কেন?
আজ্ঞে, কেষ্টবল্লভ যে রাজবল্লভ সেনের ছেলে। রাজবল্লভ সেনকে চেনেন তো? ঢাকার দেওয়ান, আলিবর্দি খাঁ’র পেয়ারের লোক ছিল। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে যে তার খুব ইয়ে–
ইয়ে মানে?
ষষ্ঠীপদ একটু বেঁকা হাসি হেসে বললে–ইয়ে মানে ইয়ে। আপনি তো কিছুই খবর রাখবেন না, কেবল চাকরি আর ঘুম। দুনিয়ায় কত কী ঘটে যাচ্ছে খবর রাখবেন তো!
ষষ্ঠীপদ কান্তর নীচে চাকরি করত। কান্ত মালের হিসেব রাখে, আর ষষ্ঠীপদ মালের বস্তা গোনে। কিন্তু খবর রাখে সব। কী করলে চাকরিতে উন্নতি করা যায় তার চেষ্টা ষষ্ঠীপদ করে। ষষ্ঠীপদ বলে–কোম্পানির চাকরি, এই আছে এই নেই, চিরকাল তো কোম্পানির চাকরি করলে চলবে না, কোম্পানিও চিরকাল থাকছে না। যদি নবাব কাছারিতে চাকরি পেতাম একটা তো আমার কী আর ভাবনা
তা বিয়ের দিন সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ এল। ভোরবেলাই এসে হাজির। সেদিন আবার কাজও খুব। চোখে-মুখে দেখবার সময় নেই কান্তর।
ঘটক মশাই বললে–চলো বাবাজি, আমার সঙ্গে চলো
কান্ত বললে–এখন যাব কী করে, এখনও ছুটি পাইনি যে ক’দিন ধরে আমার সাহেব আসছে না।
সে কী কথা? সাহেব যদি না আসে ততো তোমার বিয়ে বন্ধ হয়ে যাবে? একটি মেয়ের জীবন-মরণ সমস্যা, আর তোমার চাকরিটাই সেখানে বড় হল?
কান্ত বললে–না, তা বলছি না, আপনি এখোন, আমি নাপিতকে নিয়ে যাচ্ছি। আজ সাহেব আসবার কথা আছে
তুমি যাবে তো ঠিক বাবাজি?
কিছুতেই আর ঘটক মশাইয়ের সন্দেহ যায় না। কান্ত সমস্ত দেখালে। বিয়ের তোড়জোড় সমস্ত ঠিক করে রেখে দিয়েছে। গায়ে-হলুদের জন্যে তেল-হলুদ পাঠিয়ে দিয়েছে। সারাদিন উপোস করে আছে আর বিয়ে হবে না মানে। বড়চাতরায় চিঠি পর্যন্ত লিখে দেওয়া হয়েছে। সেখানকার বাড়ি-ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়েছে। জঙ্গল কেটে রাস্তা করা হয়েছে। নতুন বউকে নিয়ে যাবে, দেশে দশজনকে বউ দেখাবে। পিতৃপুরুষের ভিটে! নতুন বউ নিয়ে হাতিয়াগড় থেকে সোজা নৌকো করে তো সেখানে গিয়েই উঠতে হবে।
তারপরেই একটা কাণ্ড ঘটল। ঘটকমশাইকে বুঝিয়েসুঝিয়ে বিদায় করে দিয়ে ষষ্ঠীপদকে সব মালের হিসেব বুঝিয়ে দিলে। নাপিত তৈরিই ছিল। কান্ত সেজেগুজে নৌকোয় উঠতে যাবে, হঠাৎ বশির এসে পড়লে।
কোথায় যাচ্ছিস?
বিয়ে করতে। আর সময় নেই
তা আজকেই বিয়ে করতে চললি? এদিকে যে সব পয়মাল হয়ে গেল রে। তোর নোকরি হয়তো থাকবে না।
কেন?
তখন সত্যিই আর কথা বলবারই সময় ছিল না। মাঝি-মাল্লারা পাল খাঁটিয়ে দিয়েছে নৌকোয়। নাপিতও গিয়ে উঠে বসেছে পোঁটলাটা নিয়ে।
বশির মিঞা বললে–তোর সাহেবদের ওপর নবাব খুব গোঁসা করেছে। আমাদের কাশিমবাজারে ফিরিঙ্গিদের কুঠির ওয়াটস্ সাহেবকে নবাব ডেকেছিল, ডেকে খুব হল্লা করেছে, বলেছে রাজা রাজবল্লভের ছেলেকে যদি ফিরিঙ্গিরা না ফিরিয়ে দেয় তো কোম্পানির গুষ্টি তুষ্টি করে ছাড়বে।
কান্ত জিজ্ঞেস করলে–কেন, সাহেবদের কী দোষ?
দোষ নয়? ফিরিঙ্গির বাচ্চারা পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছে তার কাছ থেকে, তা জানিস? তোর সাহেবের দোস্ত ওই হলওয়েল আর ম্যানিংহাম, ওই দুটো ফিরিঙ্গি।
কান্তর মনে আছে সেসব কথা। বশির মিঞাই বলেছিল সব। উমিচাঁদই হচ্ছে নাকি আসল। তার সঙ্গেই সাহেবদের দোস্তালি। নারায়ণ সিং-কে সে-ই নিজের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিল। কেষ্টবল্লভ যে কলকাতায় এসে ফিরিঙ্গিদের কাছে থাকতে পেয়েছিল তাও রাজা উমিচাঁদের জন্যেই। রাজা উমিচাঁদকে প্রায়ই বেভারিজ সাহেবের কাছে আসতে দেখেছে কান্ত। সব সাহেবই আসত বেভারিজ সাহেবের বাড়িতে। ওই হলওয়েল সাহেব, ম্যানিংহাম সাহেব। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে এক কাণ্ড চলেছে তা জানত না। নবাবের মাসি যে নবাবের শত্রু, তাও জানত না।
তা হলে কী হবে?
