মেহেদি নেসার নিচু হয়ে সরে এল পাশের দিকে। বললে–সরে আয় উল্লুক, মরে যাবি
বশির মিঞাও সরে এল প্রাণের দায়ে। সূর্যটা ততক্ষণে অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। মেহেদি নেসার সাহেব তখনও লড়াইটা দেখবার লোভ ছাড়তে পারছে না। যা-কিছু একটা ফয়সালা যেন এবার হয়ে গেলেই হয়। নবাবের ফৌজের কামান থেকে গোলাগুলো যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সবগুলোই আমগাছের ডালে গিয়ে লাগছে। সারা রাস্তা নবাবের সঙ্গে এসেছে মেহেদি নেসার সাহেব। এ-আসা মেহেদি নেসারের প্রথম নয়। মির্জা যতবার যেখানে গেছে, সেখানেই সঙ্গে গেছে। লড়াইতে গেলে ফুর্তিটা জমে ভাল। লড়াই তো করবে মিরবকশির ফৌজ। মরতে হলে মরবে সেপাইরা। এদিক-ওদিক থেকে গুলিগোলা ছোঁড়া হবে, সেই সময়ে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখতে ভাল লাগে। তারপর আছে ফুর্তি, হররা, মহফিল। আগে আগে মির্জার ফুর্তির ওপর লোভ ছিল। নিজেও ফুর্তি করত, সকলকে ফুর্তি করতে বলত। ক’মাস ধরে যেন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। মতিঝিলের আম-দরবারে যখন গেছে, সেখানকার খিদমদগার বলেছে, সদর দরওয়াজা বন্ধ। ভেতরে গিয়ে যে মির্জার সঙ্গে একটু কথা বলবে, তার ফুরসত মেলেনি। সবসময়েই নাকি মরিয়ম বেগম ভেতরে থাকে। যে-সময় মরিয়ম বেগমসাহেবা কাছে থাকে না, সে-সময় মির্জা মৌলবির কাছে কোরান পড়ে।
প্রথমে অবাকই হয়ে গিয়েছিল মেহেদি নেসার। তারপর হয়েছিল বিরক্ত। এ তত বড় মজা হল। কোথা থেকে মেহেদি নেসারই নিয়ে এসেছিল এই মরিয়ম বেগমকে! হাতিয়াগড়ের রানিসাহেবা। তখন ভেবেছিল মেয়েমানুষ দিয়ে ভুলিয়ে রাখবে নবাব মির্জা মহম্মদকে। এখন সেই মরিয়ম বেগমই আবার নবাবকে হাত করে ফেললে!
রাগটা তখন থেকেই ছিল মেহেদি নেসারের।
মনসুর আলি মেহের মোহরারকে তখন থেকেই হুকুম দিয়ে রেখেছিল, যেমন করে তোক ওই বেগমটাকে সরাতে হবে। সরাতে হবে মানে খতম করতে হবে।
মনসুর আলি মেহের সাহেব আবার যথারীতি হুকুম দিয়ে দিয়েছিল বশির মিঞাকে।
বশির মিঞা সেই সময় থেকে পেছনে লেগে আছে। বলেছিল–আমি ওকে খতম করে দেব ফুপাসাহেব!
মনসুর আলি সাহেব সাবধান করে দিয়েছিল–দূর বেল্লিক, খতম করবি না তুই, খতম করতে হলে মেহেদি নেসার সাহেব নিজেই করবে! তুই যেন বেল্লিকের মতো কাম করিসনি!
