খোদাবন্দ!
কে? নেয়ামত?
একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলুম বোধহয়। নেয়ামত ভেবেছে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। ভেবেছে আমি ভয় পেয়েছি। কিন্তু ভয় যদি সত্যিই পেতুম তো তুমি কি আজ বেঁচে থাকতে মিরজাফরসাহেব? আর জগৎশেঠজি, তোমাকেও আমি এবার চিনে নিলাম। আমার বিপদের দিনে যদি তুমি আমাকে মদত না দেবে তো তোমাকেই বা আমি মদত দেব কেন? আজ যখন সব সেপাইরা বাকি তলব না পেলে লড়াইতে আসবে না বললে, তখন তুমি মনে মনে হেসেছিলে, তা আমি বুঝতে পেরেছি। তোমাকে আমি দেখে নেব। শুধু তোমাকে নয়, সবাইকে দেখে নেব। এবার বাংলা মুলুক থেকে ফিরিঙ্গিদের তাড়িয়ে দিয়ে ফিরে এসে তোমাদের সকলকে দেখিয়ে দেব কার নাম মির্জা মহম্মদ আলি।
মিরমদন এসে কুর্নিশ করে দাঁড়াল।
ওদের কত ফৌজ, গুণে দেখেছ মিরমদন
মিরমদন বললে–দেখেছি আলি জাঁহা। ও-নিয়ে খোদাবন্দ কিছু ভাববেন না, আমাদের ফৌজ ওদের ফতে করে দেবে
তারপর হাত বাড়িয়ে একটা চিঠি দিলে।
কার চিঠি? ল’ সাহেবের?
তাড়াতাড়ি লেফাফাখানা খুলে পড়তে লাগলেন নবাব। ফরাসি জেনারেল সাহেব চিঠি লিখেছে। একবার দু’বার তিনবার চিঠিটা পড়লেন। আর পাঁচ দিন! পাঁচ দিনের মধ্যেই এসে পড়ছে ল সাহেব।
লিখেছে–আমরা নবাবের অনুগত, নবাবের বিপদের দিনে আমরা সফৌজ নবাবের সাহায্যার্থে যাইতেছি। দুশ্চিন্তা করিবেন না। ইংরাজ আমাদের চিরকালের শক্র। ইংরাজদের আমরা কুকুরের অপেক্ষাও ঘৃণা করি। আমরা গিয়া ইংরাজদের সমূলে নিধন-সাধন করিব। রওয়ানা দিলাম। ইতি
চিঠি থেকে মুখ তুলতেই দেখলেন মিরমদন চলে গেছে। ভালই করেছে। অথচ মিরমদন, মোহনলাল এরা তো কাফের।
কাল রাত্রে সবাই মিলে এই তাবুর মধ্যে পরামর্শ করতে এসেছিল। কোথায় কোন দিকে কার ফৌজ কেমন করে সাজানো হবে তারই পরামর্শ। মিরমদন শেষ পর্যন্ত ছিল। আর ছিল মেহেদি।
মিরমদন চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ পেছন থেকে নবাব ডেকেছিলেন–মিরমদন, শোনো।
মিরমদন ফিরে দাঁড়িয়ে আবার কুর্নিশ করেছিল।
আচ্ছা মিরমদন, তুমি তো কাফের?
জি খোদাবন্দ!
তুমি গীতা পড়ছ? তোমাদের কাফেরদের গীতা আছে, তুমি তা পড়েছ?
লড়াই করতে এসে এ কী অদ্ভুত প্রশ্ন! মিরমদন খানিকটা অবাক হয়ে গিয়েছিল প্রশ্নটা শুনে। এমন কথা নবাবের মুখ থেকে শুনবে আশা করেনি মিরমদন।
বললে–না খোদাবন্দ, আমি গীতা পড়িনি
আচ্ছা, তুমি যাও আর আজিমাবাদের দিকে ঘোড়সওয়ার পাঠাও, লসাহেব আসছে কি না তাড়াতাড়ি খবর এনে দেবে
মিরমদন হুকুম শুনে চলে গেল কুর্নিশ করে।
মেহেদি অবাক হয়ে গিয়েছিল নবাবের প্রশ্ন শুনে।
মির্জা জিজ্ঞেস করেছিল–দেখছ তো মেহেদি, মিরমদন গীতাও পড়েনি
কেন আলি জাঁহা, ওকথা জিজ্ঞেস করলেন কেন ওকে?
