আর শুধু একবারই নয়। আগেও অনেকবার এমনই হয়েছে। সেই সফিউল্লা সাহেবের খুন হওয়ার পর থেকেই রেগে আছে মেহেদি নেসার সাহেব। মওকা খুঁজছিল শুধু। একবার যদি ধরে ফেলতে পারা যায় তো আর রক্ষে থাকবে না।
তারপর থেকেই বশির মিঞা আতিপাতি করে খুঁজছিল বেগমসাহেবাকে। হঠাৎ কানে এল মরিয়ম বেগমসাহেবা ধরা পড়েছে কলকাতায়। ওয়াটস্ সাহেব আর উমিচাঁদ সাহেব বেগমসাহেবাকে ধরে ক্লাইভ সাহেবের জিম্মায় পেরিন সাহেবের বাগানে রেখে দিয়েছে। খবরটা বশির মিঞার কানে আসতে একটু দেরি হয়েছিল। কবে গেল, কখন গেল, কিছুই টের পাওয়া যায়নি। সঙ্গে নাকি আবার একটা বাঁদিও আছে। বাঁদি কোত্থেকে এল কে জানে! চেহেল্-সুতুনের খোজারা পর্যন্ত কেউ জানল না, কেমন করে গেল সেখানে! অথচ গেল কেন? কী মতলব আছে তার?
মনসুর আলি সাহেব বলেছিল–নিশ্চয়ই আমাদের সব খবর ফাঁস করে দেবে
কোন খবর?
মেহেদি নেসারের মতো লোকও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এই মিরজাফর-উমিচাঁদ-জগৎশেঠজি সকলের সব খবর জানিয়ে দেবে নাকি? সে-সব খবর জানবে কী করে মরিয়ম বেগম?
আজ্ঞে, মিরজাফর সাহেবের দলিলটা যখন জগৎশেঠজির বাড়িতে পড়া হচ্ছিল, তখন যে মরিয়ম বেগমসাহেবা পাশের ঘর থেকে সব শুনতে পেয়েছে।
তা নবাবকে না জানিয়ে ক্লাইভসাহেবকে জানাতে যাবে কেন?
মনসুর আলি সাহেব বলেছিল–নবাবকে জানাবার সে ফুরসত পায়নি জনাব। আমার চর বশির মিঞা যে রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই মতিঝিলের ভেতরে না গিয়ে বেগমসাহেবা একেবারে সোজা কলকাতায় চলে গিয়েছে। ক্লাইভসাহেব যদি জানতে পারে নবাবের কানে সব পৌঁছেছে, তা হলে আর লড়াই করতে আসবে না
ব্যাপারটা তখন খুব ভাবিয়ে তুলেছিল মেহেদি নেসারকে। কিন্তু তারপরেই খবর এল ক্লাইভ সাহেব ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে আসছে। যেমন যেমন কথা ছিল তেমনই তেমনই কাজ হচ্ছে বোঝ গেল। কিন্তু তবু ভয়টা গেল না।
নবাবের দলবলের সঙ্গে যখন মেহেদি নেসার সাহেব মুর্শিদাবাদ থেকে বেরোল তখনও মনে ভয় ছিল, হয়তো সব গোলমাল হয়ে যাবে। হয়তো নবাব মরিয়ম বেগমসাহেবার খবরটা জানতে পারবে।
মেহেদি নেসার জিজ্ঞেস করেছিল মির্জাকে–এবার তয়ফাওয়ালিরা সঙ্গে যাবে না?
লড়াইতে যাবার সময় নবাবের দলের সঙ্গে বেগমরা যায়, তয়ফাওয়ালিরাও যায়। পূর্ণিয়ায় শওকত জঙ-এর সঙ্গে লড়াই করতে যাবার সময় তারা ছিল।
মির্জা বলেছিল-না–
মেহেদি নেসার সাহেব আবার জিজ্ঞেস করেছিল–তা বেগমসাহেবাদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে চললেন না কেন আলি জাঁহা?
