ছোটমশাই আবার জিজ্ঞেস করলে–ক্লাইভসাহেব এ রাস্তা দিয়ে ফৌজ নিয়ে যায়নি?
আজ্ঞে, ওঁয়ারা কিছুই জানেন না!
ছোটমশাই ভাবলে, তা হবে হয়তো, ঘোটলোক, কোনও খবরই রাখে না। কিংবা হয়তো বিদেশি লোক, সবে এইমাত্র ঘাটে এসে লেগেছে। মাথাটা তুলে ছোট ঘুলঘুলিটা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে চেয়ে রাতটা আন্দাজ করবার চেষ্টা করলে ছোটমশাই। পুবদিকটায় একটু যেন লালচে আভা দিয়েছে। আর খানিক পরেই ভোর হবে। তারপর মাথাটা আবার বালিশের ওপর রেখে বললে–ঠিক আছে, তুই এখন একটু ঘুমিয়ে নে, আমি তোকে ডাকব’খন—
*
আর সত্যিই তখন কেউ-ই জানতে পারলে না যে, পুবদিকের আকাশটা অন্য দিনের চেয়ে যেন একটু বেশি লালই হয়ে উঠেছে। জানতে পারলে না যে অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোর হতে বেশি দেরি নেই
লক্কাবাগের ছাউনির ভেতরে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা তখন পরদার ফাঁক দিয়ে একবার বাইরের দিকে চাইলে। সত্যিই আকাশটা যেন অন্য দিনের ভোরের চেয়ে একটু বেশি লাল। কিংবা হয়তো কুয়াশার জালে আটকে গেছে সূর্যের আলোটা। তাই অত লাল দেখাচ্ছে।
ভোররাত পর্যন্ত মেহেদি নেসার নবাবের সঙ্গে ছিল। তারপর নবাবের ঘুম পাচ্ছে দেখে বেরিয়ে এল। ওদিকটা চুপচাপ। লাল লাল টুপি মাথায় ফিরিঙ্গিদের দূর থেকে দেখা যায় ছোট ছোট পিঁপড়ের সারির মতো।
মেহেদি নেসার সাহেব একটা তুড়ি মারলে নিজের মনেই! টাকা নিয়েই যত গোলমাল। মির্জা মহম্মদ প্রথমে যখন ভয় পেয়েছিল তখন মেহেদি নেসার সাহেবই সাহস দিয়েছে তাকে।
মির্জা বলেছিল–এত টাকা এখন কোথায় পাব?
ফৌজি সেপাইরা সবাই একজোটে বেঁকে বসেছিল মুর্শিদাবাদে। অনেক দিন মাইনে পায়নি তারা!
মেহেদি নেসার বলেছিল–শালাদের সব গুলি করে মারব, শালারা হারামজাদা
মির্জা থামিয়ে দিয়ে বলেছিল–না থাক, এখন বিপদ আমার, এ সময় ওরাও যদি বেঁকে বসে তো কাদের ভরসায় লড়াই করতে যাব
ইয়ারজান সাহেবও সেই কথায় সায় দিলে। মিরমদন, মোহনলাল, মিরজাফর সাহেবও সেই কথায় সায় দিলে।
মিরজাফর সাহেব বললে–টাকা সব মিটিয়ে দিলেই হয়—
মির্জা মহম্মদ বললে–বিশ্বাস করুন, টাকা নেই আমার। অত টাকা দিতে গেলে সব খালি হয়ে যাবে
আশ্চর্য, সেই টাকা সমস্ত শোধ করার পর তবে সেপাইরা রাজি হয়েছে লড়াইতে আসতে। দুর্লভরাম, ইয়ার লুৎফ খাঁ সবাই এসেছে। এই লক্কাবাগের তিন দিক ঘিরে সাজিয়েছে মিরবকশি সাহেব।
পঁয়ত্রিশ হাজার পায়দল ফৌজ, পনেরো হাজার ঘোড়সওয়ার, আর চল্লিশটা কামান। আর ওদিকে দাঁড়িয়ে আছে ফরাসিরা। তাদের রাগ তখনও মেটেনি। তারা কথা দিয়েছে, ইংরেজদের তারা গুঁড়িয়ে পিষে মেরে ফেলবে তবে ঠান্ডা হবে। ইউনিয়ন জ্যাকের ওপরই তাদের বেশি রাগ, যে-ইউনিয়ন জ্যাক তাদের চন্দননগরের কেল্লার ওপর উড়ছে।
মেহেদি নেসার সাহেব আর একবার তুড়ি দিলে নিজের মনেই।
তুড়ি দিতেই হঠাৎ যেন শিউরে উঠেছে।–কে?
