হ্যাঁ, সত্যি, সেদিন তুফানই উঠেছিল সেই নৌকোর ভেতরের নিস্তব্ধ নিরিবিলিতে। কান্তর জীবনের তুফান, মরালীর জীবনেরও তুফান। কিন্তু সেকথা এখন থাক।
.
সিলেক্ট কমিটির মিটিং থেকেই ক্লাইভ সাহেব সোজা চলে গিয়েছিল উমিচাঁদ সাহেবের বাড়িতে। যে ষড়যন্ত্র একদিন শুরু হয়েছিল মহতাপচাঁদ জগৎশেঠের হাবেলিতে, সেই ষড়যন্ত্রই গড়িয়ে গড়িয়ে এসে পৌঁছেছিল কলকাতার সিলেক্ট কমিটির মিটিংয়ে। এমন মিটিং আগেও হয়েছে। সমস্তই ঠিক ঠিক বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছিল। কাকে কত দিতে হবে, বখরা ভাগাভাগির কথাবার্তা সবই পাকা হয়ে। গিয়েছিল। এতদিন পরে যখন সোলজার আর্মি আর্মস-অ্যামিউনিশন পাঠানো হয়ে গিয়েছে, তখন, আবার নতুন করে কীসের কনট্র্যাক্ট?
ক্লাইভ সাহেব বললে–উমিচাঁদসাহেব আমাদের মুখের কথায় বিশ্বাস করতে চায় না
কেন? আমরা ফরেনার বলে কি ভদ্রলোক নই? আমাদের কথার কোনও দাম নেই?
ক্লাইভ বললে–এখন আর সেকথা বলে লাভ নেই। উমিচাঁদ বিজনেসম্যান, মুখের কথা বিশ্বাস করতে চাইছে না। তা ছাড়া…
ওয়াটসন বললে–তা ছাড়া?
তা ছাড়া আমি সব দিক ভেবে আর উমিচাঁদকে চটাতে চাইলুম না। ওয়ারের সময় সকলের সঙ্গে ফ্রেন্ডলি রিলেশন রাখাই ভাল। কারণ এখন যদি নবাবকে গিয়ে মিরজাফরের কথা বলে দেয় তো সর্বনাশ। মিরজাফরসাহেবই তো আমাদের একমাত্র অ্যাসেট, সে-ই তো আমাদের একমাত্র মূলধন! উমিচাঁদের কথায় যদি নবাব মিরজাফরকে অ্যারেস্ট করে নেয়, তখন?
সেদিন সন্ধে থেকেই আকাশে মেঘ করে ছিল। সিলেক্ট কমিটির মিটিংয়ের সময় সেই বৃষ্টি ঝমঝম করে শুরু হয়ে গেল।
তারপর রাত আরও অনেক গম্ভীর হল।
প্রত্যেকটা আইটেম পড়ে পড়ে শোনানো হল সকলকে। ক্লাইভের নিজের হাতের তৈরি। ভাগ বখরার বিশদ হিসেব। কে কত পাবে, কার ভাগে কত পড়বে। ইন্ডিয়ার নবাবের সিন্দুক যখন হাতের মুঠোয় আসবে, তখন তার ভেতর থেকে বেরোবে পাঁচ পুরুষের জমানো ট্রেজার, সঞ্চিত সম্পত্তি। মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে আলিবর্দি খাঁ পর্যন্ত সবাই মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। উপায় করা টাকায় ভাগ বসিয়ে বসিয়ে সিন্দুক ভারী করে তুলেছে। এ সেই টাকা। আর শুধু টাকাই নয়, হিরে মুক্তো পান্না চুনি তাও আছে। সে যে কত আছে তার হিসেব লেখা নেই তারিখ-ই বাংলার পাতায়। সেই সমস্ত টাকার হিসেব বড় কম হিসেব নয়।
দু’খানা কাগজ। একখানা সাদা কাগজ, আর একখানা লাল।
দু’খানা কাগজ কেন?
