কোথায় কোথাকার কোন মিঞাসাহেব, কোন মিঞাসায়েবকে যে শাবাশ দিয়ে উঠল মেহেদি নেসার সাহেব তা বুঝতে পারলে না বশির মিঞা। ফিরিঙ্গিদের দিকটা আমগাছের আড়াল পড়েছে। আর নবাবের ফৌজের দিকটা একটু ফাঁকা ফাঁকা।
বশির মিঞার ভয় লেগে গেল। হঠাৎ জিজ্ঞেস করে ফেললে ফিরিঙ্গি সাহেবরা জিততে পারবে জনাব?
তুই থাম বেটা বেল্লিক, তুই লড়াইয়ের কী জানিস?
বহুদিন বোধহয় জায়গাটায় মানুষজন পা দেয়নি। বিরাট বিরাট আম গাছ। সেপাইদের কামানের পেতলগুলো কচি রোদ লেগে ঝকঝক করতে লাগল। মেহেদি নেসার চলে যেতে যেতেও পেছন ফিরে ফিরে দেখতে লাগল। নবাব তখনও ছাউনির ভেতর ঘুমোচ্ছে। তুমি ঘুমোও নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা আলমগির। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই তুমি স্বপ্ন দেখো ভবিষ্যতের। জেগে উঠে তুমি মিরজাফর আলি সাহেবকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা থেকে তাড়িয়ে দিয়ো। রাজা দুর্লভরাম, ইয়ার লুফৎ খাঁ সাহেব, তাদেরও কোতল কোরো। তুমি মহতাপ জগৎশেঠজির টাকাও ফৌজ দিয়ে লুঠ করে দিল্লির বাদশার সঙ্গে সেটাকা ভাগাভাগি করে নিয়ো। আজ যদি তোমার ঘুম ভাঙে তো জেগে উঠে যা তোমার খুশি তাই কোরো আলি জাঁহা। আর তারপর যখন মিরজাফর আলি সাহেব নবাব হবে, তখন আমাকে আর ইয়ার বলে ডাকতেও সাহস হবে না তোমার। তখন আমি মিরজাফর সাহেবের সনদ পেয়ে দেওয়ান-খালসাশরিফা মহম্মদ মেহেদি নেসার খাঁ সাহেব হয়ে গেছি। আমার সঙ্গে মোলাকাত করতে হলে তোমাকে তিনবার কুর্নিশ ঠুকতে হবে।
কী বললি?
বশির মিঞা বললে–কই, আমি তো কিছু বলিনি মেহেরবান
তুই কিছু বলিসনি? তা হলে কে যেন কী বললে–মনে হল!
কিছুই কেউ বলেনি। কিন্তু তবু মেহেদি নেসারের সন্দেহ হল কেউ যেন কিছু বললে। হাজার-হাজার সেপাইয়ের প্রাণ নিয়ে টানাটানি। পঁয়ত্রিশ হাজার পায়দল-ফৌজ একদিকে তলোয়ার উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পনেরো হাজার ঘোড়সওয়ার আর চল্লিশটা কামানের ধোঁয়ার ভিড়ে এমন সকলেরই হয়। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলারও হয়, মিরজাফর আলি সাহেবেরও হয়। যারা এই অদৃশ্য ইঙ্গিত উপেক্ষা করে, তারাই শুধু অবাক হয়ে যায়, তারাই শুধু ভাবে–কে যেন ডাকলে? কে যেন কী বললে–মনে হল?
তখনও পূর্বদিকের সূর্যটা লাল হয়ে রয়েছে। মেহেদি নেসার সাহেব আবার আকাশের দিকে চাইলে। তারপর বললে–চল, বেশি সময় নেই, যাব আর আসব ।
বশির মিঞা আগে আগে চলছিল। মেহেদি নেসারও চলতে লাগল। বেশি দূর নয়। নবাবের ছাউনিটা পেছনে ফেলে রেখে একটু এগিয়ে গেলেই দাদপুর। দাদপুরেই নৌকো তৈরি রেখেছিল বশির মিঞা। সেই নৌকোতে উঠে বশির মিঞা জোর তাগিদ দিলে–একটু জলদি বেয়ে চলো ভাই, বড় জরুরি কাম–
মেহেদি নেসারের চোখে তখনও আকাশের লাল সূর্যটা ভাসছে।
.
