হাত দিয়ে তাকে ডাকলে।
বললে–ওগো, কে তুমি? একবার এদিকে শোনো তো বাছা
লোকটা যেন ভয় পেয়ে চারদিকে চেয়ে দেখলে। লোকটা কে তার ঠিক নেই। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
*
ফিরিঙ্গি সেপাইরা তখন পাটুলিতে পৌঁছেছে। নবদ্বীপ থেকে ছ’ক্রোশ দূরে পাটুলি। সেখান থেকে কাটোয়া। কাটোয়ার উত্তরে অজয় নদের ওপারে সাঁকাইতে মস্ত বড় একটা কেল্লা। আগে থেকে সব ব্যবস্থা হয়েছিল। ইংরেজরা গোলাগুলি ছুড়লেই কেল্লার সৈন্যসামন্তরা পালিয়ে যাবে।
কিন্তু মেজর সাহেবকে এত সহজে কেল্লা দখল করতে হয়নি।
একবার মনে হল, কেল্লার ভেতর থেকে নবাবের সৈন্যরা গোলা ছোড়বার ব্যবস্থা করছে। সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ সেপাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। আর দেখা গেল, কেল্লার চালে তারা নিজেরাই আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তারপর দেখা গেল, সৈন্যসামন্তরা পেছনের দরজা দিয়ে পালাচ্ছে।
ক্লাইভ আর দেরি করলে না। সদলবলে ভেতরে ঢুকে পড়ে দেখলে, কেল্লার ভেতরের সবকিছু তারা ফেলে গেছে। জামাকাপড়, বালিশ-বিছানা আর চাল। এত চাল। হিসেব করে দেখলে, যত চাল আছে, তাতে দশ হাজার লোক এক বছর ধরে খেয়েও ফুরিয়ে উঠতে পারবে না।
ক্লাইভ সেখানেই থামতে বললে–সকলকে। প্রথমে মাঠে তাঁবু পড়েছিল। ঝমঝম করে বৃষ্টি আসতে সবাই কাটোয়ার বাড়িগুলো দখল করে রাত কাটাল।
পরদিন ভোরবেলা। তখনও ভাল করে ফরসা হয়নি। মিরজাফর সাহেবের চিঠি এসে পড়ল। তাতে মিরজাফরসাহেব লিখেছে–নবার মনকরায় এসে পৌঁছেছেন, ওইখানেই গড়খাত করে যুদ্ধের জন্যে অপেক্ষা করবেন। আপনারা ঘুরে এসে যেন হঠাৎ হামলা করেন
সঙ্গে সঙ্গে ক্লাইভ চিঠির উত্তরে লিখলেন–আমি সৈন্যসামন্ত নিয়ে পলাশি পর্যন্ত এগিয়ে যাচ্ছি, এরপর মিরজাফর সাহেব যদি দাদপুরে এসেও আমাদের সঙ্গে যোগ না দেন তো আমি সরাসরি নবাবের সঙ্গে সন্ধি করব–
চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়ে ক্লাইভ চুপ করে খানিকক্ষণ বসে রইলেন। হঠাৎ ল্যাসিংটন সামনে এসে দাঁড়াল। অবাক হয়ে গেছে ক্লাইভ ল্যাসিংটনকে দেখে। পেরিন সাহেবের ছাউনি ছেড়ে হঠাৎ এসেছে কেন? জিজ্ঞেস করলে কী হল, মরিয়ম বেগমদের কোথায় রেখে এলে? কার কাছে?
