.
সচ্চরিত্র ঘটক তখনও ছাতিমতলার ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে দূরের বাঁকটার পানে চেয়ে আছে। নদীটা ওখানেই বাঁক নিয়েছে। যেন সেই দিকেই একটা টিমটিমে আলো নজরে পড়ল। বরবাবাজি এত দেরি করবে কে জানত। আজকালকার ছোকরাদের একটা দায়িত্বজ্ঞান বলে কিছু নেই। আগেকার মতো ক্ষমতায় থাকলে ঘটকমশাই আবার চলে যেত সেই কলকাতায়। একবার হাতিয়াগড় একবার কলকাতা। দেনাপাওনার কথা তো সবই হয়ে গিয়েছিল। আগেকার দিনে এমন ছিল না। আগে গ্রামের মধ্যেই বর, গ্রামের মধ্যেই কনে। আর এখন যদি সন্ধান পাও তো যাও কাটোয়া, যাও পূর্বস্থলী, যাও বর্ধমান। কঁহা বীরভূম, কঁহা ঢাকা, সোনারগাঁ, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ। কোনও জায়গায় আর যেতে বাকি নেই সচ্চরিত্রর।
সচ্চরিত্র বলে–আমার নাম সচ্চরিত্র ঘটক, আমি হলাম ঈশ্বর ইন্দিবর ঘটকের পুত্র, ঈশ্বর কালীবর ঘটকের পৌত্র, ঈশ্বর সিদ্ধেশ্বর ঘটকের প্রপৌত্র। সমস্ত ঘটককারিকা আমার মুখস্থ গো, আমরা হলাম। সাতপুরুষের ঘটক, যদি কলকাতায় কখনও যান হুজুর, আমার নাম করবেন
লোকে বলে কলকাতায় কে তোমায় চিনবে?
আজ্ঞে বড় বড় যজমান সব আমার আছেন সেখানে, নানান জাতের গেরস্থ সব। বাহাত্তুরে কায়েত কৃষ্ণবল্লভ সোম আমার যজমান, মৌলিক কায়েত গোবিন্দশরণ দত্ত, কুলীন কায়েত গোবিন্দরাম। মিত্তির, শ্রোত্রিয় বামুন কন্দর্প ঘোষাল, কুলীন বামুন মনোহর মুখুজ্জে, সুবর্ণ বণিক শুকদেব মল্লিক, সদগোপ আত্মারাম সরকার, তিলি কালীচরণ পাল, কৈবর্ত গৌরহরি হালদার, সব আমার যজমান। শুধু কলকাতা কেন, বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদীয়ায় পর্যন্ত যজমান আছে আমার হুজুর। যাদের কাজকর্ম একবার করে দিয়েছি আর কোনও ঘটকের কাজ পছন্দ হয় না তাদের
এই সচ্চরিত্রর কথাতেই বিশ্বাস করে শোভারাম মেয়ের সম্বন্ধ করেছিল। সারা মুলুকটাই ঘুরে বেড়াত সচ্চরিত্র পোঁটলাটি কাঁধে নিয়ে। এ-গ্রাম থেকে সে-গ্রাম। তারপর দুমাস-তিনমাস কোথায়। কোথায় কেটে যায় কেউ জানতে পারে না। বাড়ির ছেলেমেয়ে বউয়ের সঙ্গে হয়তো ছ’মাস পরে একদিন দেখা হয়। তারপর আবার একদিন বেরিয়ে পড়ে। এমনই রাজমহল থেকে বর্ধমান, বর্ধমান থেকে হুগলি, হুগলি থেকে কলকাতা। কলকাতাই কি ছোট জায়গা নাকি। কায়েতই যে কতরকম এখানে। জেলে-কায়েত, ছুতোর-কায়েত, চাষাকায়েত। পইতে কি চেহারা দেখে আর কাউকে চেনবার উপায় নেই। একমাথা বাবরি চুল, গাল পর্যন্ত টানা জুলপি, ওপর ঠোঁটে একটুখানি গোঁফ শুধু। মাথায় পাগড়ি, গায়ে জোব্বা আর পায়ে চামড়ার চটি, দেখেই বোঝা যায় কলকাতার নতুন সম্প্রদায়ের লোক।
শোভারাম যেবার প্রথম সচ্চরিত্রর সঙ্গে পাত্র দেখতে এসেছিল, জিজ্ঞেস করেছিল–ওসব কারা ঘটকমশাই?
