ক্লাইভ প্রাণপণে চিৎকার করে উঠেছে–ব্যাটালিয়ন, ফায়ার
*
কেমন করে যে সেদিন কী হল তা আজও মনে আছে মরালীর। সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকান থেকে বেরিয়ে ছোটমশাই কী করবে বুঝতে পারেনি। সেই রাত্রেই মুর্শিদাবাদের চকবাজারের রাস্তা যেন অন্যদিনের চেয়ে বেশি থমথমে হয়ে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি জগৎশেঠজির বাড়িতে যেতেই জগৎশেঠজি বললেন–কী হল, কিছু টের পেলেন?
ছোটমশাই বললে–না, ওনামে ওখানে কেউ থাকে না, ওরা বললে। এখন কী করব আপনি বলুন!
জগৎশেঠজি অনেকক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন–তা হলে আমি যে-খবর শুনেছি সেইটেই ঠিক! হয়তো আপনার সহধর্মিণী ক্লাইভের হাতেই ধরা পড়েছে–
তা হলে আমি কি কলকাতায় যাব, আপনি বলছেন? ক্লাইভসাহেব আমাকে খুব ভাল করে চেনেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে গিয়ে আমি একবার তার সঙ্গে আমার সব কথা বলে এসেছি
জগৎশেঠজি বললেন–তা হলে তো ভালই হয়েছে। আপনি গেলেই সাহেব আপনার হাতেই আপনার সহধর্মিণীকে দিয়ে দেবেন। এ ভালই হয়েছে–আপনি এখনই চলে যান
এই রাত্রেই?
জগৎশেঠজি বললেন–হ্যাঁ, এই রাত্রেই। নইলে হয়তো আপনার দেরি হয়ে যাবে। আমি শুনলাম নবাব কাল সকালেই ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে–
আবার?
জগৎশেঠজি বললেন–হ্যাঁ আবার। নইলে ক্লাইভসাহেবই মুর্শিদাবাদে হামলা করতে আসত। এবার আর কলকাতায় যুদ্ধটা করতে দিতে চায় না ফিরিঙ্গিরা। সেবারে বড় লোকসান হয়েছিল ওদের
তা সেই কথার ওপর নির্ভর করে ছোটমশাই নৌকো চালিয়ে চলে এসেছিল কলকাতায়। নিশুতি রাত। ছোটমশাইয়ের মাঝিমাল্লাদেরও হয়েছে জ্বালা। এতদিন ধরে তারা বজরা চালাচ্ছে। পুরুষানুক্রমে হাতিয়াগড়ের এই মাঝিমাল্লার বংশধরেরা এই কাজই করে আসছে। কিন্তু এই কমাস ধরে যে ঝামেলা চলছে তার যেন আর শেষ নেই। একবার হাতিয়াগড়, একবার মুর্শিদাবাদ, একবার কৃষ্ণনগর, আর একবার কলকাতা। এই-ই করতে হচ্ছে কয়েকমাস ধরে। পরের দিন মাঝরাত্রে এসে ছোটমশাইয়ের নৌকো পৌঁছোল ত্রিবেণীর ঘাটে।
এই ঘাট দিয়েই একটু আগে দলে দলে কোম্পানির ফৌজ গেছে। তখনও মানুষের পায়ের চাপে ঘাটের পথ কাদায়কাদায় নোংরা হয়ে আছে।
ছোটমশাইয়ের নৌকোটা ঘাটে লাগতেই ছোটমশাই বললে–এখানেই রাখ বিন্দাবন, একটু ফরসা হোক তখন নামব
ঘাটের আর-একদিকে আর-একটা বজরার ভেতর তখন ফিসফিস করে যেন কাদের কথা হচ্ছে।
ওরা আবার কারা এল?
ছোট বউরানি আর দুর্গা তখন একপাশে চুপ করে শুয়ে ছিল। একদিন দুজনেরই ঘুম নেই খাওয়া নেই শান্তি নেই। এতদিন পরে যেন একটু নিশ্চিন্ত আশ্রয় পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু মরালী তখনও জেগে। দাড়ের শব্দ পেয়ে সে চমকে উঠেছিল। বললে–ওরা আবার কারা এল?
