বললে–না হুজুর, আমরা তো কিছু জানি না
তা হলে মরিয়ম বেগম আর তার বাদি উড়ে গেল? ঘরে তালা বন্ধ ছিল, সে তালা কে ভাঙলে? কোথায় গেল তারা? কখন গেল?
সমস্ত বাগানটা নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল ল্যাসিংটনের চিৎকারে। কর্নেল সাহেবের কড়া হুকুম ছিল নজর রাখবার জন্যে। নিশ্চয় স্টাফের মধ্যে কেউ ঠকিয়েছে তাকে। নইলে কেমন করে তারা পালাবে? হঠাৎ পালালেই হল?
আমি এক্ষুনি যাচ্ছি কর্নেল ক্লাইভের কাছে, সকলের এগেনস্টে আমি রিপোর্ট করব। আই শ্যাল স্যাক ইউ অল–
কিন্তু সকলের চাকরি খতম করে দিলেই তো আর মরিয়ম বেগমসাহেবাকে পাওয়া যাবেনা। কোনও সমস্যার সমাধানও হবে না। একটা কিছু করতে হবে। ল্যাসিংটন সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে নিলে। কর্নেল সাহেবকে খবরটা অন্তত তাড়াতাড়ি দেওয়া উচিত।
তারপর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে একেবারে সোজা হাটা-পথে রওনা হয়ে গেল।
কর্নেল ক্লাইভের তখন মাথা ভারী হয়ে গেছে ভাবনায়। সেবারে ছিল কলকাতায় যুদ্ধ। কলকাতায় যুদ্ধ হলে অনেক লোকসান হবার ভয় থাকে। কিন্তু এবারকার যুদ্ধ কলকাতার বাইরে। কিন্তু বাইরেরই হোক আর ভেতরেরই হোক, যুদ্ধটা হল যুদ্ধ। যুদ্ধ মানেই জীবন, যুদ্ধ মানেই মৃত্যু। জীবন-মৃত্যু নিয়ে সারাজীবন তো যুদ্ধই করে এসেছে কর্নেল ক্লাইভ। এবার না হয় আর একবার। ঝড় আসে আসুক, বৃষ্টি আসে আসুক। মৃত্যু এলেই বা ক্ষতি কী? একদিন তো মৃত্যুই চেয়েছিল ক্লাইভ। মৃত্যুর জন্যে তৈরি হয়েই তো এই চাকরিতে ঢুকেছে। ছ’টাকা মাইনের রাইটার থেকে আজ এত উঁচুতে উঠেছে। খবর এসেছিল নবাব মনকরা থেকে আর্মি নিয়ে আরও এগিয়ে আসছে। দাদপুর ছাড়িয়ে একেবারে সামনাসামনি এসে গেছে।
ল্যাসিংটনের কথাটা শুনে প্রথমে চমকে উঠেছিল।
কী বললে?
ল্যাসিংটন বললে–দেখলাম তালাটা ভাঙা, আমি আউটহাউসের সবাইকে ডেকেছিলাম, তারাও কেউ কিছু জানে না
কিন্তু তা হলে মরিয়ম বেগম গেল কোথায়? কে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে? আমাদের স্টাফের কেউ ব্রাইব নেয়নি তো? আমি কিন্তু ফিরে গিয়ে সবাইকে স্যাক করব। যদি এরপর মরিয়ম বেগমকে না পাওয়া যায় তো তোমাকেও স্যাক করব ল্যাসিংটন। আই শ্যাল স্পেয়ার নো বডি।
ক্লাইভের এ-চেহারা কখনও আগে দেখেনি ল্যাসিংটন। ওয়ার-ফিল্ডের ক্লাইভ যেন আলাদা মানুষ। কথা বলতে বলতে চোখ দুটো এক জায়গায় স্থির থাকে না। কথা বলছে ল্যাসিংটনের সঙ্গে কিন্তু চোখ রয়েছে অনেক দিকে। ওদিকে হাজার হাজার ক্যাভালরি, তার ওপাশে ইনফ্যানট্রি। লক্কাবাগ পর্যন্ত ল্যাসিংটনকে টেনে নিয়ে এসেছে। সেখানে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে গেছে ক্লাইভের আর্মি।
হঠাৎ খবর এসে গেল, নবাব এসে পৌঁছেছে। ক্লাইভ যেন এক মুহূর্তের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেল সব। তখন আর কিছুই মনে নেই। ল্যাসিংটনের দিকে চেয়ে বললে–তুমি? তুমি এখানে কেন? কে তোমাকে আসতে বলেছে? হু টোলড ইউ টু কাম?
