মেহেদি নেসার বললে–আমার কথা ছেড়ে দিন আলি জাঁহা, আমি আপনার মুহব্বত পেয়েছি তাই-ই যথেষ্ট, আমি টাকা চাই না
সে তুমি ভাল লোক বলে তাই বলছ। কিন্তু আমার তো ইচ্ছে করে তোমাদের খুশি করতে কিন্তু কোথায় পাব টাকা? নবাব আলিবর্দি খাঁ কি একটা টাকা রেখে গেছে? বর্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে সব টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিল তার। আমি তখন বুঝিনি, তাই তার সঙ্গে কত ঝগড়া করেছি। কিন্তু নিজে নবাব হয়ে এখন সব বুঝতে পারছি। এখন বুঝতে পারছি নবাবের নিন্দে করা সোজা, নবাবের মসনদ কেড়ে নেওয়াও সোজা, কিন্তু নবাব যে হয়, সে-ই বুঝতে পারে নবাবি চালানো কত শক্ত!
তারপর একটু থেমে মির্জা মহম্মদ বলেছিল–আমি বলছি না যে আমার দোষ-ত্রুটি কিছু নেই। বলছি না যে আমি একেবারে নিষ্পাপ, কিন্তু নবাব হবার পর তো আমি কারও কোনও ক্ষতি করিনি! যা কিছু করেছি সব তো এই মসনদের জন্যেই! শওকত জঙকে খুন করেছি, কিন্তু নিজামত চালাতে গেলে সে তো করতেই হবে। ঘসেটি বেগমকে বন্দি করেছি, কিন্তু সেটুকুও যদি না করি তো এ-মসনদ থাকবে? যারা আমার ক্ষতি করতে চাইবে তাদের আমি শায়েস্তা করব না?
নিশ্চয় আলি জাঁহা, নিশ্চয় শায়েস্তা করবেন।
যাক গে, এত কথা বলবার সময় নেই এখন, ফিরিঙ্গিদের শায়েস্তা করে ফিরে এসে তখন এর সব ফয়সালা করব ইয়ার। আমি নানিবেগমকেও বলে রেখেছি, ফিরিঙ্গিদের আগে জব্দ করতে দাও, তখন আমি তোমাদের সকলকে ডেকে যার যা বলবার আছে সব শুনব! ঘসেটি বেগম গেছে, শওকত জঙ গেছে, এবার ফিরিঙ্গিদের খতম করে নিজের ঘরের লড়াই মেটাব। শুধু ভয় হচ্ছে মিরজাফরসাহেবকে নিয়ে
না আলি জাঁহা, মিরজাফরসাহেবকে আপনি মিছিমিছি ভয় করছেন! উনি তো আপনার সামনে কোরান ছুঁয়ে কথা দিয়েছেন!
মির্জা মহম্মদ বলেছিল–তা জানি ইয়ার, কিন্তু কোরান বড় না টাকা বড়?
রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে হাতির হাওদার মধ্যে বসে এইসব কথা হয়েছিল। পেছনে সামনে নবাবের ফৌজ। সার বেঁধে চলেছে সবাই! এক-একটা গ্রাম পার হয়েই ফাঁকা মাঠ। কয়েক ক্রোশ মাঠ পেরিয়ে আবার হয়তো একটা গ্রাম পড়ে। মেহেদি নেসারের মনে আছে, কথাগুলো বলতে বলতে মির্জা মহম্মদের চোখ দুটো এক-একবার বুজে আসছিল। এই এতগুলো সেপাই, এই হাজার হাজার গ্রাম, এই সারা বাংলা বিহার আর উড়িষ্যার নবাবের বন্ধু মেহেদি নেসার সাহেব। মেহেদি নেসারেরও ক্ষমতার শেষ নেই। তবু কেবল মনে হয়েছিল, আজ বিপদে পড়েই মির্জা নরম সুরে কথা বলছে। আবার যখন ফিরিঙ্গিদের লড়াই ফতে করে ফিরবে তখন এই মির্জাই আবার সকলকে একধার থেকে অপমান করবে। এই নবাবদের চিনতে বাকি নেই মেহেদি নেসারের।
মেহেদি নেসার বললে–আপনি মিছিমিছি সন্দেহ করছেন আলি জাঁহা, কোরানের কাছে কি টাকা বড় হতে পারে কখনও?
