তোমরা রাগ কোরো না, চেঁচিয়ো না, চেঁচালে জানাজানি হয়ে যাবে। তোমাদের চিঠি মরালী পেয়েছে, পেয়ে নিজে তোমাদের নিতে এসেছে, এই গঙ্গার ঘাটে বজরাতে রয়েছে–
তা ডাকো তাকে। সে আসছে না কেন?
কান্ত বলেছিল–মরালী এলে ধরা পড়তে পারে। মরালীই আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে।
তুমি কে?
কান্ত বললে–আমি কান্ত!
দুর্গা বললে–কান্ত বললেই হল? কান্ত কী? মরির সঙ্গে তোমার কীসের সম্পর্ক? সে তোমাকে পাঠিয়েছে কেন? তুমি কিনবাব-নিজামতে চাকরি করো? তোমাদের কাউকে আমার বিশ্বাস নেই। এই বেটা সাহেব, যে আমাদের আটকে রেখেছে এখানে, ভেবেছিলাম সে-মানুষটা বুঝি ভাল। এখন দেখছি সে-মানুষটাও হারামজাদা! আমরা বাপু যাকে-তাকে আর বিশ্বেস করছিনে। তুমি মুখপুড়িকে গিয়ে ডেকে নিয়ে এসো, সে এসে না ডাকলে আমরা যাচ্ছিনে
শেষপর্যন্ত সেই অন্ধকার রাত্রে মরালীকেই আসতে হয়েছিল। মরালীকে দুর্গা প্রথমটা যানয় তাই বলে গালাগালি দিতে আরম্ভ করেছিল–মুখপুড়ি, মড়াপুভুনি, তোর নরকেও ঠাই হবে না। তোকে মুর্দোফরাসেও ছোঁবে না হারামজাদি! যার খাস তারই সর্বনাশ করিস তুই, তোর এত বড় আস্পর্ধা?
সামনে পেয়ে দুর্গা হয়তো আরও অনেক গালাগালি দিয়ে মনের ঝাল মেটাত, কিন্তু তার আগেই মরালী একেবারে দুর্গার পা দুটো জড়িয়ে ধরেছে দোহাই তোমার দুগ্যাদি, এখন গালাগালি দেবার সময় নয়, পরে যত ইচ্ছে গালাগালি দিয়ো-।
বেরো, বেরো এখান থেকে, বেরো–আমাকে ছুঁসনে
বলে দুর্গা পা দিয়ে লাথি মেরে মরালীকে দূরে সরিয়ে দিলে। মরালী গিয়ে পড়ল ঘরের কোণের দিকে।
চেঁচামেচিতে ছোট বউরানির ঘুম ভেঙে গিয়েছে। ঘুম ভেঙে উঠেই কাণ্ড দেখে অবাক।
বললেও কে দুগ্যা? আমাদের মরালী?
বলে মরালীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্গাই বাধা দিলে। বললে–ছুঁয়ো না, ছোট বউরানি, মুখপুড়িকে ছুঁয়ো না, ও গোরু খেয়েছে, মোছলমান হয়েছে
পাশে দাঁড়িয়ে কান্তর কানে সব কথাগুলো যাচ্ছিল। তার ভীষণ রাগ হল। যাদের জন্যে মরালী এত করলে তারাই কিনা এমন করে তার হেনস্থা করছে!
কিন্তু ছোট বউরানি ততক্ষণে ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে। ছোট বউরানি বললে–তুই সর–তুই কেন ওকে বকছিস অত?
তারপর মরালীর কাছে গিয়ে বললে–আমাদের চিঠি পেয়েছিলি তুই?
মরালী তাড়াতাড়ি ঢিপ করে একটা প্রণাম করে বললে–আমি তোমাদের নিতেই তো এইছি ছোট বউরানি। সত্যি বলছি, তুমি বিশ্বাস করো, আমি গোরু খাইনি
দুর্গা বললে–গোরু খেলে তুই-ইনরকে যাবি, আমাদের কী!