ল্যাসিংটন বুঝল ক্লাইভ সাহেবের তখন আর মাথার ঠিক নেই।
ও, বুঝতে পেরেছি, মরিয়ম বেগমের খবর নিয়ে এসেছ তুমি? কিন্তু কেমন করে পালাল সে? কে তাকে পালাতে হেলপ করলে?
রাত একটার সময় এই লক্কাবাগের এক লাখ আমবাগানের মধ্যে এসে পৌঁছেছিল ক্লাইভ। চারদিকে তখন শুধু জোনাকিপোকার ঝক। বর্ষাকালের রাত। পায়ের তলায় কাদা। কাদায় কাদায় প্যাঁচপেচে হয়ে গেছে জায়গাটা। একেবারে ফাঁকা জায়গা।
ক্লাইভ চিৎকার করে উঠল–ব্যাটালিয়ন, হল্ট।
সঙ্গে সঙ্গে থেমে গিয়েছিল আর্মি। কিন্তু সকলের কাছে গিয়ে গিয়ে ক্লাইভ দেখতে লাগল। কারও কোনও অসুবিধে হয়েছে কিনা। আর ইউ টায়ার্ড? আর ইউ হাংরি? তোমরা কি ক্লান্ত? তোমাদের কি ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু আজ তোমাদের ক্লান্ত হলেও তো চলবে না, আজ তোমাদের ঘুম পেলেও তো চলবে না। আমরা আজ একশো আট্টান্ন বছর ধরে ঘুমোইনি। সেই ১৫৯৯ সালে আমাদের কোম্পানির পত্তন হয়েছিল ইংলন্ডে, আর আজ ১৭৫৭ সাল। এই একশো আটান্ন বছর ধরে আমরা জেগে আছি। আমরা এই দিনটার জন্যে অপেক্ষা করে আছি। আর শুধু কি আমরা? আমাদের আগেও কত লোক এসেছে এখানে। তারাও ঘুমোয়নি, তারাও খায়নি, তারাও টায়ার্ড হয়নি।
ল্যাসিংটন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল।
হঠাৎ ক্লাইভ বললে–এসো, আমার সঙ্গে এসো
একটা উঁচু জায়গায় এসে দাঁড়াল ক্লাইভ। লক্কাবাগের চারদিকে উঁচু মাটির বাঁধ, পাশে শুধু একটা সরু খাল।
ক্লাইভ দূরের দিকে চেয়ে বললে–ওই দেখো
ল্যাসিংটনও দেখলে। ভোর তখন হয়েছে কি হয়নি। সার সার হাতি দাঁড়িয়ে আছে সামনে। তাদের পিঠের ওপর লাল পোশাক। তার পাশে ক্যাভালরি। সেপাইদের হাতের খাপ-খোলা শোর্ড আর হাজার হাজার নবাবি নিশান উড়ছে তাদের সকলের মাথার ওপর। অত বড় আর্মি, অত সোলজার, অত এলিফ্যান্ট, অত হর্স! ল্যাসিংটনের বুকটা দুরদুর করে উঠল। নবাবের আর্মির কাছে আমাদের আর্মি কতটুকু। এই তো আমাদের আটটা কামান শুধু, আর সোলজারই বা ক’জন।
ক্লাইভ তখনও সেইদিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ও-দিক থেকে একটা বিকট শব্দ কানে এল। আর সঙ্গে সঙ্গে কী ঘটল বোঝা গেল না, ল্যাসিংটন ছিটকে পড়ল নীচেয়।
