বললে–কে?
এক-এক সময় এমন হয়। যখন মাথার ওপর বিপদ ঘনিয়ে আসে, পার পাবার আর কোনও রাস্তা থাকে না তখন। এক-এক সময় মনে হয়, কে যেন ডাকলে, কে যেন এল বাঁচাতে। বিশেষ করে সেই সেদিনকার জুন মাসের ঝড়বৃষ্টির রাত্রে।
শেষকালে বোধহয় ছোট বউরানির আর ধৈর্য থাকল না। বললে–তোর জন্যেই তো এইরকম হল, তুই যদি এখান থেকে না বেরোতিস তো এমন হয়?
দুর্গার আর কথা বলবার মুখ নেই তখন। শুধু বললে–আমি তো তোমার ভালর জন্যেই। গিয়েছিলাম ছোট বউরানি। কিন্তু কপালে গেরো থাকলে আমি কী করব?
তা তুই এত মন্তর জানিস আর একটা কিছু বিহিত করতে পারছিসনে? বাণ মারতে পারিসনে হারামজাদাদের? আমরা কী করেছি ওদের যে, আমাদের এমন করে হেনস্থা করবে?
কিন্তু কতক্ষণ ধরে আর এমনি করে ঝগড়া করা চলে? ঝগড়া করতে করতে ছোট বউরানিও কেমন একসময়ে নেতিয়ে পড়ে। বিছানাটার ওপর উপুড় হয়ে মুখ গুঁজে হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে। তারপর দুর্গার কোনও কথাই আর শুনতে চায় না। বলে–বেরো তুই, বেরো এখান থেকে, তোর কোনও কথা শুনতে চাইনে, তুই বেরো এখান থেকে যা চলে যা
দুর্গার যেন সত্যিই পরাজয় হয়ে গিয়েছে। বহুদিন আগে দুর্গা একদিন বিধবা হয়েছিল। সে তখন ছোট। এখন তার বিয়ের কথাও মনে নেই, তার স্বামীর কথাও মনে নেই। শুধু এইটুকু মনে আছে, বর এসেছিল, উলুর শব্দ হয়েছিল চারদিক থেকে। ওই পর্যন্তই। তারপর যখন থেকে জ্ঞান এসেছে, তখন থেকে বড় বউরানির সঙ্গেই আছে। প্রথমে বড় বউরানির বাপের বাড়িতে। এমন কিছু বড় সংসার নয় সে বাড়ি। কিন্তু যেদিন বড় বউরানির বিয়ে হল হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের সঙ্গে, সেইদিন থেকেই তার কপালটা খুলে গেল। হাতিয়াগড়ে আসার পর থেকেই দুর্গার ক্ষমতা বেড়েছিল, প্রতিপত্তি বেড়েছিল, তেজও বেড়েছিল। লোকের বিপদ আপদে মন্তর পড়ে, টোটকা ওষুধবিষুধ দিয়ে হাতিয়াগড়ের মেয়েমহলে বেশ নামডাক করে ফেলেছিল। কবে একদিন ছোটবেলায় দু-একটা তুকতাক শিখেছিল এক বুড়ির কাছে, তাই ভাঙিয়েই চলছিল। বুড়ি বলে দিয়েছিল–লোকের ভাল করবি, লোকের ভাল দেখবি, তা হলে তোরও ভাল হবে
তাই এতদিন দুর্গা ভালই করে এসেছে সকলের। কিন্তু যেদিন থেকে মরিমুখপুড়িকে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল হাতিয়াগড়ের রাজবাড়িতে, যে-দিন থেকে মরালীকে মুর্শিদাবাদের চেহেল্-সুতুনে পাঠিয়ে দিয়েছে, সেইদিন থেকেই আর তুকতাক কিছুই ফলছে না। কোনও মন্তরতন্তরই আর কাজ করছে না। দুর্গা যেন তাই কেমন অসহায় হয়ে গিয়েছে আজকাল।
ছোট বউরানি যখন রেগে যায়, তখন বলে–তোর কথা আমি আর শুনছিনে, তোর কথা শুনেই আমার এই কাল হল
দুর্গার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। বলে–তুমি তোমার কথাটাই ভাবছ ছোট বউরানি, আর আমার বুঝি কিছু কষ্ট হচ্ছে না?