কিন্তু খতম করা কি অত সোজা! বড় চালাক মেয়ে মরিয়ম বেগমসাহেবা। তাঞ্জাম তাক করে কতদিন চকবাজারের রাস্তায় ওত পেতে থেকেছে। ভেবেছে, যখন অনেক রাত্রে বেগমসাহেবা মতিঝিল থেকে তাঞ্জাম করে ফেরে, তখন গুম করে ফেলবে। খোজা নজর মহম্মদকে কতদিন পান খাইয়েছে, পিরালি খাঁ-কেও কতদিন তোয়াজ করবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। রাতকে-রাত কাবার হয়ে গেছে চকবাজারের রাস্তার অলিগলিতে, তবু ধরতে পারেনি বেগমসাহেবাকে। কত বকুনি গালাগালি খেয়েছে মনসুর আলি মেহের মোহরার সাহেবের কাছ থেকে। আর বশির মিঞা শুধু নিজের নসিবকে গালাগালি দিয়েছে। নিজের ওপরেই তার রাগ হয়েছে।
একদিন প্রায় সবই ঠিক বন্দোবস্ত করে ফেলেছিল। গলির মোড়ে মোড়ে লোক বসিয়ে দিয়েছিল। বেগমসাহেবা আসবে আর তার পালকিকে বেপাত্তা করে দেবে। কিন্তু রাত যত বাড়তে লাগল, ততই উদ্বেগ বাড়তে লাগল। বেগমসাহেবার পালকির পাত্তা নেই। একবার মতিঝিল আর একবার চকবাজার করেছে। শেষকালে মতিঝিলে গিয়ে দেখেছে পালকি নেই। তখন এখানে-ওখানে খুঁজতে খুঁজতে একেবারে জগৎশেঠজির হাবেলিতে গিয়ে হাজির।
জগৎশেঠজির হাবেলির সামনে তখন বেগমসাহেবার পালকি মজুদ।
কিন্তু ওই হারামির বাচ্চা ভিখু শেখ! পাঠানের বাচ্চাটা বশির মিঞার সঙ্গে জানোয়ারের মতো ব্যবহার করে!
তারপর যখন ভোর হয়-হয়, তখন বেগমসাহেবার পালকি চলতে লাগল আবার।
পেছনে পেছনে বশির মিঞাও চলল।
কিন্তু সে-পালকি চেহেল্-সুতুনের দিকে না গিয়ে একেবারে সোজা চলতে লাগল গঙ্গার ঘাটের দিকে।
বশির মিঞা ভাবলে বেগমসাহেবা বুঝি বজরা করে কোথাও চলল।
পালকি-বেহারারা যখন পালকি নিয়ে চলেছে, বশির গিয়ে জিজ্ঞেস করলে–পালকিতে কে যায়?
বেহারারা বললে–কেউ যায় না
বেগমসাহেবা কোথায় গেল?
বজরায় করে চলে গেলেন।
কোথায় গেল?
তা জানি না হুজুর!
তারপর সেই রাত্রেই বশির মিঞা দলবল নিয়ে আবার একটা বজরা জোগাড় করে গঙ্গা পাড়ি দিলে। আগের বজরাটা যত জোরে যায়, পেছনের বজরাটাও তত জোরে চলে। শেষে যখন সামনের বজরার পাত্তা পাওয়া গেল, তখন মুর্শিদাবাদ থেকে অনেক ক্রোশ দূরে চলে এসেছে।
কিন্তু কোথায় কী! সব ভোঁ ভোঁ!
বশির জিজ্ঞেস করলে–বেগমসাহেবা কোথায়?
মাঝি বললে–বেগমসাহেবা? কোন বেগমসাহেবা? কার কথা বলছেন হুজুর?
কেন, মরিয়ম বেগমসাহেবা? এই বজরাতেই তো ছিল। কোথায় গেল? কোথায় লুকোল?
মাঝি বললে–কোথায় আবার লুকোবে হুজুর, এ তো খালি বজরা, এবজরাতে সারাফত আলি সাহেবের সওদা এসেছিল হুগলি থেকে, মাল খালাস করে আবার হুগলি ফিরে যাচ্ছি
সেবারে খুব বোকা বানিয়েছিল বেগমসাহেবা। ঝুটমুট হয়রানি আর ঝামেলা পোয়াতে হয়েছিল বশির মিঞাকে। কিন্তু কোথায় যে বেগমসাহেবা গিয়েছিল, তারও ঠিকানা পাওয়া যায়নি! না ছিল পালকিতে, না ছিল বজরাতে।
মনসুর আলি মেহের সাহেব খুব ধমক দিয়েছিল–তা হলে যাবে কোথায়? পালকিতে থাকবে না, বজরাতেও না, তা হলে কোথায় যাবে? আসমানে উড়ে পালিয়ে গেল বলতে চাস?
