মরালী সেকথায় কান না দিয়ে বললে–যাদের জন্যে আমি নিজের সব সুখে জলাঞ্জলি দিয়েছি এরা তারা, তা তো তুমি জানো?
কান্ত বললে–জানি
এদের তো উদ্ধার করা হল। এখন এদের হাতিয়াগড়ে পৌঁছে দিয়ে তুমি আমাকে যেখানে খুশি নিয়ে যেতে চাও, চলো।
কান্ত বললে–বলছ কী তুমি?
মরালী বললে–হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, একদিন তুমিই আমাকে চেহে সুতুন থেকে পালিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে। সেদিন এই ছোট বউরানির মুখ চেয়েই যেতে পারিনি। আজ আর আমার কারও ওপর কোনও দায়দায়িত্ব নেই, আজ আমি স্বাধীন।
কান্ত তখনও কথাটা বুঝতে পারেনি।
মরালী বলেছিল–হা করে দেখছ কী? আমি যা বলছি তাই করো—
কান্ত তখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। বললে–তুমি আমার সঙ্গে পালিয়ে যাবে?
কেন, পালাতে দোষ কী? এতদিন ওদের কথা ভেবেই আমি চেহেল্-সুতুন ছেড়ে যেতে চাইনি। এবার তো আর সে বাধা নেই!
কান্ত বললে–তা হলে নবাব? তুমি যে নবাবকে অত ভালবাসতে?
মরালী হাসল। বললে–নবাবের কি ভালবাসার লোকের অভাব আছে? নবাবকে ভালবাসতে লোকের অভাব হয় না।
কিন্তু তুমিই যে এতদিন পরে নবাবকে ঘুম পাড়ালে মরালী! তুমিই যে নবাবকে কোরান পড়তে শেখালে।নবাব যে তোমাকে না পেলে পাগল হয়ে যাবে!
মরালী আবার হেসে উঠল।
বললে–তুমি তা হলে নবাবকে ছাই চিনেছ! যেদিন নবাব মুর্শিদাবাদের মসনদ ছাড়তে পারবে সেইদিনইনবাব মানুষ হয়ে উঠবে। তার আগে নয়। তুমি তো জানো না, নবাবদের কাছে আগে মসনদ, তারপরে বেগম। বেগমরা তো নবাবের সম্পত্তি! নবাব কখনও বেগমদের ভালবাসতে পারে? না বেগমরাই কখনও ভালবাসতে পারে নবাবকে।
কান্ত সব শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে–তা হলে?
তা হলে যা বললুম তাই করো।
কান্ত বললে–তুমি কি পাগল হয়েছ? তোমাকে নিয়ে আমি কোথায় পালাব? যদি কেউ জানতে পারে তো তখন কী বিপদ হবে বলো তো।
মরালী বললে–তুমি তোমার পিদের কথাটাই ভাবছ আর আমার কথাটা একবারও ভাবছ না? এর পর পালিয়ে না গিয়ে কি আমার উপায় আছে মনে করো? আমি কোথায় যাব? আমি কি আমার বাবার কাছে গিয়ে এর পরও মুখ দেখাতে পারব? এর পর কে আমাকে আশ্রয় দেবে বলতে পারো?
কেন, তুমি ছোট বউরানির সঙ্গে ছোটমশাইয়ের বাড়িতেই থাকবে।
তবেই হয়েছে। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গিয়েছিলাম, তাতেই বলে পা সরিয়ে নিলে, এরপর বাড়িতে থাকতে দেবে, খেতে দেবে।
কিন্তু তুমি তো ওদের জন্যে অনেক করলে মরালী! কারও জন্যে কেউ যা করে না তুমি তাই-ই করেছ, তবু বলছ তোমাকে থাকতে দেবে না ওদের বাড়িতে?
মরালী বললে–ওকথা থাক–এখন কী করবে বলো? এবার যখন বেরিয়েছিলুম তোমাকে নিয়ে তখনই ভেবে ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, আর চেহেল্-সুতুনে ফিরব না।
ওদের হাতিয়াগড়ে পৌঁছিয়ে দিলে যদি আবার কোনও বিপদ হয়, তখন?
