মহারাজ বলেছিলেন–তা স্ত্রীর রূপ থাকবে তা তো স্বামীর অপরাধ নয়—
কিন্তু ওই রূপই যে কাল হল মহারাজ!
মহারাজ বলেছিলেন–নিয়ম যে তাই! অর্থ থাকলে চোরের উপদ্রব হবেই। আপনার রূপসি স্ত্রী হবে, আর অন্যলোকে নজর দেবে না, তা কি কখনও সম্ভব ছোটমশাই? নজর যদি কেউ না দেয় তো বুঝতে হবে আপনার স্ত্রী রূপসিই নন। সেটাই কি আপনাদের মনঃপূত হবে?
এসব আলোচনা অনেকদিন আগেকার। তারপর হঠাৎ একদিন মুর্শিদাবাদ থেকে খবর এল মরিয়ম বেগমকে ক্লাইভ সাহেব আটক করেছে। আগে একদিন এই মরিয়ম বেগম ক্লাইভ সাহেবের দফতরে ঢুকে জরুরি চিঠি চুরি করেছিল, এবার তার শাস্তি দেবে হয়তো।
খবরটা পাওয়ার পর ছোটমশাইকে খবরটা দেবেন ভেবেছিলেন। সরখেল মশাইকে একবার পাঠিয়েও ছিলেন হাতিয়াগড়ে। কিন্তু সরখেল একদিন ফিরে এল খালি হাতে।
দেওয়ানমশাই জিজ্ঞেস করেছিল চিঠিটা কী করলি রে সরখেল?
সরখেল বলেছিল–চিঠি ফেরত নিয়ে এসেছি। ছোটমশাই তো সেই হাতিয়াগড়ে, চিঠি কার হাতে দেব?
তা ঠিক করেছিস।
বলে চিঠিটা ফেরত নিয়ে নিয়েছিল দেওয়ানমশাই। নিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল। এসব চিঠি রেখে দেওয়াও নিরাপদ নয়।
তারপর আর কোনও খবরাখবর নেই। মরিয়ম বেগম কোথায় রইল, কী হল তার, তারও কিছু হদিস নেই তখন। হঠাৎ একদিন খবর এল নবাব ফৌজ নিয়ে রওনা দিয়েছে মনকরার দিকে। তখন আর অন্য কোনও দিকে মন দেওয়ার মতো মনের অবস্থাও নেই। শুধু নবাবের যুদ্ধে যাওয়া তো নয়, সমস্ত বাংলাদেশটাই যুদ্ধে যাবে তার সঙ্গে। আর সমস্ত বাংলাদেশের প্রজারাই যে চেয়ে আছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দিকে। লড়াইটা সেবার বেধেছিল কলকাতাতে। সেখানে লড়াই বাধলে কারও কোনও ক্ষতি বৃদ্ধি নেই। কিন্তু কলকাতা ছাড়া আর সব জায়গাতেই তো মহারাজের অনুগৃহীত প্রজারা আছে। কেউ বা প্রজা, কেউ বা বৃত্তিভোগী পণ্ডিত। পাঠশালার খড়ের চালে যদি গুলি লেগে আগুন ধরে যায় তো মহারাজকেই তো তার গুণোগার দিতে হবে। নবদ্বীপেই যদি যুদ্ধ বাধে তো যা-কিছু লোকসান-ক্ষতি হবে তার খরচ দিতে হবে তো মহারাজকেই। নবাবও দেবে না, ফিরিঙ্গিরাও দেবে না।
আগের দিন খবর পেয়েছিলেন মহারাজ যে, নবাবের ফৌজ মনকরার দিকে গিয়ে মাঠের মধ্যে ছাউনি ফেলবে! মনে এমনিতেই একটা দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু অনেক রাত্রে দেওয়ানমশাইয়ের কাছে মরিয়ম বেগমের খবরটা পেয়ে আর এক দুশ্চিন্তায় পড়লেন। নবাব যদি জানতে পারে যে, তার বেগমকে তিনি লুকিয়ে রেখেছেন নিজের বাড়িতে, তা হলে?
