তারপর যখন কর্নেল মিরজাফরের দলিলে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সই জাল করতে বললে–তখন একবার একটু দ্বিধা করেছিল।
বলেছিল–সই করব?
হ্যাঁ করো
কিন্তু জাল সই করলে অন্যায় হবে না?
কর্নেল ক্লাইভ আর কিছু বলেনি তখন। অপেক্ষা করবার মতো সময়ও তখন তার আর নেই। শুধু চোখ দুটো দেখে ল্যাসিংটন বুঝেছিল, কর্নেল রেগে গেছে খুব। তাড়াতাড়ি কর্নেল সাহেবের কাছ থেকে কাগজখানা নিয়ে বিনা দ্বিধায় ওয়াটসনের নামটা সই করে দিয়েছিল সেদিন।
কর্নেল ক্লাইভ জিজ্ঞেস করেছিল–সই করে দিলে যে?
ল্যাসিংটন বলেছিল–আপনি রাগ করছেন, তাই
ক্লাইভ বলেছিল–রাগ করার কথা নয়। তুমি একদিন তোমার মাইনে বাড়ছে না বলে দুঃখ করেছিলে। কিন্তু কেন মাইনে বাড়ছেনা আজ তো বুঝতে পারলে? আজ তো বুঝতে পারলে ছটাকা মাইনেতে রাইটার-ক্লার্ক হয়ে ঢুকে কেমন করে আমি কর্নেল হলুম? একটা কথা তোমাকে বলে রাখি ল্যাসিংটন, ভবিষ্যৎ জীবনে তোমার কাজে লাগবে-ন্যায় কাকে বলে তা আমি জানি, অন্যায় কাকে বলে তাও আমি জানি। কিন্তু অন্যায়ের সঙ্গে যখন লড়াই করতে হবে, তখন ন্যায়-অন্যায়ের বাছবিচার যে করে তার অন্তত মিলিটারি লাইনে আসা উচিত নয়। এইটে মনে রাখলে একদিন তুমিও আমার। মতো কর্নেল হয়ে উঠবে
কথাটা অনেকবার ভেবেছে ল্যাসিংটন। লন্ডনের সাবাবের একটা ছেলে ক্লাইভের মতন একদিন পালিয়ে এসেছিল ইন্ডিয়ায়। প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল অ্যাডভেঞ্চার। তারপর এল আমবিশন। কিন্তু সকলের সব অ্যামবিশন কি পূর্ণ হয়?
আশ্চর্য! ছ’টাকা মাইনের সেই ল্যাসিংটন ক্লাইডের কাছে দীক্ষা পেয়ে হয়তো একদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কর্নেলই হয়ে উঠত। কিন্তু লক্কাবাগের যুদ্ধের সময় নবাবের ফৌজের হাতে আচমকা গুলি খেয়ে যে সে একদিন প্রমোশনের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে শুধু কোম্পানি নয়, কোম্পানির মালিকদেরও ছেড়ে যাবে তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
সেদিন ল্যাসিংটন জানতে পারেনি, কেউই জানতে পারেনি। কিন্তু ক্লাইভ সেদিন কেঁদেছিল। তা সে তো পরের কথা। তার আগে আরও অন্য ঘটনা আছে।
ল্যাসিংটন প্রথমটায় বুঝতে পারেনি। প্রথম দিন পেরিন সাহেবের বাগানে যখন ভেতরের ঘরে নবাবের এক বেগমসাহেবাকে রাখা হয়েছিল তখন নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে ল্যাসিংটন সচেন ছিল। ক্লাইভ সাহেবের হুকুম ছিল–যেন মরিয়ম বেগমসাহেবা ঘর থেকে বেরোতে না পারে। কড়া নজর রাখবে।
সেদিন ভেতর থেকে বাঁদিটা জানালা দিয়ে ডাকলে ওগো, শোনো বাছা, তোমরা কি আমাদের মেরে ফেলতে চাও নাকি? আমাদের খিদে পায় না?