ক্লাইভ বললে–একটা জাল, আর একটা আসল
আসল কাগজটাতে সকলের নাম আছে। শুধু উমিচাঁদের নাম নেই। জাল লাল কাগজটাতে সকলের নামের সঙ্গে মিরজাফরের নাম আছে।
ক্লাইভ বললে–স্কাউজ্বেলটাকে এই জাল দলিলটা দেখাব, এই জাল দলিলেই তার সই থাকবে খানিকক্ষণের জন্য বিবেকে বাধল বোধহয় সকলের। আমরা কি তা হলে লায়ার? আমরা কি তবে। সবাই মিথ্যেবাদী? কিন্তু তা কেন? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্বার্থ দেখতে এসেছি আমরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্বার্থ আমাদের স্বার্থ। দেয়ার ইজ নাথিং রং ইন ওয়ার অ্যান্ড লাভ। যুদ্ধ করতে বসে ন্যায়-অন্যায় ভাবলে চলে নাকি।
প্রথমেই সই করলে ক্লাইভ। রবার্ট ক্লাইভ। বড় বড় অক্ষরে নিজের নাম লিখে ড্রেকের দিকে এগিয়ে দিলে। কলমটা বাগিয়ে ধরে ড্রেক সাহেব সই করে দিলে তার নীচেয়। তারপর ওয়াট, তারপর কিলপ্যাট্রিক, তারপর বিচার। পাশে মিরজাফরের সই আগে থেকেই ছিল।
এবার তুমি সই করো?
ওয়াটসন এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। বললে–না।
কেন, সই করবে না কেন?
জাল দলিলে আমি সই করব না! ওটা পাপ!
ক্লাইভের চোখ দুটো গোল হয়ে উঠল রাগে, অপমানে, ক্ষোভে, লজ্জায়, ঘৃণায় আর অহংকারে। ক্লাইভ বরাবরই বড় অহংকারী। বরাবর মানুষের তাচ্ছিল্য পেয়ে পেয়ে বড় স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছিল ক্লাইভ। ওয়াটসন কি তবে নিজেকে সকলের চেয়ে বড় মনে করে, সুপিরিয়ার মনে করে! জাল দলিলে সই করে উমিচাঁদকে ঠকাতে যাচ্ছে বলে ক্লাইভ তার চেয়ে ছোট হয়ে গেল? তুমি কি মনে করো আমি জানি না কাকে বলে ন্যায়, কাকে বলে অন্যায়? ইন্ডিয়াতে এসে নবাবের থ্রোন কেড়ে নেওয়া অন্যায় নয়? এখানে এসে ইন্ডিয়ার মেয়ের সঙ্গে রাত্রে এক বিছানায় শোয়া অন্যায় নয়?
যখন কথা বলতে আরম্ভ করে ক্লাইভ, তখন আর তার জ্ঞান থাকে না। যখন আর্মি নিয়ে আমরা জীবনমরণের যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, যখন জানি না কাল বেঁচে থাকব কি মারা যাব, তখন ভালমন্দর বিচার করে কে? সে আর যে-ই হোক, রবার্ট ক্লাইভ নয়। রবার্ট ক্লাইভ জীবনে কাউকে পরোয়া করে চলতে শেখেনি। সে বাপকে পরোয়া করেনি, মাকে পরোয়া করেনি, পৃথিবীকে পরোয়া করেনি। নিজের জীবনকে পর্যন্ত পরোয়া করেনি সে। তুমি তাকে আজ ন্যায়-অন্যায় শেখাতে এসেছ? তুমি কি মনে করো আমি এতদূর পর্যন্ত এগিয়ে এসে এখন থেমে যাব, পেছিয়ে যাব? নো, নেভার।
ওয়াটসন তখনও বেঁকে আছে। বললে–না, আমি সিগনেচার দেব না—
তা হলে দরকার নেই তোমার সইয়ের। তা হলে তোমার হয়ে অন্য লোক সই করবে। জাল সই।
কে সই করবে?
সে যে-ই হোক, তোমার একলার জন্যে আমি এতদুর এগিয়ে পেছিয়ে আসব না। জীবনে হেরে যাওয়া কাকে বলে আমি জানি না, আজও আমি হার মানব না–
তবু শুনি কে সই করবে?
