চারদিকে শব্দ। লড়াইয়ের মধ্যে এই শব্দটাই প্রথম মনে পড়ে। আর সব শব্দ ডুবে যায় এই কামানের শব্দের মধ্যে। এ শব্দ না-থাকলেও খারাপ লাগে। আবার থামলেও কষ্ট হয়। অথচ শব্দই যদি না হল তো বেঁচে আছি বুঝব কী করে? আমার ইন্দ্রিয় আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করছে কিনা অনুভব করব কী করে? যারা সাধারণ, যারা বাংলা মুলুকের প্রজা, তারাই কেবল শান্তি চায়। তারা এত শান্তির ভক্ত বলেই তাদের নবাবকে এত অশান্তির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয়। দশজনের শান্তির জন্যে একজনকে সংসারের সব অশান্তির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। সব অশান্তিকে নির্বিবাদে গ্রাস করতে হয়। আর তা ছাড়া এসব না থাকলে কী নিয়েই বা থাকত মুর্শিদাবাদের নবাব?
হঠাৎ একটা শব্দে পাশ ফিরল নবাব।
কে? নেয়ামত?
কে যেন তাঁবুর মধ্যে নিঃশব্দে ঢুকে আবার বেরিয়ে গেল।
কে? কে? কৌন?
কেউ সাড়া দিলে না। যে ঢুকেছিল সে আর সাড়া দিলে না। হয়তো কেউই ঢোকেনি। হয়তো মির্জা মহম্মদের মনের ভুল। চারদিকের শব্দের মধ্যে হয়তো একটা শব্দকে পায়ের শব্দ বলে ভুল করেছিল।
বাইরের দিকে দেখতে দেখতে মির্জা মহম্মদ আবার গড়গড়ার নলটা টানতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ মনে হল কলকের আগুন যেন নিভে গেছে। নেয়ামত তো একটু আগেই কলকের আগুন বদলে দিয়ে গেছে। তবে হঠাৎ নিভে গেল কেন? মির্জা মহম্মদ আরও জোরে জোরে নলটা টানতে লাগল।
কৌন ব্যায়?
চারদিক থেকে চার-পাঁচ জন খিদমদগার ছুটে এসেছে। নবাবের মেজাজ বিগড়ে গেলে যেন তাদের গর্দানের ওপর আর মাথা থাকবে না।
আমার গড়গড়ার কলকে কোথায় নিয়ে গেলি তোরা?
আশ্চর্য! সবাই অবাক হয়ে দেখলে কলকে নেই। নবাবের খাঁটি সোনার কলকেতে একটু আগেই নেয়ামত আগুন ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। সেটা নেই। কোথায় গেল? কে নিয়ে গেল? নবাবের চোখের সামনে থেকে কে চুরি করে নিয়ে গেল সোনার কলকেটা! ওই কলকেতেই একদিন তামাক খেয়েছেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ, নবাব সুজাউদ্দিন, নবাব সরফরাজ খাঁ, আর নবাব আলিবর্দি খাঁ। অত যুগের উত্তরাধিকার নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার কাছে এসে অদৃশ্য হয়ে গেল! ভয়ে আতঙ্কে বিস্ময়ে সকলের যেন বাকরোধ হয়ে গেছে।
মির্জা মহম্মদ হাতের যত জোর ছিল সব দিয়ে রুপো জড়ানো নলটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলে।
তোরা বেরো এখান থেকে, বেরো, নিকাল যা–নিলো ইহাসে
সবাই ভয় পেয়ে সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। নবাব শূন্য তাঁবুর মধ্যে আবার বিছানার ওপর হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল।
তোরা কি সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলতে চাস? আমি কি মরে গিয়েছি? মরে যাবার আগেই কি তোরা আমাকে কবর দিতে চাস?