মির্জার মুখখানা খুব গম্ভীর ছিল। বললে–না, কাউকেই সঙ্গে নেব না এবার ইয়ার। আর কোন বেগমকেই বা সঙ্গে নেব। কাউকেই যে সঙ্গে নিতে ভাল লাগছে না–
কিন্তু বেগমসাহেবারা সঙ্গে থাকলে মেজাজটা ভাল থাকত আলি জাঁহা।
কেউ তো আমাকে ভালবাসে না মেহেদি নেসার! সবাইকে যাচাই করে দেখেছি, তারা কেবল আমার খোশামোদ করে, তারা কেবল আমার তারিফ চায়, আমার বাহবা চায়। আমাকে কিন্তু তারা কিছুই দিতে চায় না। আমাকে দেবার মতো তাদের কিছুই নেই
মেহেদি নেসার বলেছিল–কিন্তু মরিয়ম বেগমসাহেবা?
তাকে আমি কিছু বলতে চাই না ইয়ার, সে বড় ভাল মেয়ে। তাকে তুমি জোর করে তার স্বামীর কাছ থেকে নিয়ে এসেছ। সে ওদের মতো নয়।
কিন্তু সে তো আলি জাঁহাকে ভালবাসে!
মির্জা বলেছিল–সে ভালবাসলেও আমি তো তার ভালবাসা নিতে পারি না ইয়ার। সে আমাকে রামপ্রসাদের গান শুনিয়েছে, সে আমাকে কোরান পড়তে শিখিয়েছে। তার জন্যে আমি আজ ঘুমাতে পারছি–তা জানো? তাকে আমি কেমন করে কষ্ট দিই!
কষ্ট?
কষ্ট নয়? যুদ্ধে যাওয়া কি সুখ? তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি ইয়ার। আমার ঘুম আসত না বলে সেও আমার সঙ্গে মাসের পর মাস রাত জেগেছে। আমার কীসে ভাল হবে, দিনরাত সেই কথাই কেবল ভেবেছে
আর কোনও বেগমরা তা ভাবে না ভেবেছেন?
মির্জা মহম্মদ কথাটা শুনে ম্লান হাসি হেসেছিল শুধু। বলেছিল আমার নিজের মা-ই কি আমার ভালর কথা কখনও ভেবেছে?
তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে বলেছিল–থাক গে ওসব কথা ইয়ার, ওসব কথা ভাবলে এখন চলবে না আমার। আমাকে এখন অন্য কথা ভাবতে হবে …আচ্ছা তোমার কী মনে হয় ইয়ার, মিরজাফরসাহেব আমার কোনও ক্ষতি করবে না, তুমি কী বলে?
কেন, ওরকম কথা বলছেন কেন আলি জাঁহা?
অনেক রকম কথা কানে আসে কিনা…
কী কথা?
অনেকে বলছে মিরজাফরসাহেব নাকি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে নাকি নিজে নবাব হবার চেষ্টা করছে…।
কী বলছেন আলি জাঁহা? মিরজাফরসাহেব কখনও এমন কাজ করতে পারে? মিরজাফরসাহেবকে আপনি চেনেন না?
কিন্তু জগৎশেঠজি কেন আমার সঙ্গে ওভাবে কথা বলে আজকাল? আমি কি কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি? অবশ্য বলতে পারো আমি যখন হুকুম দিয়েছিলাম যে মিরজাফরসাহেব দরবারে এলে খাজা হাদিকে সেলাম করতে হবে, এতে বোধহয় অপমান মনে করেছে–
মেহেদি নেসার বলেছিল–না না, তাতে কী! আপনাকে নবাবি করতে হলে সকলকে খুশি করা তো চলে না!
সত্যি ইয়ার, তুমি আমার কথাটা ঠিক বুঝেছ। ক’টা লোককে আমি খুশি করতে পারব? আগে অবশ্য ভেবেছিলাম, নবাব হলে আমার যত জানাশোনা বন্ধুবান্ধব তাদের সকলকে বড় বড় চাকরিতে বসিয়ে দেব। কিন্তু তা কি পেরেছি? তুমিই বলো না, পেরেছি? এই যে তুমি, তুমি আমাকে এত ভালবাসো, তোমারও মাইনে তো আমি বাড়িয়ে দিতে পারিনি