ছোট বউরানি সে কথায় কান না দিয়ে বললে–আমাদের এক্ষুনি নিয়ে চলো ভাই, তুমি না এলে আমি গলায় দড়ি দিয়ে মরতুম–
কিন্তু তখন আর কথা কাটাকাটির সময় নেই। ওদিকে মনে হল কাদের যেন পায়ের শব্দ হল। যদি কেউ এসে পড়ে তো সকলেরই সর্বনাশ। দরজার তালা ভাঙার সময়েই যে কেউ টের পায়নি সেই-ই যথেষ্ট। তারপর আর দেরি করলেই হয়তো কারও ঘুম ভেঙে যাবে। যে যেমন অবস্থায় ছিল তেমনি
অবস্থায়ই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নৌকোয় উঠল।
নৌকোয় উঠেও যেন ভয় যাচ্ছিল না ছোট বউরানির। ভেতরে বিছানার ব্যবস্থা ছিল, খাবারদাবার ছিল। সব বন্দোবস্তই করে এসেছিল মরালী।
কিন্তু ছোট বউরানি খেতে চাইলে না। বললে–না রে, আমাকে খেতে বলিসনে। তুই যে আমাকে মনে রেখেছিস, মনে রেখে আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে এলি এই-ই আমার যথেষ্ট।
দুর্গাও মুখে কুটোটি পর্যন্ত দিলে না।
মরালী বললে–তুমি খাও ছোট বউরানি, ও খাবার আমি নিজে ছুঁইনি—
দুর্গা বললে–না বাছা, তুমি নিজে জাত দিয়েছ, আমাদের আর জাত নিয়ো না–এখনও দু’বেলা কাঁচাকাপড়ে সন্ধে আহ্নিক করি
কিন্তু জল? জলটুকুও খাবে না?
আমাদের এই গঙ্গার জলই যথেষ্ট বলে গঙ্গা থেকে আঁজলা ভরতি করে জল নিয়ে টোক টোক করে খেলে।
দুর্গা বললে–এ ক’দিন দিনে রাতে এক ফোঁটা ঘুমোতে পর্যন্ত পারিনি, একটু ঘুমোব—
বলে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল।
মরালী বললে–তোমরা কোথায় যাবে তাই আগে বলো দুগ্যাদি, তোমাদের আমি পৌঁছে দিই—
তা তুই কোথায় যাবি এখন?
যেদিকে তুমি বলবে সেই দিকেই তোমাদের নিয়ে যাব।
কিন্তু তুই নিজে? তুই নবাবের হারেমে ফিরে যাবি?
মরালী বললে–আমার কথা ছেড়ে দাও দুগ্যাদি! একদিন তোমাদের জন্যেই আমি নবাবের হারেমে গিয়েছিলাম, তোমাদের জন্যেই নিজের জাত খুইয়েছিলাম। আজকে যদি তোমাদের আবার কোথাও নিরাপদ জায়গায় পৌঁছিয়ে দিতে পারি তো আমার কাজ ফুরিয়ে যাবে, তারপরে আমি বাঁচি আর মরি তা নিয়ে ভাবনা করব না
তারপর হঠাৎ যেন একটা কথা মনে পড়ে গেল মরালীর।
বললে–আমার বাবা কেমন আছে দুগ্যাদি–? বাবা কি আমাকে একেবারে ভুলে গেছে?
দুর্গারও যেন এতক্ষণে মনে পড়ল। বললে–তবু যা হোক তোর বাপের কথা মনে আছে দেখছি
মনে থাকবে না দুগ্যাদি? বাবার কথা কি ভুলতে পারি? জাত দিয়েছি বলে কি বাপের কথাও ভুলে যাব? মেয়ে হয়ে কি বাপের কথা কেউ ভুলতে পারে?
তারপর বাবার কথার সঙ্গে যেন চোখের সামনে সব ভেসে উঠল। বললে–সেই ছাতিমতলার ঢিবিটা এখনও আছে দুগ্যাদি? আহা, সেই বাবুদের বাড়ির দেউড়ির সেই আতাগাছটা? আর আমার নয়ানপিসি? তার খবর কী দুগ্যাদি? নন্দরানিদিদি এখন কী করছে? আমার সেই বিয়ের বাসরে যার বরের মরার খবর এসেছিল? নন্দরানিদির মায়ের কান্নার কথা আমার এখনও মনে আছে, জানো দুগ্যাদি! আমি কিচ্ছু ভুলতে পারি না। তোমরা ভাববা আমি খুব আরামে আছি। কিন্তু কী আরামে যে আছি তা যদি তুমি দেখতে পেতে?