আবার কী বিপদ হবে?
যদি মেহেদি নেসারসাহেব আবার জানতে পারে যে, তুমি হাতিয়াগড়ের আসল ছোট বউরানি নও, তখন? যদি জানতে পারে যে, ছোট বউরানি হাতিয়াগড়ের বাড়িতেই আছে, তখন?
মরালীও কথাটা ভাবলে খানিকক্ষণ। তারপর বললে–তা হলে কোথায় ওদের নিয়ে যাই বলো তো? কোথায় নিয়ে গিয়ে ওদের লুকিয়ে রাখি?
কান্তও ভাবছিল। বললে–মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে ছোটমশাইয়ের তো খুব জানাশোনা আছে শুনেছি, তাদের কাছে সেই কেস্টনগরেই না-হয় রেখে আসি
হঠাৎ বজরাটা থেমে গেল। বাইরে থেকে মাঝি বললে–ত্রিবেণীর ঘাটে এসে গেছি হুজুর
কান্ত বললে–এই ত্রিবেণীর ঘাটেই বজরা বাঁধো
তারপর মরালীর দিকে চেয়ে বললে–ওদের জিজ্ঞেস করো ওরা কেষ্টগরে যাবে কিনা
মরালী বললে–আহা, ওরা ঘুমোচ্ছে ঘুমোক, জাগলে তখন জিজ্ঞেস করব–তার আগে বলল আমি কোথায় যাব?
কান্ত বললে–দাসমশাই? দাসমশাইয়ের কাছে যেতে তোমার আপত্তি কীসের?
ঠিক এই সময়েই আর একটা নৌকো এসে ঘাটে লাগবার শব্দ হল।
মরালী বললে–কারা এল ঘাটে?
কান্ত দেখে এসে ভেতরে ঢুকে বললে–না, ব্যাপারীদের নৌকো নয়, মনে হল কোনও জমিদারটমিদার হবেন; অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কেউ নামল না। বোধহয় ভেতরে ঘুমোচ্ছে
তা যদি চিনে ফেলে আমাদের? মাঝিদের জিজ্ঞেস করলে না কেন, ভেতরে কে আছে?
কান্ত বললেন, তাতে হয়তো আরও সন্দেহ হবে! ভাববে আমরাই বা অত খোঁজ নিচ্ছি কেন। তার চেয়ে চলো এখান থেকে চলে যাই
হঠাৎ বাইরে থেকে মাঝিটা ডাকলে–হুজুর
কান্ত বেরিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে কী?
এই দেখুন হুজুর, ওই বজরার মাঝি একবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে
কী, বলো?
লোকটা বিনীত হয়ে নমস্কার করে বললে–আজ্ঞে, আপনারা বলতে পারেন, ফিরিঙ্গি ক্লাইভ সাহেব কলকাতায় আছে কি না।
কান্ত বললে–ক্লাইভসাহেব কলকাতায় আছে কি না তা আমরা বলব কী করে? আমরা ক্লাইভসাহেবের দফতরে চাকরি করি?
আজ্ঞে তা নয়, রাস্তায় একজন বললে–কিনা সাহেব ফৌজ-সেপাই নিয়ে কলকাতা ছেড়ে কাটোয়ার দিকে গেছে। তাই বাবুমশাই আপনাকে জিজ্ঞেস করতে বললেন! আপনারা কিছু জানেন কিনা তাই জানতে চাইছেন
না বাপু, আমরা ওসব কিছু জানি না।
বৃন্দাবন আর একবার নমস্কার করে আবার নিজের বজরায় গিয়ে উঠল। ছোটমশাই তখন বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে ছিল।
বৃন্দাবন আসতেই ছোটমশাই জিজ্ঞেস করলে–কী রে বৃন্দাবন, কী বললে–ওরা?
বৃন্দাবন বললে–না হুজুর, ওয়ারা কিছু জানেন না
