একমনে মরালী তার কথা বলে যেতে লাগল। হঠাৎ এক নিমেষের মধ্যে যেন আবার সে সেই হাতিয়াগড়ে গিয়ে পৌঁছেছে।
কথা শুনতে শুনতে দুর্গা বললে–অত কাছে সরে আসিসনে বাছা, ছুঁয়ে দিবি শেষকালে।
মরালী বললে–কিন্তু দুগ্যাদি, এতদিন তো তুমি ক্লাইভ সাহেবের ছোঁয়া খেয়েছ?
কে বললে–সাহেবের ছোঁয়া খেয়েছি? আমাদের রান্না তো সব হরিচরণ করত। তাকে তো মেরে ফেলেছে ওরা। সে থাকলে কি আর তোকে চিঠি লিখতুম? কী গো ছোট বউরানি, তুমি বলো না হরিচরণ থাকলে কি অমন করে মরি-কে চিঠি লিখতুম?
ছোট বউরানি বললে–তুই থাম তো দুগ্যা, বকবক করিসনি, আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমোই
মরালী বললে–তুমি ঘুমোও দুগ্যাদি, আমি আর তোমাকে বিরক্ত করব না। তুমি সেই আমার বিয়ের দিন যে উপকার করেছ তা আমি জীবনে ভুলব না
দুর্গার মনে পড়ে গেল। বললে–হ্যাঁরে, সে ভাতার তোর আর খোঁজ করেনি?
মরালী বললে–খোঁজ করেছিল দুগ্যাদি, পালকি করে মুর্শিদাবাদ যাবার সময় একটা সরাইয়ের সামনে তার গান শুনেছিলাম। খুবই খেদের গান আমি রব না ভব-ভবনে
তা তুই কী বললি?
আমি আর কী বলব দুগ্যাদি! তখন যদি কথা বললে–ধরা পড়ে যাই, তাই আর কিছু বলিনি।
বলিসনি, বেশ করেছিস-ও একটা বাউন্ডুলে মানুষ, তুই ওর সঙ্গে ঘর করতে পারবি কেন? তা হারে, নবাবের হারেমের ভেতরটা কেমন রে? খুব কষ্ট? না খুব আরাম? শুনছি নাকি বেগমরা সব গোলাপজল দিয়ে চান করে, সোনার থালায় ভাত খায়? বাঁদিরা খাইয়ে দেয়, কাপড় পরিয়ে দেয়, ঘুম পাড়িয়ে দেয় গান গেয়ে গেয়ে? সত্যি?
মরালী বললে–না দুগ্যাদি, সব মিথ্যে কথা, সবাই কাঁদে, কাঁদে আর কষ্ট ভোলবার জন্যে আরক খায়
আরক খায়? আরক কী রে? সে খেলে কী হয়?
মরালী বললে–সে একরকম বিষ দুগ্যাদি।
বিষ?
হ্যাঁ দুগ্যাদি, সেঁকো বিষ। সেই বিষ বাজার থেকে কিনে এনে নবাবের বেগমরা সব খায়।
কেন, বিষ কিনে খায় কেন? মরতে?
মরালী বললে–না দুগ্যাদি, সে বিষ খেলে মানুষ সব ভুলে যায়। দুঃখু ভুলে যায়, সুখ ভুলে যায়, আত্মীয়-স্বজন বাপ-মা সকলের কথা ভুলে যায়। সে খেলে মনে হয় যেন কোনও কষ্ট নেই আমার। গায়ে লোহা পুড়িয়ে ছ্যাকা দিলেও ব্যথা লাগে না, আর সারা অঙ্গ যখন জ্বলে যায় তখন সেই আরকের নেশায় বেগমরা খিলখিল করে হাসে!
ওমা, বলছিস কী তুই? তুই তাই খেতিস?
মরালী বললে–তা খেলেও যদি ছোট বউরানির কিছু উপকার হত তত তা-ও খেতাম দুগ্যাদি বিশ্বাস করো দুগ্যাদি, আমি তোমাদের জন্যে সব করতে পারতুম! কিন্তু তার দরকার হয়নি। তোমাদের যে আমি শেষপর্যন্ত ডাকাতের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছি তাই-ই আমার যথেষ্ট
দুর্গা বললে–এ কমাস যে কী কষ্টে আছি তা তোকে কী বলব মরি
তা এখন তো তুমি মুক্তি পেলে দুগ্যাদি, এখন আর তোমার ভয় নেই!