আরে ইয়ার, পারে। মহারাজ নন্দকুমার, মিরজাফর আলি, রাজা দুর্লভরাম, জগৎশেঠজি–এদের সকলের কাছে আল্লার চেয়ে টাকা বড়। শুধু উমিচাঁদ লোকটা ভাল। ও গুরুনানককে বড় ভক্তি করে
উমিচাঁদসাহেব ভাল?
হ্যাঁ, তোমরা যতই ওর নামে নিন্দে করো ইয়ার, আমি বলি সাচ্চা লোক।
কী করে বুঝলেন আলি জাঁহা?
কেন? উমিচাঁদ কি খারাপ লোক? তোমার কী মনে হয়?
মেহেদি নেসার বললে–আমি আপনার সঙ্গে একমত আলি জাঁহা। যদি খাঁটি লোক কেউ থাকে তো সে উমিচাঁদসাহেব।
মির্জা বলতে লাগল–তুমি ঠিক ধরেছ ইয়ার। মরিয়ম বেগমসাহেবা উমিচাঁদসাহেবের নামে আমাকে অনেকবার বলেছে, আমি বিশ্বাস করিনি। আমি ভাবছি মুর্শিদাবাদে ফিরে এসে দিল্লির বাদশার দফতর থেকে উমিচাঁদের নামে সনদ এনে দেব
হ্যাঁ আলি জাঁহা, খুব ভাল কাজ হবে–
আর দেখো, আমি মিরজাফরকে তাড়িয়ে দেব, একেবারে বাংলা মুলুক থেকে বার করে দেব। ওটা আসল হারামি। আর কী করব জানো? আমি সব ভেবে ঠিক করে রেখে দিয়েছি। মরিয়ম বেগমসাহেবাকেও আমি বলেছি। মুর্শিদাবাদ ছেড়ে আমি কলকাতায় গিয়ে রাজধানী বসাব, এখানে ফিরিঙ্গিদের কেল্লাটা ঠিকঠাক মেরামত করে নিয়ে আমার হারেম তৈরি করব
আহা, কত স্বপ্ন ছিল মির্জার! নিজের মনেই সব ভবিষ্যতের নকশা এঁকে নিয়েছিল। আগে তাড়াবে মিরজাফর আলিকে, তারপর রাজা দুর্লভরামকে, তারপর ইয়ার লুৎফ খাঁ-কে। আর জগৎশেঠ? জগৎশেঠজির সম্বন্ধেও একটা বন্দোবস্ত করে রেখেছিল মির্জা।
বলেছিল–তুমি যেন কাউকে বোলো না ইয়ার
না না, আমি কেন বলতে যাব আলি জাঁহা? আমি আপনার নিমকহারামি কখনও করতে পারি?
সে আমি জানি। তবু সাবধান করে দিচ্ছি। সাবধানের মার নেই। জগৎশেঠজির টাকা আমি ফৌজ দিয়ে লুঠ করাব। যদি দিল্লির বাদশা কিছু বলে তো আমি বাদশাকেও সে টাকার ভাগ দেব, তখন বাদশার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে কিন্তু একথা যেন কেউ টের না পায়, খুৰ হুঁশিয়ার
ফরাসিদের কামানের গোলাটা যখন গিয়ে ফিরিঙ্গিদের ছাউনির ওপর পড়ল, তখন নবাবের ওই কথাগুলো মনে পড়তে লাগল।
বশির মিঞার কথায় যেন হঠাৎ চমক ভাঙল। বশির বললে–চলুন জনাব, একটু জলদি করুন, নইলে মরিয়ম বেগমসাহেবার বজরা ছেড়ে দেবে
মেহেদি নেসার সাহেব রেগে গেল।
বললে–দাঁড়া বেল্লিক বেটা, লড়াইটা দেখি ঠিক-ঠিক হচ্ছে কি না–
সত্যিই সব মতলবই তো আগে থেকে ঠিক হয়েই ছিল। তারপর নবাবে কামানের গোলাগুলো যখন আমগাছের ডালে এসে পড়ল তখন মেহেদি নেসার সাহেব আবার তুড়ি দিয়ে উঠল। শাবাশ মিঞাসায়েব, শাবাশ!
