দেখো
মহারাজ যেন কেমন অন্যমনস্ক ছিলেন। বললেন–দেখো, মোগলের রাজত্বে বাস করি, জাত নিয়ে এত বড়াই ভাল নয়। হাতিয়াগড়ের ছোটরানির কথা শুনেছ তো?
গৃহিণী বললেন কিন্তু আমি হাতিয়াগড়ের রানি নই, নবদ্বীপের মহারানি, আমার সঙ্গে তুমি হাতিয়াগড়ের ছোটরানির তুলনা করলে?
তুলনা করিনি, কিন্তু ভবিতব্যের কথা কেউ কিছু বলতে পারে না। তাঁকে শেষপর্যন্ত মোগলের চেহেল্-সুতুনে গিয়ে গোরুর মাংস খেতে হয়েছে–তা তো জানো?
তাঁর কথা ছেড়ে দাও—
মহারাজ বললেন–তাঁর কথা ছেড়ে দিতে পারবনা। আর আমি ছাড়লেও তিনি ছাড়বেন না। তিনি এখানে এসেছেন, এই রাজবাড়িতে!
তার মানে? তুমি বলছ কী?
মহারাজ বললেন–হ্যাঁ, মরিয়ম বেগমসাহেবা এখন এই রাজবাড়িতেই এসে উঠছেন–
গৃহিণী বললেন–ওমা, তুমি সেই মোছলমান মাগিকে এখানে এনে তুলবে নাকি? তুমি কি জাত-জম্ম কিছু রাখবে না আমাদের? আমি যাচ্ছি বড়দিকে গিয়ে…
না না, শোনো শোনো
মহারাজ থামিয়ে দিলেন গৃহিণীকে। বললেন–কিছু বোলো না কাউকে, তোমাকে বলাই দেখছি ভুল হয়েছে, তোমরা মেয়েমানুষ, পেটে তোমাদের কিছু কথা থাকে না। বোঝে না কেন, এসব কথা কাউকে বলতে নেই। মরিয়ম বেগমসাহেবাও আসছেন, আর ওদিকে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইকেও আসতে চিঠি লিখছি–
তা ওই মোছলমান বউকে নিয়ে আবার ছোটমশাই ঘর করবে নাকি?
মহারাজ দেখলেন মহা বিপদ। বললেন–শোনো, কাছে এসো, আর যাই করো, এ নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না। দিনকাল এখন ভাল নয়। যদি কেউ কথাটা নবাবের কানে তুলে দেয় তখন তোমার অবস্থাও খারাপ হবে। তখন তোমার নামও হয়তো নশিরন বেগম হয়ে যাবে।
ইঃ, তার আগে আমি বিষ খেয়ে মরব না?
মহারাজ বললেন–থাক, অত বড়াই কোরো না। ছাতার আড়ালে আছ তাই বুঝতে পারছ না কত কায়দা করে রাজত্ব চালাতে হচ্ছে আমাকে। সত্যিই দিনকাল খুব খারাপ। এখন যে-কোনও দিন। যে-কোনও জমিদারের ওই হাতিয়াগড়ের অবস্থা হতে পারে–তুমি কাউকে বোলো না এসব কথা। তখন তোমারও বিপদ আমারও বিপদ
ওদিকে গঙ্গার ঘাটে বজরা থেকে তখন দুটো ঘোমটা দেওয়া মূর্তি অন্ধকারের আড়ালে চুপি চুপি নেমে এল। মহারাজের চারজন দাসী তৈরিই ছিল সেখানে পালকি নিয়ে। সোজা গিয়ে তারা পালকির মধ্যে উঠল।
পালকিটা চলতেই কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই এগিয়ে এলেন। বললেন–তা হলে আসি আমি।
কান্তও নমস্কার করলে। বললে–আসুন, দেখবেন দেওয়ানমশাই, যেন এখবর কেউ টের না পায়। ছোটমশাইকে ডেকে এনে যেন তাঁর হাতেই ওঁদের তুলে দেওয়া হয়–
তারপর আবার বজরায় এসে উঠল কান্ত। মাঝিরা তৈরিই ছিল। কান্ত বললে–চলো, বজরা ছেড়ে দাও–
বজরার নোঙর তুলতেই সেটা তরতর করে এগিয়ে চলল—
২.১৪ লক্কাবাগের আমবাগান
লক্কাবাগের আমবাগানে তখন আরও আলো ফুটেছে। কিন্তু বড় মেঘলা আবহাওয়া। এক লাখ আমগাছের বাগান। বড় বড় সমস্ত গাছ। সার সার দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। যে আমগাছগুলো পুঁতেছিল। সে বড় শৌখিন লোক ছিল বোধহয়। এখন আর আম নেই, সবই পেকে ঝরে গেছে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে এই আমবাগানের তলায় এসে পলাশি গাঁয়ের লোক কত আম কুড়িয়ে নিয়ে গেছে। এটাও জ্যৈষ্ঠ মাস। কিন্তু যেকটা আম এই সেদিন পর্যন্ত ছিল তাও আর নেই এখন। ভাগীরথীর তীরে এসে ব্যাপারীরা এই বাগান থেকেই নৌকোয় আম বোঝাই করে সহরে সদরে জেলায়-জেলায় নিয়ে গেছে। এখন আর বাগানে আমের বাহার নেই। শুধু পাতা, কচি কচি পাতাগুলো কালচে-সবুজ হয়ে মোটা হয়ে গেছে।
