তা ছোটমশাই কোথায় গেল?
আজ্ঞে, ডাঙায় নেমেছেন। আমাদের বজরা বাঁধতে বলে নিজে ডাঙায় নেমে চলে গেছেন। আসতে দেরি হবে তার।
বশির মিঞা কী করবে বুঝতে পারলে না। তারপর বললে–তোমরা কোথা থেকে আসছ?
বৃন্দাবন বললে–আজ্ঞে, হাতিয়াগড় থেকে বেরিয়ে মুর্শিদাবাদ গিয়েছিলেন ছোটমশাই, সেখান থেকে এখানে এইচি
মেহেদি নেসার সাহেব এতক্ষণে কথা বললে–জিজ্ঞেস করলে–ছোটমশাই কে?
বশির মিঞা বললে–জনাব, ছোটমশাই হল হাতিয়াগড়ের জমিদার সাহেব। ডিহিদার রেজা। আলির এলাকায়। এই ছোটমশাইয়ের রানিসাহেবাই হল আমাদের মরিয়ম বেগমসাহেবা!
কথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল মেহেদি নেসারের কাছে। বললে–আচ্ছা, আমরা এখানে বসি, তোমাদের ছোটমশাই আসুক। ছোটমশাই বোধহয় বিবির খবর পেয়েই এখানে এসেছে। ওকে পাকড়ালেই মরিয়ম বেগমকে পাকড়ানো যাবে।
তাই বসা ভাল জনাব। যাবে কোথায় ছোটমশাই? বজরাতে তো আসতেই হবে!
মেহেদি নেসার বললে–তা তুই তো এখানেই দেখেছিলি মরিয়ম বেগমসাহেবাকে?
আজ্ঞে হ্যাঁ জনাব। আল্লার কিরে বলছি আমি, এই বজরায় কান্তবাবুকে দেখেছি আর মরিয়ম বেগমসাহেবাকে দেখেছি আমি ঝুট বলে জনাবকে মিছিমিছি তকলিফ দেব কেন?
মেহেদি নেসার বললে–ঠিক আছে, তুই ঝুট বলেছিস কি সাচ্চা বলেছিস, এখনই পরখ হয়ে যাবে, ওই ছোটমশাই হাজির হলেই পরখ হয়ে যাবে
বলে ছোটমশাইয়ের ঘরে ঢুকে তার বিছানায় বসে পড়ল। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলে সূর্যটা এবার যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেহেদি নেসার সাহেবের একবার মনে পড়ল লক্কাবাগের কথা। গুলি মারো লক্কাবাগের বুকে। মিছিমিছি ভেবে ফয়দা নেই। মিরজাফর সাহেব নিজেই আছে। ভেবে কী হবে? লক্কাবাগের পরের কথা ভাবাই ভাল। দেওয়ান-খালসা-শরিফা হয়ে তখন মরিয়ম বেগমসাহেবার ইজ্জত কেমন করে নেবে, সেই কথা ভাবাই ভাল।
*
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সেদিন সন্ধেবেলাই বিষ্ণুমঙ্গলের আসর বন্ধ করে দিয়েছিলেন। খবরটা কানে গিয়েছিল সকলেরই। তখন থেকেই মনটা বিগড়ে গিয়েছিল। তবু গোপালবাবু ছাড়েনি। একটার পর একটা কেচ্ছা শুনিয়েছে।
কৃষ্ণচন্দ্র বলেছিলেন–আর থাক গোপালবাবু, আজকে আর ভাল লাগছে না–এবার ঘুমোতে যাই–
গোপালবাবু বলেছিল–মহারাজের না-হয় দুটো পাখা, কিন্তু আমাদের যে একটা পাখা, আমাদের কি এত সকালে ঘুমোতে যাওয়া পোষায়?
পাখা মানে?
আজ্ঞে, পাখা মানে পক্ষ!
এতক্ষণে হাসি বেরোল মহারাজের মুখ দিয়ে। বললেন দ্বিতীয় পক্ষের মজাটাই বুঝেছ গোপালবাবু, জ্বালাটা তো আর বুঝলে না বুঝেছে মুর্শিদাবাদের নবাব, তার আবার হাজারটা পাখা। আর বুঝেছে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই। দুটো পাখার মধ্যে তার আবার একটা পাখা অকেজো
কথা হতে হতে হঠাৎ কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই ঘরে ঢুকলেন।
কী খবর সিংহীমশাই, লক্কাবাগের খবর কিছু পেলে?