জানো মেহেদি, আমি মরিয়ম বেগমসাহেবার কাছে শুনেছিলুম কাফেরদের গীতাতে নাকি আছে, আত্মীয়স্বজনদের খুন করলে কোনও গুনাহ হয় না। তুমি আমি দরকার হলে মুলুকের ভালর জন্যে নিজের ভাইকেও খুন করতে পারি–একথা লেখা আছে নাকি কাফেরদের গীতাতে
মেহেদি নেসার একথাগুলো ঠিক বুঝতে পারেনি। খানিক পরে মেহেদিও চলে গিয়েছিল তাবু ছেড়ে। তারপর সমস্ত রাতটাই একা কেটেছে। শুধু নেয়ামত এক-একবার উঁকি মেরে দেখে গেছে নবাব ঘুমিয়েছে না ঘুমোয়নি। তারপর ওই আমগাছগুলোর পাতায় পাতায় যেন একটা অদ্ভুত শব্দ শুরু হয়েছে। সে এক অদ্ভুত শব্দ। সমস্ত রাত নবাব সেই এক শব্দ শুনেছে কান পেতে। আর নেয়ামত বারবার কেবল তামাক সেজে দিয়ে চলে গেছে। ওদিকে ভাগীরথী দাদপুর থেকে এঁকেবেঁকে রামনগর হয়ে একেবারে পলাশির গা বেয়ে লম্বা চলে গেছে। রামনগরের কাছে ইংরেজরা ছাউনি গেড়েছে। আর তাদের সামনেই কয়েক শো সেপাই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিনফ্রে সাহেব। লোকটা ভাল। যতদিন না ল’সাহেব আসে ততদিন সিনফ্রে ঠেকিয়ে রাখৰে ইংরেজদের। তার বাঁ-হাতি জায়গাটায় আধা-গোল হয়ে চাঁদের রেখার মতো দাঁড়িয়ে আছে সেপাইদের দল। রাজা দুর্লভরাম, ইয়ার লুৎফ আর মিরজাফর। আলি খা। আর দু’দলের মাঝামাঝি মোহনলাল আর মিরমদন।
তামাক টেনে টেনে গলাটা শুকিয়ে এসেছিল নবাবের।
ডাকলে–নেয়ামত।
এই নেয়ামতই বরাবর আমার সঙ্গে সব জায়গাতে গেছে। সেবারে গিয়েছিল পুর্ণিয়াতে, তার আগের বারে কলকাতার হালসিবাগানে। সেবার হঠাৎ হালসিবাগানে নানিবেগম আর মরিয়ম বেগমসাহেবা এসে পড়েছিল। এবারও যদি আসে?
নেয়ামত এসে কুর্নিশ করলে। করে সামনে দাঁড়াল।
কী জন্যে নেয়ামতকে ডেকেছিল তা আর তখন মনে নেই।
হঠাৎ নবাব বললে–তামাক দে
ওদিক থেকে আর একটা কামানের আওয়াজ এল কানে। সিনফ্রে কাজের লোক। হুঁশিয়ার লোক। কিন্তু মিরজাফর আলির দিক থেকেও আর কোনও সাড়া শব্দ নেই। ইয়ার লুৎফ খাঁ’র দিক থেকেও নয়। রাজা দুর্লভরামও কি চুপ করে আছে?
নেয়ামত তামাক দিয়ে গেল কলকেতে।
নবাব বললে–মেহেদি সাহেবকে এত্তেলা দে তো নেয়ামত
ওদিকে লড়াই চলেছে আর এদিকে খালের অনেক এপাশে তাবু পড়েছে নবাবের। তার পেছনে খানসামা, বাবুর্চি, মশালচি, জমাদার, পেয়াদা, নফর–সকলের তাবু। ফিরিঙ্গিদের দিক থেকে কামান ছুড়লেও এখানে এত দূরে এসে পড়বার ভয় নেই।
মেহেদি নেসার সাহেব এখানে নেই খোদাবন্দ।
কোথায় গেল সে? ডেকে আন!
আবার যেন কয়েকবার কামান দেগে উঠল। এ মোহনলাল আর মিরমদনের কামান। সাবাস মোহনলাল, সাবাস মিরমদন। আকাশের খোদাতালাহ আজ সাক্ষী রইল ইয়ার, আমি তোমাদের কথা ভুলব না। তোমাদের আমি আরও বড় ওমরাহ করে দেব।
