ল্যাসিংটন! ল্যাসিংটনকে দিয়ে আমি সই করিয়ে নেব!
আর শেষপর্যন্ত সত্যিই তাই হল। সিলেক্ট কমিটির মেম্বাররা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন। যেমন করে হোক কাজ উদ্ধার হলেই হল। আমরা লড়াইতে জিততে চাই। আমরা ধর্মপ্রচার করতে আসিনি, আমরা এসেছি ইন্ডিয়ার সিংহাসন দখল করতে, আমাদের আবার অত সততা সত্যবাদিতার কী দরকার?
বৃষ্টি তখন আরও বেড়েছে। সেই রাত্রেই ক্লাইভ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল।
উমিচাঁদের তখনও ঘুম আসছে না। হাঁ করে বাইরের দিকে কান পেতে আছে। একবার মনে হয় যেন কার ঘোড়র পায়ের আওয়াজ হল। আবার মনে হয়, না–কেউ নয়।
ক্লাইভ যখন এসে পৌঁছোল তখন মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে গেছে। সমস্ত গা দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে।
বড় হাসি বেরোল উমিচাঁদের মুখ দিয়ে।
বললে–আমি ভাবছিলাম সাহেব, তুমি বোধহয় আর এলে না—
ক্লাইভ বললে–সেকী? আমি কথা দিয়েছিলাম তোমাকে
না, খুব জোরে বৃষ্টি এল কিনা। তোমার সমস্ত শরীর ভিজে গেছে–একটু ড্রিঙ্ক করবে?
ক্লাইভ নিজের জামার পকেটের ভেতর থেকে লাল কাগজে লেখা দলিলটা বার করলে।
লাল কাগজ কেন?
আর কোনও কাগজ ছিল না দফতরে। সিলেক্ট কমিটির মেম্বাররাও প্রায় সবাই চলে যাচ্ছিল। লাস্ট মোমেন্টে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। আর একটু দেরি হলে আর কাউকেই পেতাম না।
উমিচাঁদের সামনে কাগজটা বার করে ভাজ খুলে চিত করে রাখলে।
সবাই সই করেছে দেখছি।
ক্লাইভ বললে–হ্যাঁ, ভাল করে দেখে নাও, সকলের সই রয়েছে। এই দেখো সকলের মাথায় আমার সই, তারপর ড্রেকের, তারপর ওয়াট, তারপর এইটে মেজর কিলপ্যাট্রিক, এরপর বিচার। আর এই সকলের শেষে ওয়াটসন
আরও খুশি হল উমিচাঁদ। মুখটা হাসিতে ভরে উঠল। কুড়ি লাখ টাকা! কোনও পরিশ্রম নয়, কোনও মাথা ঘামাননা নয়, কোনও মূলধন খাটানো নয়। শুধু একটু কূট বুদ্ধি৷ সেই কূট বুদ্ধির চালের সঙ্গে কুড়ি লাখ টাকা এসে গেল।
এবারে সই করো!
উমিচাঁদ সাহেব মাথার ওপর দেয়ালে টাঙানো গুরু নানকের ছবিটার উদ্দেশে নমস্কার করে নীচেয় সই করে দিলে।
ঠিক আছে?
ক্লাইভ বললো, হ্যাঁ ঠিক আছে
তারপর কাগজটা নিয়ে পকেটে রাখতে রাখতে বললে–তা হলে আমি আসি?
একটু ড্রিঙ্ক করবে না?
ক্লাইভ বললে–এখন আর ড্রিঙ্ক করবার সময় নেই। ওদিক থেকে মিরজাফর সাহেবের চিঠি পেয়েছি। লিখেছে, নবাব তাকে আর্মি দিয়ে কলকাতার দিকে পাঠিয়েছে। এদিকে, আমাদের আমিও কাল বিকেলবেলা চলে গিয়েছে–এতক্ষণ বোধহয় তারা কালনায় পৌঁছে গিয়েছে
তারপর আর দাঁড়াল না ক্লাইভ। এবার আর দাঁড়ানো চলেও না। কত বছর আগে থেকে ক্লাইভ যেন এই দিনটারই প্রতীক্ষা করছিল। মিরজাফর আসবে! মিরজাফর আসবে! মিরজাফর নিশ্চয়ই আসবে!