আজ্ঞে না, অন্য একটা খবর আছে—
কী খবর?
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। দেওয়ানজির মুখ দেখেই বুঝেছিলেন, একটা কিছু গুরুতর খবর আছে। তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দাঁড়ালেন।
কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই মুখ নিচু করে বললে–হাতিয়াগড়ের দ্বিতীয় পক্ষের সহধর্মিণী এসেছেন–সেকী?
একেবারে চমকে উঠেছেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। বললেন–কোথায়? কোথায় এসেছেন? কার সঙ্গে এসেছেন?
.
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের অনেক দিন থেকে সন্দেহ হচ্ছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে যেসব খবর পাচ্ছিলেন তিনি, তাতে তারও কেমন ভয় লেগে গিয়েছিল। নবাবের সঙ্গে ফিরিঙ্গিদের ঝগড়া দিন দিন যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে একটা বিপর্যয় ঘটবে তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তা যে এত তাড়াতাড়ি ঘটবে তা বুঝতে পারেননি। নবাবের ফৌজের মধ্যেও তার লোক ছিল। তিনি নিজের জমিদারি থেকে তাকে মাইনে দিতেন। সেই শশীর কাছ থেকেও খবর আসত ফৌজের লোকেরা টাকা না পেলে লড়াইতে যাবে না বলে দিয়েছে। এক-একটা খবর আসত আর মহারাজ দেওয়ানমশাইকে ডাকতেন। যখন সবাই আসর ছেড়ে চলে যেত তখন চুপি চুপি দু’জনে পরামর্শ করতেন।
এমন করে মরিয়ম বেগমের চেহেল-সূতুন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার খবরটাও কানে এসেছিল।
একজন সামান্য মেয়ে সবাইকে কী রকম নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে তা ভেবেও অবাক হয়ে যেতেন।
একদিন ছোটমশাইকে বলেছিলেন সেকথা। বলেছিলেন–আপনার সহধর্মিণীর বাহাদুরি আছে ছোটমশাই। কোন বংশের মেয়ে তিনি?
ছোটমশাই বলেছিল–বংশ খুব বড়, কিন্তু বংশ দেখে তো বিয়ে হয়নি আমার মহারাজ। বড়গিন্নি নিজে পছন্দ করে আমার সঙ্গে সম্বন্ধ করেছিলেন। বড়গিন্নি রূপ দেখে এঁকে ঘরে এনেছিলেন। তবে বুদ্ধিমতী খুব
বুদ্ধিমতী সে তো বুঝতেই পারছি–তা না হলে বেগম তো আরও আছে নবাবের, কিন্তু এমন করে আগে কারও হাতের মুঠোর মধ্যে তো যায়নি নবাব
ছোটমশাই বলেছিল–কী জানি মহারাজ, আমি কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না। আমার সহধর্মিণী নবাবকে কেমন করে হাতের মুঠোর মধ্যে আনবে? বড় ধীরস্থির স্বভাব যে!
মহারাজ কথাটা শুনে হেসেছিলেন।
বলেছিলেন স্ত্রী-চরিত্র বড় রহস্যময় ছোটমশাই। আমারও তো দুটি স্ত্রী। আমি এদিকে এত বুঝি কিন্তু স্ত্রীদের আজও বুঝতে পারলাম না। অথচ এত বছর একসঙ্গে সংসার করছি
ছোটমশাই বলেছিল তা হবে, আমি অতশত নিয়ে মাথা ঘামাইনি মহারাজ। যতদিন বাবামশাই ছিলেন ততদিন তো কিছু নিয়েই মাথা ঘামাইনি। এখন তবু খাজনা-আবওয়াব নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়, নইলে বাকি খাজনার দায়ে কোনদিন জমিদারি নিয়ে টান পড়বে। সাংসারিক জীবনে এতদিন আমার কোনও অশান্তিই ছিল না। তবে একটা জিনিস নজরে পড়েছে, আমার গৃহিণীর রূপ ছিল অপূর্ব
