতে?
মরালী-মরালী
কিন্তু মরালী তখন এক লাফে বজরা থেকে ঘাটে নেমে পড়েছে
ওদিকে অন্ধকারের বুক চিরে দূরের বজরাটা তখন একেবারে পেছন বরাবর এসে পড়েছে।
কান্ত আবার ডাকলে–মরালী–মরালী!
.
এক-একটা যুগে এক-একটা দেশে একই ঐতিহাসিক কারণে জাতি-ক্ষয়ের লক্ষণ প্রকাশ পায়। যে-জাতি চিরকালের মতো বিলুপ্ত হয়ে যায়, সে-জাতিও একদিনে নিঃশেষ হয় না। নিঃশেষ হবার আগে তার সমাজে, তার রাজনীতিতে, তার অর্থনীতিতে পচন ধরে। তখন দেশের মানুষের ধর্মবিশ্বাস শিথিল হয়ে যায়, তখন দেশের মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে স্বার্থসিদ্ধির নেশায় ডুবে থাকে। সততা, ভক্তি, ভালবাসা, স্নেহ তখন তাদের কাছে ঘৃণ্য। মানুষের মনুষ্যত্ব কথাটা তখন তাদের কাছে হাসির উদ্রেক করে। তখন তাদের কাছে সতোর চেয়ে সার্থকতা বড় হয়। তুমি হিন্দু না মুসলমান, তুমি দয়ালু না নিষ্ঠুর, তুমি স্বার্থপর না ত্যাগী সন্ন্যাসী তা আমি দেখব না। তোমার পদমর্যাদার জন্যেই আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করব। তুমি ওমরাহ, তুমি নবাবের প্রিয়পাত্র সেই-ই তোমার বড় সার্টিফিকেট।
যখন রাষ্ট্র-বিপ্লব হয় তখন কি শুধু রাজারই উত্থান-পতন হয়? রাজ্যের ছোট বড় প্রত্যেকটি মানুষেরই উত্থান-পতন ঘটে। ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে তখন ভূগোলেরও উত্থান-পতন ঘটে। একজন ওঠে আর একজন পড়ে–তারই নাম রাষ্ট্র বিপ্লব। নতুন করে তখন আবার ম্যাপের রং বদলায়। পুরনো জনপদ ধ্বংস হয়ে আবার সেখানেই নতুন জনপদ নতুন হয়ে গজিয়ে ওঠে। পুরনোর শ্মশানের। ওপর আবার নতুন করে ভবিষ্যৎ-ধ্বংসের চিতা সাজানো হয়।
উদ্ধব দাস বলত–তোমরা জানো না গো তোমরা কী ভুল করছ
লোকে জিজ্ঞেস করত–কী ভুল করছি?
উদ্ধব দাস বলত–তোমরা টাকার জন্য হরির নাম ভুলছ
লোকেরা বলত-হরির নাম করে কি আর পেট ভরবে গো? তার চেয়ে নবাবের নাম করা ভাল–নবাব তবু খেতাব দেবে
না গো না, খেতাবে কিস্যু হয় না। হরির নামে কী হয় শুনবে? হরির নামের তুল্য আর কিছু নেই–শোনো হরির তুল্য কী রকম–
পরমাণু তুল্য সূক্ষ্ম, হিংস্রক তুল্য মূর্খ,
ভিক্ষা তুল্য দুঃখ।
সাধন তুল্য কর্ম, দয়া তুল্য ধর্ম,
মানব তুল্য জন্ম ॥
মাহেন্দ্র তুল্য যোগ, স্বর্গ তুল্য ভোগ,
কুষ্ঠ তুল্য রোগ ॥
বট তুল্য ছায়া, সন্তান তুল্য মায়া,
কার্তিক তুল্য কায়া ॥
দৈব তুল্য বল, আম্র তুল্য ফল,
গঙ্গা তুল্য জল ॥
পূর্ণিমা তুল্য রাতি, ব্রাহ্মণ তুল্য জাতি।
মৃদঙ্গ তুল্য বাদ্য, ধৃত তুল্য খাদ্য ॥
দূর্বস্ব তুল্য ঘাস, অগ্রহায়ণ তুল্য মাস।