কথাগুলো স্বগতোক্তি! কিন্তু সামনে তখন কেউ থাকলেও যেন ওকথা তাদের বলতে নবাবের বাধত না। সেইখানে সেই ফাঁকা ছাউনির ভেতরে শুয়ে শুয়েই নবাবের মনে হতে লাগল, এরই নাম হয়তো মসনদ। এই মসনদের জন্যেই হয়তো তার এত দুর্গতি। এই মসনদের জন্যেই হয়তো আজ সবাই তার ওপর বিরূপ!
কিন্তু বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব তখনও জানত না, ইতিহাস তখন আর একবার পাশ ফেরবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। মানুষের বিধাতা যদি ইতিহাস হয় তো সেই ইতিহাস-বিধাতাও মানুষের মতোই একবার উঠে দাঁড়ায়, একবার চলে, আবার একবার ঘুমিয়ে পড়ে। মানুষের মতোই জাগবার আগে একবার পাশ ফিরে যায়। তখন দেশ-কাল রাজ্য-রাজানবাব-বাদশা সব একাকার হয়ে যায় ইতিহাসের চোখে। নবাব তখন জানত না সেই ইতিহাসের পাশ ফেরার সময় আবার এতকাল পরে ফিরে এসেছে। এতকাল পরে আবার জবাবদিহি দিতে হবে নবাবকে। নবাবকে সকলের সামনে হাত-জোড় করে বলতে হবে আমাকে তোমরা মেরো না। আমাকে আর কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখো। আমি মসনদ চাই না, আমি মুর্শিদাবাদ চাই না, আমি চেহে–সুতুন চাই না, আমি সম্মান শ্রদ্ধা ভালবাসা স্নেহ প্রীতি মুহব্বত, কিচ্ছু চাই না, আমি শুধু বাঁচতে চাই। খোদাতালা তাল্লালাহর দুনিয়ায় আমি শুধু একজন সাধারণ মানুষ হয়ে পৃথিবীর এককোণে থেকে দুদণ্ডের শান্তি পেয়ে বাঁচতে চাই।
ওদিকে ফিরিঙ্গিদের ফৌজের দিক থেকে আর একটা কামানের গোলা এসে হঠাৎ মিরমদনের সেপাইদের ওপর পড়ল। আর বিরাট একটা কানফাটানো শব্দে নবাবের নিঃশব্দ কান্না ভেঙেচুরে ছারখার হয়ে গেল।
*
মোল্লাহাটির কাছে বজরাটা আসতেই মরালী বললে–থামাও, থামাও, এইখানে বজরা থামাতে বলল ওদের
কান্ত বললে–সেকী? এই এত রাত্তিরে এখানে কোথায় নামবে? এ যে মোল্লাহাটি।
মরালী বললে–তা হোক, এ মোল্লাহাটিই হোক আর যে-জায়গাই হোক, আমি এখানেই নামব। তুমি আমাকে এখানেই নামিয়ে দাও
কিন্তু তোমাকে আমি একলা ছেড়ে দেব কোন সাহসে? কার কাছে থাকবে? কে দেখবে তোমাকে? কোথায় যাবে তুমি?
মরালী বললে–যেখানেই যাই, তোমার ভাববার দরকার নেই। আমি বাঁচি মরি তার জন্যে তোমায় ভাবতে হবে না। ছোট বউরানিকে যখন নিরাপদ জায়গায় একবার পৌঁছিয়ে দিয়েছি তখন আমি নিজের কথা আর ভাবব না।
কান্ত বললে–তুমি না-হয় আমায় ভাবতে বারণ করছ, কিন্তু আমি না-ভেবে কী করে থাকি তাই বলো?
মরালী বললে–তুমি পুরুষমানুষ, তোমার আবার কীসের ভাবনা? তুমি যেমন করে যেখানে আছ, সেখানেই থাকো গে–
তারপর নিজেই মাঝিদের দিকে চেয়ে বললে–ওগো, তোমরা বাঁধো এখনে বজরা, বাঁধো। আমি নামব