সচ্চরিত্র বলেছিল–সাবধান, আস্তে কথা বলুন বিশ্বাসমশাই, কোম্পানির দালাল ওরা। ওদের অমন কথা বলবেন না, ওদের দোরে লক্ষ্মী বাঁধা, কঁচা টাকা ওদের হাতে জমেছে, ও আপনার মুর্শিদাবাদও নয়, হাতিয়াগড়ও নয়, আপনি আজ্ঞে করে কথা বলতে হয় এখেনে–
সচ্চরিত্র বলত ও চিৎপুর সিমলে মির্জাপুর আরপুলি কলিঙ্গা বির্জিতলাই বলুন আর ওদিকে বেলগেছে উলটোডিঙি কামারপাড়া কঁকুড়গাছি বাগমারি ট্যাংরাই বলুন, সব আমার এলাকার মধ্যে
রাস্তার মধ্যে কাউকে দেখলেই ঘটকমশাই ডাকত–ওগো, ও-মশাই শুনছেন
কে গো, আমাকে ডাকছ?
বলি এখানে বিয়ের যুগ্যি পাত্তোরটাত্তোর আছে? আমি সচ্চরিত্র ঘটক, আমার পিতা ঈশ্বর ইন্দিবর ঘটক, পিতামহ কালীবর ঘটক, প্রপিতামহ সিদ্ধেশ্বর ঘটক, ঘটকালি আমাদের সাতপুরুষের পেশা–
ভদ্রলোক বারকয়েক দেখলেন সচ্চরিত্রর দিকে। দেখে কী ভাবলেন কে জানে। বললেন–ওদিকে দেখুন, এদিকে নেই
ইন্দিবর ঘটক সচ্চরিত্রকে ছোটবেলাতেই বলে গিয়েছিলেন। এবার আমাদের ধর্মকর্ম সব যাবে সচ্চরিত্র–
সচ্চরিত্র তখন ছোট। বুঝতে পারেনি কথাটা। জিজ্ঞেস করেছিল কেন?
যাবেই তো! ইদিকে নবাব হল ম্লেচ্ছ, উদিকে ফিরিঙ্গিরাও হল ম্লেচ্ছ, জাতজন্ম আর ক’দিন বাঁচবে? হিন্দু আর কেউ থাকবে না
তা বটে! কিছুই আর থাকবে না। এরকম করে আর জাত-পেশা রাখা চলবে না। হঠাৎ দূর থেকে আলোটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। ছাতিমতলার ঢিবিটা পেরিয়ে একেবারে করুণাময়ীর ঘাট বরাবর গিয়ে হাজির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সচ্চরিত্র। হ্যাঁ, ঠিক এসেছে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল নৌকোর গলুইয়ের ওপর। পড়েই কান্তর হাতখানা ধরে ফেলেছে। তুমি আমাকে কী বিপদে ফেলেছিলে বলল দিকিন বাবাজি, আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারিনে, এদিকে খিদে পেয়েছে, আর ওদিকে কী কাণ্ড বলল দিকিনি তোমার, ছি ছি ছি আমি হলাম ঈশ্বর ইন্দিবর ঘটকের পুত্র, ঈশ্বর কালীবর ঘটকের পৌত্র…।
কান্ত যেন মুশকিলে পড়ল। বশির মিঞাই তো আসলে গণ্ডগোল বাধালে। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়েই তো ভাটা এসে গেল নদীতে। চড়ায় আটকে গেল নৌকো।
তাড়াতাড়ি কান্তকে নিয়ে ছুটেছে সচ্চরিত্র। বিয়েবাড়ির সামনে গোলমাল শুনে শোভারামও ছুটে এসেছে। মনটা বড় খারাপ ছিল তার। এত সাধের মেয়ে তার। একেবারে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললে কান্তকে দেখে।
কান্ত বললে–নদীতে ভাটা পড়ে চড়ায় আটকে গিয়েছিল আমার নৌকো,
গোলমাল শুনে সিদ্ধান্তবারিধিমশাইও এসে পড়েছিলেন। বললেন–তা এখন তো আর উপায় নেই। শোভারাম, সম্প্রদান তো হয়ে গেছে–