এই বাগানের ধারেই নবাব কতবার এসেছে শিকার করতে। নবাব মির্জা মহম্মদও কতবার ইয়ার বন্ধুদের নিয়ে এখানে এসে ওই বাড়িটাতে ফুর্তি করে রাত কাটিয়েছে। নবাবের ছাউনি থেকে ওটা দেখা যায়। ওই বাড়িটাতেই ফিরিঙ্গিরা এসে উঠেছে।
নবাব মির্জা মহম্মদ ছাউনির ঘুলঘুলি দিয়ে সেই দিকে চেয়ে দেখলেন।
রাত্রেই নজরে পড়েছিল জায়গাটা। খবর দিয়েছিল মেহেদি।
মেহেদি বলেছিল–আমরা আর একটু আগে এলে আর ওরা এই বাড়িটা দখল করতে পারত না। আলি জাঁহা
আলি জাঁহা, আলি জাঁহা, আলি জাঁহা! এই আলি জাঁহা ডাকটা বড় ভাল লাগত মির্জার। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছে দাদুকে সবাই ওই নামে ডাকত। তখন মনে হত কবে আমাকে ডাকবে সবাই।
কতদিনকার সব সাধ। সব সাধ মিটে গেল এই পনেরো মাসের মধ্যে। রাতের-পর রাত জাগা, দিনের-পর-দিন ফুর্তি করা। সব হিসেব সব নিকেশ ঠিক ঠিক মিলে গেল। মানুষের জীবনে কত আর । সাধ থাকে? আর ক’টা সাধই বা কার মেটে। কোরান পড়ার পর থেকেই যেন এইসব ভাবনাগুলো। মাথার মধ্যে ঢুকে সমস্ত গোলমাল করে দিচ্ছে। আগে ঘুম আসত না। তখন হকিম ডেকেছে ইলাজের। জন্যে। কিন্তু মরিয়ম বেগমই প্রথম বলেছিল–এই মুর্শিদাবাদের মসনদের চেয়ে আরও বড় মসনদ নাকি আছে। তারপর সেই রামপ্রসাদ। রামপ্রসাদের গান-মাগো আমার এই ভাবনা। রামপ্রসাদের যা ভাবনা, নবাব মির্জা মহম্মদেরও যেন সেই একই ভাবনা। রামপ্রসাদ নবাবের ভাবনাটা জানতে পারলে কী করে? নবাব তো কাউকে নিজের মনের কথা বলেনি! নানিবেগমও জানত না, মা-ও জানত না। কেউ-ই তো নবাবের মনের কথা জানতে চায়নি। সবাই কেবল বলেছে–আরও দাও, আরও দাও। একজন মানুষ ক’জনকে দিয়ে খুশি করতে পারে?
তোমার কথা আজ মনে পড়ছে নবাব! তোমার সঙ্গে এমনি করে কতবার লড়াই করতে গিয়েছি! তোমার সঙ্গে কাটোয়ায় গিয়েছি, আজিমবাদে গিয়েছি, উড়িষ্যায় গিয়েছি। সেদিন তোমার মিরবকশিরা লড়াই করেছে আর তুমি তাবুর ভেতরে বসে তাদের তালিম দিয়েছ, মদত দিয়েছ। কখনও ধমক দিয়েছ। কখনও আবার গালাগালি দিয়েছ। আজ সব মনে পড়ছে। আবার কখনও তুমি তাদের খোশামোদও করেছ। তোমার কাছেই তো আমি শিখেছিলুম নবাব যে, লড়াই করতে গিয়ে কোনও নীতি মানতে নেই। তুমিই তো আমায় শিখিয়েছিলে নবাব, লড়াইয়ের নীতির সঙ্গে জিন্দগির নীতির কোনও মিল নেই। তুমিই বলেছিলে–ইনসান যখন জবাব দেবে তখন খোদাতালাহও তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। আমার যা কিছু শিক্ষা সে তো তোমার কাছ থেকেই শেখা। কিন্তু তুমিও যা শেখাওনি তা শিখিয়েছে আমাকে মরিয়ম বেগমসাহেবা। হোক সে কাফের মেয়ে, কিন্তু ইনসানের বয়েত কাফেররাও জানে। তাদের কাছ থেকেও আমি অনেক শিখেছি নবাব। এখন যদি তুমি একবার কবর থেকে উঠে এসে আমাকে দেখো তো তোমারও চিনতে কষ্ট হবে। আমি অনেক বদলে গিয়েছি। তুমি জানো না তো আমি কোরান পড়ি আজকাল। তোমাকে বলে রাখি নবাব, এবার আমি ফিরিঙ্গিদের চিরকালের মতো হটিয়ে দেব। যদি এবার ফলতায় গিয়ে জাহাজ নোঙর করে তো সেখানে গিয়েও হামলা করব। এবার আর আমি ওদের বিশ্বাস করব না নবাব। ওদেরও বিশ্বাস করব না, আমার ওমরাওদেরও আর বিশ্বাস করব না। আমি এবার বুঝেছি, কাফের হলেই কেউ খারাপ হয় না, মুসলমান হলেই কেউ আবার ভাল হয় না। আমি বুঝেছি কোরানের জন্যে ইনসান নয়, ইনসানের জন্যেই কোরান।