ল্যাসিংটন কিছুই বুঝতে পারেনি তার কথা।
দুর্গা আবার বলেছিল তোমাদের সায়েব কোথায়? তোমাদের সায়েবকে ডেকে আনো আমার কাছে, তার মুখে আমি খ্যাংরা মারব যত বলছি আমরা মরিয়ম বেগম নই, তবু আমাদের কথা তোমরা শুনবে না গা?
ল্যাসিংটন মনে মনে শুধু বলেছিল–খুব হয়েছে, বেশ হয়েছে। তখন খাবার জন্যে অত সাধাসাধি, তখন খেলে না। আর এখন খেতে চাইলে কী হবে? যে-দিন তোমাদের নবাব আমাদের কলকাতার ফোর্ট পুড়িয়ে দিয়েছিল সেদিন তোমাদের খেয়াল ছিল না। মরিয়ম বেগমসাহেবার বাঁদিটা আরও যেন কী সব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছিল। ল্যাসিংটন সে-সব কথায় আর কান দেয়নি। এবার এমন এক জায়গায় চলে গিয়েছিল, যেখানে গেলে কারও চেঁচামেচি আর কানে যায় না। তারপর আর কী হয়েছে মনে নেই। কোম্পানির ফৌজ ফোর্ট ঝেটিয়ে চলে গেছে কর্নেলের সঙ্গে। কেউ কোথাও নেই। শুধু ল্যাসিংটন আর মরিয়ম বেগম আর বাঁদিটা।
রাত্রে অনেক বৃষ্টি হয়েছিল। জুন মাসের প্রথম বৃষ্টি। ঠান্ডার দেশের লোক, ইন্ডিয়ার গরমের পর প্রথম বৃষ্টি পেয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল নাক ডাকিয়ে। তারপর কোথায় লড়াই, কোথায় প্রমোশন, কোথায় ডিউটি, আর কোথায় মরিয়ম বেগম! ঘুমের সময়ে আর অন্য কিছু কি মনে থাকে। বাগানের পেছনের দিকে আউটহাউসে কর্নেলের সিভিল স্টাফ থাকত। কুক, সুইপার, হরকরা, এইসব। তারাও তখন অঘোর-অচৈতন্য অবস্থায় রয়েছে। কেমন যেন মনে হয়েছিল কী একটা শব্দ হল। ঝনঝনাত। তারপর সব চুপ। বোধহয় বাদুড়ের কিচকিচ, কিংবা আউটহাউসের কেউ দরজার হুড়কো খুলল। কিংবা হয়তো কিছুই নয়, মনের ভুল। মনের ভুলে কানের ভুলে ভুল শব্দ শুনছে। তারপর আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
তারপর যখন ভোরবেলা ঘুম ভেঙেছে তখন উঠে একবার ওদিকে গিয়েছিল।
প্রথমে মনে হয়েছিল বুঝি সবাই ঘুমোচ্ছে। কিন্তু কাছে যেতেই দেখলে জানালা-দরজা খোলা রয়েছে। এ কেমন হল! দরজায় তালা-চাবি দেওয়া ছিল, কোথায় গেল? তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেল। কেউ নেই। তারপরে পাশের ঘরে ঢুকল। সেখানেও কেউ নেই। তারপরে উঠোন, কেউ কোথাও নেই। কোথায় গেল মরিয়ম বেগম? কোথায় গেল মরিয়ম বেগমের সেই বাঁদিটা? ল্যাসিংটনের মাথা থেকে পা পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে উঠল। এখন কী হবে।
তারপর যখন খুঁজে খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না, তখন দৌড়ে আউটহাউসের দিকে গেল। বাবুর্চি, খানসামা, কুক, সুইপার অনেকেই চলে গেছে আর্মির সঙ্গে। দু-একজন রয়েছে শুধু। তাদেরই ডাকলে। তারা প্রাণভরে ঘুমোচ্ছিল। অনেক দিন পরে একটু ছুটি পেয়েছে। একটু হালকা হয়েছে।
ডাকাডাকিতে তারা উঠে পড়ল।