সর্বস্ব তুল্য পণ, বিদ্যা তুল্য ধন ॥
দাতা তুল্য যশ, গান তুল্য রস।
উদ্ধার তুল্য জয়, মরণ তুল্য ভয় ॥
গোলক তুল্য ধাম, তেমনই হরির তুল্য নাম ॥
চারিদিকের সেই জাতি-ক্ষয়ের যুগে একমাত্র উদ্ধব দাসই বোধহয় অতগুলো লোকের মধ্যে নিজের বিবেকটাকে সজাগ রাখতে পেরেছিল। অন্তত তার বেগম মেরী বিশ্বাস’ কাব্য পড়ে সেইটুকুই বোঝ যাচ্ছে। যখন নবকৃষ্ণ মুনশি, মহারাজ নন্দকুমার, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, এমনকী গ্রামের সাধারণ লোক পর্যন্ত লোভ-হিংসা-পাপের মধ্য দিয়ে স্বার্থচিন্তাতে ব্যস্ত, তখন ওই একটা লোকই শুধু কিছুই চায় না। উদ্ধব দাস বাড়ি চায় না, পালকি চায় না, খ্যাতি চায় না, খেতাব চায় না, ভাল-মন্দ খেতে চায় না, এমনকী নিজের বউয়ের ওপরেও তার কোনও অনুরাগ নেই। এ অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই অস্থির যুগের পক্ষে একটা বিরাট ব্যতিক্রম।
কিন্তু মেহেদি নেসার এসব তত্ত্ব জানত না। আর এসব যদি জানবেই তো সেই সেদিন ১৭৫৭ সালের জুন মাসের ২৩ তারিখে সেই রাষ্ট্রবিপ্লব হবে কেন? নইলে ইতিহাস ঘুমোতে ঘুমোতে পাশ ফিরবে কী করে? জেগে উঠবে কী করে?
প্রথম যখন ত্রিবেণীর ঘাটে এসে মরিয়ম বেগমের পাত্তা পাওয়া গেল না তখন রেগে আগুন হয়ে উঠেছিল মেহেদি নেসার সাহেব। কিন্তু, রাগলে আখেরে কোনও ফয়দা হয় না সেটা মেহেদি নেসার জানে। তাই চুপ করে ছোটমশাইয়ের বজরার ভেতরে গিয়ে শুয়েছিল। বশির মিঞা বাইরে বসে বসে মাঝিদের সঙ্গে তখন বিড়ি টানছে।
ছোটমশাই ঘাটে এসে অবাক।
জিজ্ঞেস করলে কে? কে তুমি?
পাছে কেউ টের পায় তাই ত্রিবেণীতে বজরা বেঁধে ছোটমশাই হাঁটা পথেই কলকাতায় গিয়েছিল। এই নিয়ে এখানে আসা-যাওয়া অনেকবারই করতে হয়েছে ছোটমশাইকে। কিন্তু দুর্ভোগ যার কপালে লেখা থাকে, তার এ নিয়ে অভিযোগ করা চলে না। আর অভিযোগ করলেও যখন তার প্রতিকার নেই তখন অভিযোগ করেই বা কী হবে! ছোটমশাই জানত বড়মশাইয়ের যুগ চলে গেছে। সে-যুগ আর আসবে না। নবাবের সামান্য একজন ডিহিদার, সেও আজকাল জমিদারদের চোখ রাঙিয়ে কথা বলে। যখন-তখন যা-তা দাবি করে। বাবা বেঁচে থাকলে এসব তিনি সহ্য করতেন না। কিন্তু এখন ন্যায়-অন্যায় বলে কোনও কথা নেই, আইনকানুন বলেও কোনও কথা নেই। বিচার বলতে আছে কাজির বিচার। সেই সব কথা ভাবতে ভাবতেই কলকাতার পেরিন সাহেবের বাগান পর্যন্ত গিয়েছিল ছোটমশাই। অথচ পরিশ্রমই সার। যার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে এত দূর থেকে আসা সেই ক্লাইভ সাহেবই নেই।