কান্ত বললে–অত জোরে কথা বোলো না তুমি, শুনতে পাবে ওরা—
মরালী বললে–তার চেয়ে বজরা ছেড়ে দিতে বলো—
কান্ত বললে–মনে হচ্ছে ব্যাপারীদের নৌকো-আমি দেখে আসছি
বলে কান্ত বাইরের দিকে মুখ বাড়িয়ে দেখলে।
বাইরে এসে অন্ধকারে ভাল দেখা যাবে না জেনেও কান্ত ভাল করে দেখবার চেষ্টা করলে। সময় খারাপ। এ-সময়ে সকলেরই সন্দেহ হয়। ভাগ্যিস পেরিন সাহেবের বাগান ছেড়ে ফিরিঙ্গিরা যুদ্ধ করতে গেছে, নইলে ছোট বউরানিকে কি আর বের করে নিয়ে আসা যেত।
একবার ইচ্ছে হল মাঝিদের সঙ্গে ভাব করে জেনে নেয় বজরার ভেতরে কে আছে, কিংবা কার বজরা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আবার ভয় হল। ব্যাপারটা যদি জানাজানি হয়ে যায়। যদি ক্লাইভ সাহেবের কানে কেউ খবরটা দিয়ে দেয়।
ভেতরে ঢুকতেই মরালী বললে–কী হল? কে?
কান্ত বললে–জিজ্ঞেস করতে ভয় করতে লাগল। ভেবেছিলাম ব্যাপারীদের নৌকো, তা নয়, এ একটা বজরা
কার বজরা?
তা জিজ্ঞেস করিনি।
মরালী একবার চেয়ে দেখলে কোণের দিকে দুর্গা আর ছোট বউরানি দু’জনেই ঘুমোচ্ছ।
কান্ত জিজ্ঞেস করলে–এখন ওদের নিয়ে কোথায় যাবে বলো তো? ওদের জন্যে দেখছি শেষকালে তুমি না ধরা পড়ে যাও–
কেন? আমাকে কে ধরবে?
কান্ত বললে–বাঃ, চেহেল্-সুতুনে যদি তোমার খোঁজ পড়ে? যদি নানিবেগমসাহেবা জানতে পারে তুমি পালিয়ে গেছ, যদি নবাবের কানে কেউ তুলে দেয় খবরটা? তখন?
মরালী হেসে বললে–আমার জন্যে আমি ভাবি না। আমাকে এখন খুন করে মেরে ফেললেও আমার কিছু বলবার নেই। ছোট বউরানির জন্যেই তো আমি এত কাণ্ড করতে গিয়েছিলুম। ছোট বউরানির জন্যেই তো আমি চেহেসতুনে এসেছিলুম ।
কান্ত বললে–তা তো জানি, কিন্তু তুমিই কি ফ্যালনা? তোমার নিজের সুখদুঃখ বলতে কিছু নেই? তুমি তোমার নিজের দিকটা একবারও ভাববে না?
মরালীবললে–ওসব কথা অনেক শুনেছি, আর শুনতে ভাল লাগে না। এখন ওদের নিয়ে কোথায় যাব তাই ভাবছি। এমন অঘোরে ঘুমোচ্ছ দু’জনে..
কান্ত বললে–ওদের ডাকো না, ওদের জিজ্ঞেস করো না, কোথায় ওরা যেতে চায়!
সত্যিই তখন ঘুমিয়ে পড়েছিল দুজনে। দুর্গার মতো দজ্জাল মেয়েমানুষও কদিনের মধ্যে কাবু হয়ে পড়েছিল। মরালী যদি আর একদিন দেরি করত তা হলে হয়তো গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হত তাদের। বড় ভয় পেয়ে গিয়েছিল হোট বউরানি। প্রথম যখন দুর্গা কান্তকে দেখলে তখন ভয়ে আঁতকে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু কান্ত বলেছিল–চুপ করো, চেঁচিয়ো না, আমি মরালীর কাছ থেকে আসছি
দুর্গা বলেছিল–কোথায় সে মুখপুড়ি?