দূর থেকে বশির মিঞা আঙুল দিয়ে দেখালে ওই, ওই যে—
ওরই ভেতরে মরিয়ম বেগমসাহেবা আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, জনাব। আমি তো পেরিন সাহেবের বাগানে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়েই শুনলাম, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে ওরা ধরে রেখে দিয়েছিল ঘরে তালাচাবি বন্ধ করে। কিন্তু সেই তালা ভেঙে বেগমসাহেবা নাকি মাঝরাত্তিরে পালিয়ে গেছে।
তারপর?
তারপর ছুঁড়তে ছুঁড়তে কঁহা কঁহা গেলাম। ত্রিবেণীর ঘাটে দেখলাম ওই বজরাটা রয়েছে। তারপর ভাল করে নজর করে দেখি, আমাদের কান্তবাবু বাইরে বসে আছে। অন্ধকারে আমাকে ঠাহর করে দেখতে পায়নি। আমি…
কান্তবাবু কে?
জনাব, যাকে আমি নিজামতের দফতরে নোকরি করে দিয়েছিলাম। সেই হারামির বাচ্চা! সে তো এখন মরিয়ম বেগমসাহেবার খপ্পরে। মরিয়ম বেগমসাহেবা তাকে নবাবের জলুসখানায় কাম করে দিয়েছে। এখন তো আর চরের কাম করে না।
তা গরহাজির বলে তার নোকরি খতম হয় না কেন?
জনাব, মরিয়ম বেগমসাহেবার পেয়ারের আদমির নোকরি কে খাবে? কার এত কলিজার পাটা?
এই কথা?
মেহেদি নেসার যেন কান্তর চরম সর্বনাশ করবার আগে একবার দম নিয়ে নিলে। তারপর বললে–নবাব লড়াই থেকে ফিরে গেলে ওকে বরখাস্ত করে দিতে হবে।
জনাব, মরিয়ম বেগমসাহেবার লোক বলে এতদিন ওকে কিছু বলতে পারিনি।
এবার আর ওকে ছাড়ব না। কই, বাইরে কারা বসে আছে যেন মালুম হচ্ছে?
আজ্ঞে, ও-বজরার মাঝিমাল্লা। কান্তবাবু এখন ভেতরে মরিয়ম বেগমসাহেবার সঙ্গে মেহফিল করছে।
বলতে বলতে নৌকোটা একেবারে বজরার গায়ে এসে ভিড়ল। ভিড়তেই বশির মিঞা লাফিয়ে বজরার ওপর উঠেছে কান্ত, এই কান্ত
মেহেদি নেসার সাহেবও একেবারে পেছন পেছন এসেছে।
বশির মিঞা বললে–একটু হুশিয়ার থাকবেন জনাব, বেগমসাহেবার পেট কাপড়ে ছোরা থাকে—
দুত্তোর ছোরার নিকুচি করেছে বলে মেহেদি নেসার আরও এগিয়ে গেছে।
মাঝিমাল্লারা প্রথমে হাঁ হাঁ করে উঠেছিল। তারপর নবাবি-নিজামতের কোনও আমির-ওমরাহ ভেবে পেছিয়ে এল।
বশির ভেতরে উঁকি মেরে দেখলে কেউ নেই কোথাও। মাঝিদের জিজ্ঞেস করলে–বেগমসাহেবা কোথায় লুকোল? আর সেই কান্তবাবু তোদের কোথায় গেল?
বৃন্দাবন অবাক।
আজ্ঞে, বেগমসাহেবা তো কেউ নেই কর্তা। কান্তবাবু বলেও কেউ নেই। এ তো ছোটমশাইয়ের বজরা।
ছোটমশাই? ছোটমশাই কে? কোথাকার ছোটমশাই?
আজ্ঞে কর্তা, হাতিয়াগড়ের জমিদার ছোটমশাই–কেমন যেন শুকিয়ে গেল বশির মিঞার মুখটা। মেহেদি নেসার সাহেবকে এত দূর টেনে এনে এমন বোকা বনতে হবে বুঝতে পারেনি।