পেছন থেকে উমিচাঁদ একবার ডাকলে বৃষ্টি থামলে তারপর যেয়ো সাহেব—
কিন্তু সাহেব তখন খোলা আকাশের ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যেই ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে
উমিচাঁদ দরজাটা বন্ধ করে দিলে। অনেক দিন পরে আজ আবার ভাল করে ঘুম হবে! কুড়ি লাখ। কুড়ি লাখ টাকা। উমিচাঁদ সাহেব কোটি কোটি টাকার মালিক। কিন্তু তার সঙ্গে আরও কুড়ি লাখ টাকা যোগ হয়ে গেল। কোম্পানির এক কোটি টাকা। ফিরিঙ্গিদের পঞ্চাশ লাখ টাকা। আর তার বেলাতেই যত আপত্তি। তিরিশ লাখ থেকে কমিয়ে কুড়ি লাখ হল। তা হোক, কুড়ি লাখই বা কে দেয়?
উমিচাঁদ গুরু নানকের ছবির নীচেয় দাঁড়িয়ে আর একবার প্রণাম করলে। চোখ বুজে অনেকক্ষণ ধরে প্রণাম করলে। কিন্তু সেদিন চোখ খোলা থাকলে উমিচাঁদ দেখতে পেত, গুরু নানক ভক্তের ভক্তিতে নিঃশব্দে শুধু হেসে উঠলেন একবার।
আর কুড়ি লাখ টাকাতে সেদিন ইন্ডিয়া দুশো বছরের মতো বিক্রি হয়ে গেল।
*
পেরিন সাহেবের বাগানের ভেতরে দুর্গা, ছোট বউরানি দু’জনেই চুপ করে বসে আছে। বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। এই এখানেই কতদিন দুজনে বাস করে গেছে। প্রায় ঘরবাড়ি হয়ে গিয়েছিল তাদের। এইখানেই হরিচরণ তাদের দেখাশোনা করত। এই এখান থেকেই সাহেবের ওপর রাগ করে তারা চলে গিয়েছিল। কিন্তু কী যে কপালে ছিল। কোথা থেকে কী হয়ে গেল। গোরা সেপাইরা এসে তাদের নৌকোর ভেতর ঢুকে সব ওলোটপালোট করে দিয়ে গেল।
দুর্গা বলেছিল–তা তুমি কেন তোমার নাম বলতে গেলে ছোট বউরানি?
ছোট বউরানি বললে–আমি আবার কখন আমার নাম বলতে গেলাম–ওরাই তো বললে–আমি মরিয়ম বেগম–
সন্ধে থেকে খাওয়াদাওয়া হয়নি।
দুর্গা বললে–সে মুখপুড়িরই বা আক্কেলখানা কেমন, একখানা চিঠি পাঠালাম, তার জবাব পর্যন্ত পাঠাবার ব্যবস্থা করলে না। নবাবের হারেমে ঢুকে সাপের পাঁচ-পা দেখেছে খুঁড়ি!
তা সে চিঠি পেলে কিনা তারই তো ঠিক নেই! তুমি কার হাতে দিলে চিঠি, সে কি আর তার হাতে পৌঁছেছে! যার-তার চিঠি কি আর হারেমের ভেতরে পৌঁছোয় রে!
সন্ধে থেকে একজন কেবল খাওয়াবার জন্যে পীড়াপীড়ি করছিল। তখন খাবে না বলে তেজ দেখিয়েছিল। এখন খিদের চোটে পেট চোঁচো করছে। আর সাড়াশব্দ নেই কোথাও। বাইরে থেকে দরজায় শিকল তুলে দিয়ে চলে গেছে। সেই মুখপোড়া সাহেবই বা গেল কোথায়?
তারপর সেই যে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে, তার আর থামবার নাম নেই।
হঠাৎ বাইরে যেন কার দরজার কড়া নাড়বার শব্দ হল। ছোট বউরানি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দুর্গার গা ঘেঁষে বসল। কিন্তু দুর্গার সাহস আছে খুব।
