আস্তে আস্তে দরজাটা খুললে দুর্গা। দরজাটা খুলে বাইরের দিকে উঁকি মেরে দেখল। কোনও কিছু দেখা যায় না। এ-দরজাটা কি বন্ধ করতে ভুলে গেছে বেটারা! সামনের উঠোনের দিকে একেবারে শেকল দিয়ে গেছে। এ-দিকটা আর দেখেনি। হরিচরণ বহুদিন ছিল তাদের সঙ্গে। হরিচরণ জানত সব। এ-বেটা নতুন। জানে না যে, এ-দিকটাতেও একটা দরজা আছে।
দরজাটা খোলবার সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার দিক থেকে হুহু করে হাওয়া এসে ঢুকল ঘরের মধ্যে। বৃষ্টি তখন থেমে গেছে। কেমন সোঁদা সেঁদা গন্ধ। হাতিয়াগড়ে প্রথম বৃষ্টি নামলে মাটি থেকে এইরকম গন্ধ বেরোত।
দুর্গা আবার বাইরের দিকে চেয়ে দেখলে। এখন যদি এখান থেকে ছোট বউরানিকে নিয়ে পালিয়ে। যায় তো কে দেখতে পাবে? কিন্তু এখান থেকে পালিয়ে যাবে কোথায়? কেমন করে যাবে? রাস্তায় দু’জন । মেয়েমানুষ দেখলেই তো লোকে সন্দেহ করবে? কার মনে কী আছে, কে বলতে পারে? দিনকাল খারাপ। চারদিকে সেপাই-সান্ত্রি ঘোরাফেরা করছে। যদি আবার ধরে নিয়ে এসে গারদে পুরে দেয়।
হঠাৎ ঘুমের ঘোরে ছোট বউরানি যেন একবার একটা শব্দ করে উঠল!
দুর্গা তাড়াতাড়ি ছোট বউরানির কাছে এসে ডাকলে কী হল ছোট বউরানি, কী হল? স্বপ্ন। দেখছিলে নাকি?
ছোট বউরানি হয়তো স্বপ্নই দেখছিল। দুর্গার কথায় শুধু পাশ ফিরে শুয়ে আবার ঘুমোতে লাগল। সমস্ত নিস্তব্ধ। বৃষ্টি থেমে যাবার পর চারদিকে ঝিঁঝিপোকার শব্দটা আরও জোরে কানে আসছে। তার সঙ্গে আছে ব্যাঙের ডাক। হয়তো আবার বৃষ্টি আসবে। দুর্গা কী করবে, বুঝতে পারলে না।
বউঠান।
হঠাৎ একটা চাপা গলার আওয়াজ পেয়েই দুর্গা চমকে উঠেছে। পেছন ফিরে চাইতেই অবাক হয়ে গেল। দরজার বাইরে একটা বেটাছেলের মূর্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুর্গা চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু বেটাছেলেটার চোখের চাউনি দেখে থমকে দাঁড়াল।
আমাকে চিনতে পারবেন না আপনারা। আমি মরালীর কাছ থেকে এসেছি।
মরালী! নামটা শুনে একটু ভরসা হল দুর্গার। বললে–তুমি কে?
চুপি চুপি এসেছি আমি, আপনাদের বাঁচাবার জন্যে। বউঠানকে ডেকে তুলুন, এখান থেকে আপনাদের নিয়ে যাব
বেটাছেলেটার জামাকাপড় সমস্ত তখন জলে ভিজে জবজব করছে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত টপটপ করে জল পড়ছে। একটু থেমে বললে–সন্ধে থেকে এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছি, ভরসা পাচ্ছিলাম না ভেতরে আসতে
দুর্গা তখনও ভাল করে অবস্থাটা বুঝতে পারেনি। বলে কী লোকটা! আবার কোনও বিপদের মধ্যে পড়বে নাকি?
আমাদের খবর পেলেন কী করে?
কেন, আপনারা যে মরিয়ম বেগমের নামে চিঠি দিয়েছিলেন।
তা হলে মুখপুড়ি সে-চিঠি পেয়েছে?