বশির মিঞা বললে–লড়াই হবে। নবাব যখন একবার রেগে গেছে, তখন আর তো সহজে ঠান্ডা হচ্ছে না, ফিরিঙ্গিদের দরিয়ার ওপারে না-পাঠিয়ে আর ছাড়ছে না। ফিরিঙ্গিরাও বাঁচবে না, ও রাজা রাজবল্লভও বাঁচবে না, ওই ঘসেটি বেগমও বাঁচবে না। মির্জা সাহেবের একবার গোসা হলে তখন আর কারও পরোয়া করবে না
তা হলে আমার চাকরির কী হবে?
বশির মিঞা বললেআরে নোকরির কথা তুই পরে ভাবিস, আগে তুই বাঁচিস কি না তাই দ্যাখ। লড়াই হলে তোর কলকাতা থাকবে নাকি? তোর লাটসাহেব ওই ড্রেক সাহেবই বাঁচে কি না তাই আগে ভাব। একলকাতাও থাকবে না, এই ফিরিঙ্গিদের কেল্লাও থাকবে না, এই ফিরিঙ্গি বাচ্চারাই সব মরে মামদো ভূত হয়ে যাবে। তখন আমার কথা মনে রাখিস, তোকে আমি হুশিয়ার করে দিচ্ছি, বশির মিঞা কখনও ঝুট বলে না–
বশির মিঞা চলে যাবার পর কান্ত তাড়াতাড়ি গিয়ে নৌকোয় উঠল। বদর বদর।
*
যেমন দেশের ঊর্ধ্বে আর একটা দেশ আছে, তার নাম মহাদেশ, যেমন কালের ঊর্ধ্বে আর একটা কাল আছে তার নাম মহাকাল, তেমনই ইতিহাসের ঊর্ধ্বেও আর একটা ইতিহাস আছে তার নাম মানুষ। মানুষই ইতিহাস। এই মানুষই মহাদেশ সৃষ্টি করেছে, এই মানুষই মহাকাল সৃষ্টি করেছে, এই মানুষই ইতিহাসের সৃষ্টিকর্তা। পৃথিবীর ইতিহাস মানুষেরই ইতিহাস। এই মানুষই একদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হয়ে সাত সাগর তেরো নদী পেরিয়ে নোনা জলে হাবুডুবু খেতে খেতে ইন্ডিয়াতে এসে পৌঁছেছিল, আবার এই মানুষই একদিন আলিবর্দি খাঁ হয়ে তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। বলেছিল তোমরা থাকো এখানে, থেকে কারবার করো। আমাদের শুধু সামান্য কিছু কারবারের মুনাফার অংশ দিয়ো। আর হিন্দুরা মারাঠা দেশ থেকে এসে আমাদের বড় জ্বালাতন করছে, তাদের শায়েস্তা করতে তোমাদের মদত চাই। হিন্দুদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমার সারা জীবনটা কেটে গেছে। আমার টাকা ফুরিয়ে গিয়েছে। তোমরা টাকা দিয়ে বন্দুক দিয়ে কামান দিয়ে আমাকে সাহায্য করা, যাতে আমি আয়েশ করে মসনদে বসে রাজ্য শাসন করতে পারি। আমরা মোগল, আমরা সেই বারোশো বছর আগে আরব দেশ থেকে বেরিয়েছিলাম জেহাদ করতে, হজরত মহম্মদের বাণী প্রচার করতে। সারা পৃথিবী আমরা কবুল করেছি। শেষকালে এখানে এসে এই মারাঠি ডাকাতদের হাতে বুড়িগঙ্গায় ডুবে মরব নাকি! তোমাদের কাছে আমি মদত চেয়েছিলাম, তার বদলে তোমরা আমার লোকসান করেছ। আমার গদি কেড়ে নেবার মতলব করেছ। তোমরা বাগবাজারে পেরিং-পয়েন্টে কেল্লা বানিয়েছ, কেশাল সাহেবের বাগানবাড়ির মধ্যে গড়বন্দি তৈরি করেছ। তাই আমরা তোমাদের ওয়াটস্ সাহেবকে, কলেট সাহেবকে, আর ব্যাটসন সাহেবকে ধরে গারদে পুরেছি। তাই আমরা তাদের দিয়ে মুচলেকা লিখিয়ে নিয়েছি–মুচলেকায় লেখা আছে–প্রজাগণের মধ্যে কেহ রাজদণ্ড হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য কলিকাতায় পলায়ন করিলে, আদেশ দেওয়ামাত্র তাহাদিগকে নবাবের হস্তে সমর্পণ করিতে হইবে। গত কয়েক বৎসরের বাণিজ্যের দস্তকের হিসাব দিতে হইবে এবং ওই সকলের অপব্যবহারজনিত রাজকোষের যে-পরিমাণ ক্ষতি হইয়াছে তাহার ক্ষতিপূরণ করিতে হইবে। পেরিং-পয়েন্টে যে-কেল্লা নির্মিত হইয়াছে তাহা ভাঙিয়া ফেলিতে হইবে এবং কলিকাতার হলওয়েল সাহেবের ক্ষমতা বিশেষ সংকুচিত করিতে হইবে। ইতি, বিনীত বশংবদ ওয়াটস, কালেট ও ব্যাটসন।