ল্যাসিংটন তখনও হাঁফাচ্ছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোড়া থেকেই সে আছে বেঙ্গলে। একদিন অনেক কষ্ট করেছে। যখন কোম্পানির ফৌজ কলকাতা থেকে পালিয়ে ফলতায় গিয়ে নোঙর করেছিল, তখন অনেকদিন আধপেটা খেয়ে নবাবের বিরুদ্ধে যুঝেছে। ফ্লেচারের সঙ্গেই এসেছিল সে ইন্ডিয়ায়। কিন্তু তারপর কত লোক এল-গেল তবু এখনও তার প্রমোশন হয়নি।
একবার কর্নেল ক্লাইভকে নিজের দুঃখের কথা বলেছিল ল্যাসিংটন।
সব শুনে ক্লাইভ বলেছিল–তুমি আমার সঙ্গে থাকো, আমি তোমাকে হেলপ করব—
ইংলন্ডের মায়ে-তাড়ানো বাপে-খেদানো ছেলে সবাই। যার কোথাও কেউ নেই তখন তারাই ইন্ডিয়ায় এসেছিল ভাগ্য ফেরাতে। কিন্তু এখানে এসেও যাদের ভাগ্য ফেরেনি, ল্যাসিংটন তাদেরই একজন। দরকার হলে স্পাইয়ের কাজও করতে হত, মেসেঞ্জারের কাজও করতে হত। কোম্পানির জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবকিছুই করতে হত ল্যাসিংটনকে।
সেবার হঠাৎ মাসের পয়লা তারিখে ক্লাইভ ল্যাসিংটনের হাতে দুটো টাকা দিয়ে বলে–এটা নাও–
ল্যাসিংটন টাকা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। টাকা! কীসের টাকা?
এটা তোমাকে আমি নিজের পকেট থেকে দিলাম। ইউ টেক ইট। কোম্পানি যতদিন তোমার কিছু না করে ততদিন আমি মাসে মাসে এই টাকা দিয়ে যাব
ল্যাসিংটনের চোখে সেদিন কর্নেলের ব্যবহারে জল এসেছিল। টাকাটা নিতে গিয়েও সেদিন তার হাতটা পেছিয়ে এসেছিল।
নাও, নাও, আমি বলছি তুমি টাকাটা নাও। আমিও একদিন তোমার মতোই কোম্পানির কাছে মাইনে বাড়াবার দরবার করেছি, কেউ আমার কথায় কান দেয়নি। শেষকালে সকলের সঙ্গে ঝগড়া করে মারামারি করে আমি নিজের পাওনা আদায় করেছি
সেই থেকে বরাবর ল্যাসিংটন ক্লাইভের কাছ থেকে প্রত্যেক মাসের পয়লা তারিখে দুটো করে টাকা পেয়ে এসেছে। আর ক্লাইভ যখন যা বলেছে তখন তা-ই করেছে। কর্নেলের জন্য ল্যাসিংটন সবকিছুই করতে পারত।
ক্লাইভ বোঝাত–দেখো, আমাদের কোম্পানিও যা, এই ইন্ডিয়ার নবাব বাদশাও তাই। ঠিক নবাব-নিজামতেরও তোমার মতো হাজার হাজার ল্যাসিংটন আছে। আমি এতদিন ধরে তাদেরই খুঁজছি, যদি আজ নবাবকে লড়াইতে হারাতে পারি তো সেই সব ল্যাসিংটনদের সাহায্য নিয়ে হারাব নিজামতে তারা তাদের ন্যায্য পাওনা পায় না বলেই আজ তারা আমাদের সাহায্য করছে।
ল্যাসিংটন চুপ করে শুনত শুধু কর্নেলের কথাগুলো।
ক্লাইভ আরও বলত–শুধু উমিচাঁদ, শুধু মিরজাফর, শুধু জগৎশেঠদের দলে টানলেই যুদ্ধ জেতা যায় না। তাদের পেছনে ল্যাসিংটনরাও থাকা চাই তোমার মতো লোকের সাহায্য নিয়েই আমি ফোট সেন্ট ডেভিড জয় করেছিলুম। তোমরাই আসলে লাইক দিয়েছ, আর সমস্ত ক্রেডিট পেয়েছি আমি। আমি কর্নেল হয়েছি, আর তোমাদের মাইনে সেই এখনও ছটাকা রয়ে গিয়েছে। এই-ই হয়, সংসারের এই-ই নিয়ম। আগেও এই হয়েছে, এখনও হচ্ছে, পরেও এই-ই হবে। তবু দুঃখ কোরো না। যদি এই যুদ্ধে জিতি তো আমি তোমার জন্যে নিশ্চয় কিছু করব
ল্যাসিংটন হাসিমুখে শুধু কর্নেলের কথাগুলো শুনে গিয়েছিল, কিছু উত্তর দেয়নি।