সেই চিঠি পেয়েই তো আমাকে পাঠিয়ে দিলে এখানে।
তা সে মুখপুড়ি তোমার কে? তুমি কেন এলে? তুমি তার কে?
লোকটা বললে–কেউ না
কেউ না! শেষকালে তোমার কথায় বিশ্বাস করে যাই, আবার তখন কোন চুলোয় কার হাতে গিয়ে পড়ি আর কী!
লোকটা বললে–আমাকে আপনারা বিশ্বাস করতে পারেন, আমি আপনাদের কোনও ক্ষতি করব না–
কিন্তু তবু যেন দুর্গার বিশ্বাস হল না।
কী করে নিয়ে যাবে আমাদের? নৌকো আছে?
হ্যাঁ, সঙ্গে নৌকো রয়েছে গঙ্গায়
কোথায় নিয়ে যাবে?
যেখানে বলবেন। যদি হাতিয়াগড়ে যেতে চান, সেখানেও নিয়ে যেতে পারি, যদি কেষ্টনগরে যেতে চান, তাও নিয়ে যেতে পারি।
কী করবে দুর্গা কিছু বুঝতে পারলে না। তারপর বললে–একটু পঁড়াও, ছোট বউরানিকে ডাকি, ছোট বউরানি কী বলে দেখি
ছোট বউরানি তখনও ঘুমোচ্ছিল। এত যে কথা চলছে, তাতেও ঘুম ভাঙেনি ছোট বউরানির। অঘোরে ঘুমোচ্ছে একেবারে। দুর্গা গিয়ে ছোট বউরানির গা ঠেলে জাগাতে চেষ্টা করলে ও ছোট বউরানি, ছোট বউরানিওঠো, ওঠো, দেখো, সেই মুখপুড়ি লোক পাঠিয়েছে আমাদের নিয়ে যেতে ও ছোট বউরানি
ঠেলতে গিয়ে নিজেই যেন ঠেলা খেলে দুর্গা।
ও দুগ্যা, ওঠ ওঠ–
আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেছে দুর্গার। দুর্গা চোখ দুটো খুলে দেখলে, ছোট বউরানি। ছোট বউরানি দুর্গাকে ঠেলা দিচ্ছে। বলছে-কী রে, কী ঘুম তোর, দেখেছিস কত বেলা হয়ে গেছে!
ধড়মড় করে উঠে বসল দুর্গা। একেবারে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল দুজনে।
চারদিকে চেয়ে দেখলে বেশ ফরসা হয়ে গেছে বাগানের বাইরেটা। অল্প অল্প রোদ এসে গেছে ঘরের ভেতর। কোথায় সেই লোকটা, কোথায় কে, কারও দেখা নেই! যেমনভাবে ছোট বউরানি আর সে এই ঘরের মধ্যে ছিল, তেমনই সব রয়েছে। কেউই তো আসেনি মরালীর কাছ থেকে? কেউই তো তাদের পালিয়ে যাবার সাহায্য করবার জন্যে নৌকো নিয়ে হাজির হয়নি! ছোট বউরানি বললে–তুই বেশ নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিস তো আর আমার এদিকে ঘুম নেই–
দুর্গা বললে–সেকী, তুমি ঘুমোচ্ছ দেখেই তো আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম
আমি আবার কখন ঘুমোলাম রে? তুই বলছিস কী?
দুর্গা বললে–সত্যি বউরানি, আমি কি মিথ্যে কথা বলছি? তুমি ঘুমিয়েছ, আমি দেখেছি
তা ঘুমিয়েছি বেশ করেছি। কিন্তু আর যে থাকতে পারছিনে। একটা কিছু ব্যবস্থা কর তুই!
দুর্গা বললে–খাবার দিতে বলব এদের? খাবে তুমি এদের হাতে?
ছোট বউরানি বললে–তা খাব না কি উপোস করে মরব?
তা হলে ওদের ডাকি?
ছোট বউরানি বললে–ডাক
দুর্গা কিছু বুঝতে পারলে না। কী করবে, কাকে ডাকবে, কোথায় যাবে, তাও বুঝতে পারলে না। আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দেখলে দূরে যেন কে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। গোরা নয়, বাঙালি।