দুর্গা বললে–ছোটমশাইয়ের পায়ের কাছে যেদিন এই ছোট বউরানিকে তুলে দিতে পারব সেইদিন বুঝব আমার মুক্তি হয়েছে। তার আগে নয়। কী কুক্ষণেই যে কার মুখ দেখে বেরিয়েছিলাম হাতিয়াগড় থেকে!
মরালী বললে–তা হাতিয়াগড় থেকে তোমরা বেরোতে গেলে কেন দুগ্যাদি? আমিই তো ছোট বউরানি সেজে চেহেল্-সুতুনে গিয়ে উঠেছিলাম। ছোট বউরানিকে তুমি আড়াল করে রাখতে পারোনি? যাতে কেউ জানতে না পারে?
দুর্গা বললে–সব কপাল রে মরি, সবই কপাল!
তা যা বলেছ দুগ্যাদি! আমি চেহেল্-সুতুনে গিয়ে ভেবেছিলাম ছোট বউরানির বুঝি খুব উপকার করলাম! কিন্তু এমন করে যে তোমাদের ভুগতে হবে তা কি জানতাম।
তারপর বাইরের দিকে চেয়ে ডাকলে–কান্ত!
কান্ত বাইরে গিয়েছিল, ভেতরে এল। মরালী বললে–মাঝিদের বলে দাও ত্রিবেণীর ঘাটে যেন বজরা বাঁধে
কান্ত বাইরে চলে গেল।
দুর্গা জিজ্ঞেস করলেও কে রে মরি? ছেলেটা কে? তোর চাকর বুঝি?
হ্যাঁ দুগ্যাদি, আমার চাকরই বটে!
চাকরই বটে মানে? তা হলে তোর চাকর নয় সত্যি সত্যি? তখন থেকে তো দেখছি তোর কথায় উঠছে বসছে, আমাদের হরিচরণও ঠিক অমনি ছিল–
মরালী বললে–নিজের বলতে তো আমার কেউ নেই দুগ্যাদি। তবু ওর মতো নিজের লোক আমার আর কেউ নেই আমার জন্যে ও প্রাণও দিতে পারে–
তা বেশ পেয়েছিস তো চাকরটাকে। কত করে মাইনে দিতে হয়?
মরালী বললে–সবাই কি মাইনে চায় দুগ্যাদি, না মাইনে নেয়! মাইনে না পেলেও ও কাজ করবে, ও এমন মানুষ। আর তা ছাড়া আমি খুশি হলেই ওর সব পাওয়া হয়–
দুর্গা বললে–তোর হেঁয়ালি কথা আমি বুঝতে পারছিনে বাপু, পষ্ট করে বল
মরালী বললে–তোমার বুঝেও দরকার নেই দুগ্যাদি, ও তুমি বুঝতেও পারবে না–তুমি বরং ঘুমোও, ক’দিন ধরে তোমার ঘুম হয়নি–আমি তোমায় ডেকে দেব’খন–
বলে দুর্গার বিছানাটা পেতে দিলে মরালী। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। দুর্গা ছোট বউরানির পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল। বাইরে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। মরালী বাইরে চোখ মেলে তাকাল। ছইয়ের বাইরে কান্ত তখন কঁকা আকাশের দিকে চেয়ে চুপ করে বসে ছিল।
মরালী ডাকলে–কান্ত, শোনো
কান্ত ছায়ার মতো কাছে এল। মরালী বললে–কী ভাবছ?
কান্ত বললে–কই, কিছু ভাবছি না তো!
ভাবছ, কেন আমি তোমায় ডেকে নিয়ে এলাম, কোথায় এদের নিয়ে যাচ্ছি। ভাবছ যদি তোমাকে নিয়ে এলুম তো তোমার সঙ্গে কথা বলছি না কেন! এইসব ভাবছ তো?
কান্ত বললে–না, আমি ওসব কিছুই ভাবছি না-