বশির মিঞা কখন ছায়ার মতন পেছনে এসেছিল জানতে দেয়নি।
আমি বশির মিঞা, খোদাবন্দ!
বশির মিঞা তো কী! কী দরকার তোর? দেখছিস এখন লড়াই শুরু হয়ে যাবে, এখন কিছু বলবার সময় নেই, তুই যা–ভাগ
খোদাবন্দ, মরিয়ম বেগমসাহেবার তালাস করতে হুকুম দিয়েছিলেন, সেই তালাস পেয়েছি।
মরিয়ম বেগমসাহেবা! মেহেদি নেসার সাহেবের এত আনন্দের মধ্যেও হঠাৎ একটা পরাজয়ের কাটা খচ করে বুকে বিধে গেল। মুর্শিদাবাদ থেকেই মেহেদি নেসার সাহেবের টনক নড়েছে। চেহেল্-সুতুন থেকে নিঃশব্দে মরিয়ম বেগমের পালিয়ে যাওয়াটা যেন মেহেদি নেসার সাহেবের নিজের অপমান। ওটাকে জব্দ করতে না পারলে কীসের নবাবের পেয়ারের ইয়ার! সেই লস্করপুরের তালুকদার। কাশিম আলির যে অবস্থা করেছিল, মরিয়ম বেগমেরও সেই অবস্থা না করতে পারলে যেন আর কলজেটা ঠান্ডা হচ্ছে না। চেহেল্-সুতুনের খোজা সর্দার পিরালি খাঁ, নজর মহম্মদ, কেউই মরিয়ম বেগমসাহেবার হদিস দিতে পারেনি। আর তখন মির্জা লড়াই করতে বেরোচ্ছে, টাকার জন্যে হিমসিম খাচ্ছে, সে সময় অত ভাববার সময়ও ছিল না। শুধু মোহরার মনসুর আলি মেহের সাহেবকে খবরটা দিয়েই এই লক্কাবাগে চলে এসেছিল নবাবের ফৌজের সঙ্গে।
তারপর এই হঠাৎ আবার মরিয়ম বেগমসাহেবার খবর পাওয়া গেল।
বশির মিঞার দিকে চেয়ে বললে–কোথায় মরিয়ম বেগমসাহেবা?
খোদাবন্দ, ত্রিবেণীর ঘাটে!
ত্রিবেণীর ঘাটে!
জি হাঁ! আমি কলকাতায় গিয়েছিলুম, সেখান থেকে টুড়তে ছুঁড়তে শেষকালে ত্রিবেণীর ঘাটে এসে পাত্তা পেলুম!
কিন্তু কথাটা শেষ হবার আগেই একটা বিকট শব্দে কানে তালা লেগে যাবার অবস্থা হল। ফরাসিরা আচমকা একটা কামানের গোলা ছুঁড়েছে। গোলাটা গিয়ে পড়ল একেবারে ফিরিঙ্গিদের ছাউনির ওপর। আর ঠিক তার সঙ্গে সঙ্গে যেন ক’জন লোকের চিৎকার কানে এল!
ইয়া আল্লা!
মেহেদি নেসার খুশির চোটে আর একবার তুড়ি মারলে। তারপর বশির মিঞার দিকে চেয়ে বললে–চল, আমি ত্রিবেণীর ঘাটে যাব-চল শালা, চল
তারপর ফিরিঙ্গিদের কামানগুলো ফেটে চৌচির হয়ে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজ হতে লাগল–দুম দুম দুম
মেহেদি নেসার একবার মিরজাফর সাহেবের ফৌজের দিকে চেয়ে দেখলো কোথায়? মিরবকশি সাহেবের মতিগতি তো বোঝা যাচ্ছে না কিছু। তবে কি সব বানচাল হয়ে যাবে? সব বন্দোবস্তই তো ঠিক হয়ে আছে। হঠাৎ নবাবের ফৌজের ডান দিক থেকে দুম দুম করে আবার শব্দ হল।