ছোট বউরানি বলে–তা তোর সেই মরটন্তর কোথায় গেল? তুই বাণ মারতে পারছিস না। হারামজাদাদের?
দুর্গা বলে বাণ আর খাটবে না ছোট বউরানি, আমার মন্তর আর খাটবে না—
কেন, খাটবে না কেন? কী হল মন্তরের?
দুর্গা বললে–আমি বাণ মেরেছিলুম ছোট বউরানি, কিন্তু খাটল না। আমার দাইবুড়ি, যে আমাকে
মন্তরটন্তর শিখিয়েছিল, সে বলেছিল, কারও যেন ক্ষেতি করিসনে দুগ্যা, এ-মন্তর তা হলে আর ফলবেনা
তা কার ক্ষেতি করেছিস তুই?
ওমা, কী বলছ ছোট বউরানি, ক্ষেতি করিনি! মরি-মুখপুড়ির ক্ষেতি করিনি? তাকে মোছলমানের হারেমে পাঠিয়েছি, সে কি তার কম ক্ষেতি ভেবেছ ছোট বউরানি? আমাদের কি ভাল হবে বলতে চাও তাতে? তুমি আজ এইটুকুতেই ছটফট করছ, আমাকে গালাগাল দিচ্ছ, আমাকে দুর দুর করছ, কিন্তু তার কথা তো ভাবছ না? সেই মুখপুড়ির কষ্টটার কথা তো ভাবছ না তুমি একবারও ছোট বউরানি?
ছোট বউরানি রেগে গেল। বললে–তার কথা ভাবতে যাব কেন শুনি? মুেখপুড়ি কি আমাদের কথা ভাবছে? এই যে তাকে তুই চিঠি দিলি, সে-চিঠির কি কোনও জবাব দিলে সে মুখপুড়ি?
দুর্গা বলে–ছি, তাকে তুমি অত গালাগাল দিয়ো না ছোট বউরানি, সে বেচারা হয়তো এখন চেহেল্-সুতুনে বসে কাঁদছে
এমনি করেই সমস্ত রাতটা কেটে গেল। প্রথমে বৃষ্টিটা একটু আস্তে আস্তে পড়ছিল। তারপর জোরে জোরে নামল। তারপর আরও জোরে। এতদিন গরমে মাটি ফুটিফাটা হয়ে ছিল। এইই প্রথম বৃষ্টি। বৃষ্টির তোড়ে যেন সব ঠান্ডা হয়ে এল আবার। ঠান্ডা হয়ে গেল ঘরটা। হোট বউরানি সেই অবস্থাতেই কখন ঘুমিয়ে পড়ল একবার। দুর্গা পাশে বসে ছিল। আস্তে আস্তে আর একখানা শাড়ি নিয়ে হোট বউরানির গায়ের ওপর চাপা দিলে। বড় মশা হয়েছে।
তারপর সব ঠান্ডা। বাগানের গাছে বুঝি কয়েকটা বাদুড় উড়ছিল। তাদের পাখা ঝাপটানির শব্দ কানে এল। দুর্গা আর বসে থাকতে পারলে না। ছোট বউরানির পায়ের কাছে গুটি মেরে শুয়ে পড়ল। আর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে সেইভাবে, তার খেয়ালও ছিল না।
যখন ঘুম ভাঙল, তখন অল্প অল্প ভোর। বাইরে অন্ধকার বটে, কিন্তু ভাল করে তাকালে বোঝা যায়, কেমন যেন নীল-নীল আবহাওয়া। একটু নীলচে হয়ে এসেছে অন্ধকারটা, একটু পাতলা-পাতলা অন্ধকার। তখনও ছোট বউরানি ঘুমোচ্ছে। দুর্গা একবার সেই দিকে চেয়ে দেখলে। ছোট বউরানির ঠোঁট দুটো যেন একটু নড়ছে। বোধহয় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নের মধ্যে ছোটমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলছে।