কিন্তু তখন কি আর অত ভাববার সময় আছে?
বললেন তাড়াতাড়ি আপনি নিজে পালকি নিয়ে ঘাটে যান, সঙ্গে অন্দরের দু’চার জন ঝিউড়িদের সঙ্গে নিয়ে যাবেন। কেউ যেন জানতে না পারে। জানলে মহা মুশকিল হবে
তাদের কোথায় তুলব?
কোথায় আবার তুলবেন? অন্দরমহলে।
না, তা বলছি না। মুসলমান তো, ওঁদের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে। বাবুর্চি খানসামা… বলতে গিয়েও সংকোচ করতে লাগল দেওয়ানমশাই। কিন্তু মহারাজ বললেন–তা করতে হয় করতে হবে। কিন্তু তা বলে তো ওঁদের ফিরিয়ে দিতে পারি না। আমার এখানে যখন এসেছেন তখন ওঁদের আশ্রয় দিতেই হবে। আর আমার এখানে যে ওঁরা আছেন তাও যেন নবাবের কি ফিরিঙ্গিদের কানে না ওঠে। আর কালকেই সরখেলকে পাঠাতে হবে হাতিয়াগড়ে। চিঠি লিখে ওর হাত দিয়ে পাঠাবেন। চিঠিতে কিছু লেখার দরকার নেই। শুধু লিখবেন তিনি যেমন অবস্থায়ই থাকুন যেন চিঠি পাওয়ামাত্র রওনা দেন–
দেওয়ানমশাই চলে গেল।
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র আর দাঁড়ালেন না। ভেতরের দিকে চলতে লাগলেন। আজ একটু সকাল সকালই আসর ছেড়ে উঠেছেন। অন্ধকার রাত। তবুবর্ষার রাতে অল্প রাতেই বেশি অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। সারা। জীবনই মহারাজ এই অন্ধকারের সঙ্গে সংগ্রাম করে আসছেন। ভেবেছিলেন সব দায়িত্বটা পরের ঘাড়ের ওপর দিয়েই যাক। প্রত্যক্ষভাবে যেন আর তাকে জড়িয়ে পড়তে না হয়। নবাবের ভালবাসাও যেমন বিপজ্জনক, নবাবের রাগও তাই। জগৎশেঠজি, উমিচাঁদ, মেহেদি নেসার সবাই তাকে তাদের দলে থাকতে বলেছিল। হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইও বারবার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু এবার? ফিরিঙ্গিদের হারিয়ে দিয়ে নবাব যখন আবার মুর্শিদাবাদে ফিরে গিয়ে শুনবে, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বেগমসাহেবাকে তার নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে, তখন কী ভাববে?
ছোট গৃহিণী সামনে এসে অবাক হয়ে গেছে।
একী, তুমি? তুমি এই সন্ধেবেলা অন্দরমহলে? এত তাড়াতাড়ি তোমাদের আসর ভাঙল আজ?
মহারাজ গম্ভীরভাবে বললেন–আজ ঘুম পেয়ে গেল।
সেকী? আমি যে পাশার ছক নিয়ে যাচ্ছি বড়দির কাছে, খেলতে ডাকছিল বড়দি।
মহারাজ বললেন–তা যাও-না। তুমি পাশা খেললে আমার ঘুমের ব্যাঘাত হবে না।
কী হল বলো তো? এমন তো হয় না! তোমার নিশ্চয় কিছু হয়েছে। তোমার হাত দেখে কেউ গুণে কিছু বলেছে নাকি? যাকে-তাকে এমন হাত দেখাও কেন? তোমার গণতকাররা যা বলে তা তো ফলে না–
মহারাজ বললেন–গণতকারের কথা ফলে না কে বললে? আমি যে কুলীনকন্যাকে বিয়ে করব একথা তো বিদ্যানিধিমশাই আগেই বলে দিয়েছিলেন
হাসি বেরোল গৃহিণীর মুখ দিয়ে। বললেন–কিন্তু কুলীনকন্যা যে কিশোরকুলীনকে বিয়ে করবে একথা তো আমার হাত দেখে কেউই আগে বলতে পারেনি
