বাইরে আসতেই পালকি-বেহারারা রয়েছে। কান্ত আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁগো, কে এসেছে এখানে? বেভারিজ সাহেবের সঙ্গে কারা এনারা?
উমিচাঁদ সাহেব! আমরা উমিচাঁদ সাহেবের লোক।
আর সঙ্গে কে?
লোকগুলো সাদাসিধে মানুষ। বেশি ঘোরপ্যাঁচ বোঝে না। বললে–নারায়ণ সিং
নারায়ণ সিং কে?
আজ্ঞে তা জানিনে, রাজধানী থেকে এয়েচে
কে নারায়ণ সিং, কে উমিচাঁদ সাহেব, কিছুই জানত না কান্ত। দিনমানে না এসে এত রাত্তিরেই বা গদিতে এল কেন সাহেব, তাও বুঝতে পারল না। হঠাৎ যেন সব ওলোটপালোট হয়ে গেল। কদিন আগেই কান্তর কানে এসেছিল নবাব মারা গেছে। সে ছিল ভোর পাঁচটার সময়। তখন বলতে গেলে ভাল করে ঘুমও ভাঙেনি। সেই খবর শোনার পর থেকেই যেন সাহেবদের রকমসকম সব বদলে গেল। মনে আছে, বেভারিজ সাহেব কতদিন গদিতেই আসেনি। একলা কান্তকেই কাজ চালাতে হয়েছে। তারপর ক’দিন যেতে-না-যেতেই এই কাণ্ড। সাহেবের হুকুম। কান্ত সেই অত রাত্তিরে কেল্লার ফটকে গিয়ে পল্টনের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল।
হু কামস দেয়ার?
আমি কান্ত সরকার, বেভারিজ সায়েবের মুনশি। চিঠি এনেছি ড্রেক সাহেবের জন্যে।
তবু পল্টন বেটা কথায় কান দেয় না। বললে–লাটসাব বারাসাত গিয়া
বোঝা গেল ড্রেক সাহেব কেল্লায় নেই! বারাসতে গিয়েছে কাজে।
ফিরে এসে খবরটা বেভারিজ সাহেবকে দিতেই সাহেব একেবারে রেগে খুন। ড্রেক সাহেব কেল্লায় নেই তা যেন কান্তরই অপরাধ। আরও কী সব কথাবার্তা হতে লাগল তিনজনে অনেকক্ষণ। কান্ত সেই দরজা বন্ধ গদি-বাড়ির সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তখন বেশ গরম পড়েছে। এপ্রিল মাস। তারিখটাও মনে আছে কান্তর। ১৩ রজব। তারপর অনেকক্ষণ কথা বলে আবার তিনজনে পালকি করে। যেদিক থেকে এসেছিল, সেই দিকেই চলে গেল।
আর ঠিক তার খানিক পরেই বশির এসে হাজির। বশির মিঞাকে সেই সময়ে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল কান্ত। তুই, এত রাত্তিরে?
তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকেই বশির মিঞা দরজায় হুড়কো দিয়ে দিয়েছিল। বললে–কে এসেছিল রে তোর এখানে?
আমার সায়েব।
আর দু’জন কে?
ওদের আমি চিনি না।
নামও শুনিসনি? পালকি-বেহারাদের তুই যে জিজ্ঞেস করলি দেখলুম!
তুই সব দেখেছিস নাকি?
সব দেখেছি আমার কাছে চাপতে কোসিস করিসনি। সচ-বাত বলবি, ঝুটা বললে–তোর নুকসান হবে বলে রাখছি। যা-যা শুনেছিস সব বিলকুল খোলসা করে বল।
কান্ত বললে–সত্যি বলছি, আমি ওদের চিনি না, শুনলাম একজনের নাম উমিচাঁদ আর একজন নারায়ণ সিং
নারায়ণ সিং! নামটা শুনেই বশির মিঞা তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। শালা হারামিকা বাচ্চা। বেওকুব, বেতমিজ, বেশরম। শালাকে আমি দেখে লেব। ওর বাপের নাম ভুলিয়ে দেব তবে আমি মুসলমানের বাচ্চা। ওর ভাই রামরাম সিংয়ের শির কাটিয়ে দেব। শালা আমাকে চেনে না হিন্দুর বাচ্চা। তুই কিছু মনে করিসনি হিন্দুর বাচ্চা বলছি বলে। তুই আমার দোস্ত। তোর সঙ্গে আমার দোস্তালি হয়ে গেছে ইয়ার। কিন্তু ওরা নিমকহারাম। ওই রামরাম সিং, ওই নারায়ণ সিং, ওই ঘসেটি বেগমও নিমকহারাম–শালা মুসলমানের মধ্যেও হারামির বাচ্চা আছে অনেক
বলতে বলতে বশির মিঞা চিৎকার করে উঠতে যায় আর কী।
কান্ত বললে–ওরে থাম ভাই বশির, একটু চুপি চুপি কথা বল, কেউ শুনতে পাবে, আমার চাকরি চলে যাবে
কিন্তু বশির মিঞা রেগে তখন টং হয়ে গেছে। তার মুখে তখন খই ফুটতে আরম্ভ করেছে। যাকে পাচ্ছে তাকে গালাগালি দিচ্ছে। কোথাকার রাজা জানকীরাম, রাজা দুর্লভরাম, রাজবল্লভ, তার ছেলে কৃষ্ণবল্লভ, কারওই নাম শোনেনি কান্ত। গড়গড় করে সকলের কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি বলে গেল বশির মিঞা। বশির মিঞা বললে–নারায়ণ সিংকে আর বেশিদিন বাঁচতে হবে না, দেখে নিস–
কেন?
আমার হাতে খুন হয়ে যাবে শালা। আমি আমার ফুপাকে গিয়ে কাল খবরটা দিচ্ছি—
কিন্তু, নারায়ণ সিং কে? কী করতে এসেছে সাহেবের কাছে?
ওই শালা উমিচাঁদ এনেছে সঙ্গে করে। ও শালা হল চর। শালা রাজবল্লভের চর। রাজবল্লভের ছেলে কেষ্টবল্লভ এখেনে ফিরিঙ্গিদের কাছে রয়েছে, তা জানিস তো। এ ওই রাজবল্লভের কাণ্ড। নবাব মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারামিরা নেমকহারামি শুরু করেছে।
কান্ত এবার আর থাকতে পারলে না। বললে–তুই এখন যা বশির, সাহেব আবার কোন সময়ে এসে পড়বে, তখন আমার চাকরি চলে যাবে
যাক না তোর নোকরি, আমি তো আছি, বশির মিঞা থাকতে, বশির মিঞার ফুপা থাকতে তোর ডর কীসের?
না ভাই, এবার আমি বিয়ে করছি, এখন আর ছেলেমানুষি করলে চলবে না।
বিয়ে! শাদি? শাদি করছিস? কোথায়?
হাতিয়াগড়ে। সব ঠিক হয়ে গেছে, দিনটিন সমস্ত ঠিক হয়ে গেছে!
ঠিক করছিস! মরদের কাম করছিস। শাদি করবি, লেড়কা পয়দা করবি, তবে না মরদ! আরে মরদের পয়দাই হয়েছে শাদি করবার জন্যে, আর মর্দানার পয়দা হয়েছে লেড়কা পয়দা করবার জন্যে। খোদাতালার দেমাগ আছে ইয়ার, খোদাতালা অনেক ভেবে ভেবে তবে এই কানুন করেছে। দুনিয়ার
বলতে বলতে বশির মিঞা সেদিন সেই রাত্রের অন্ধকারের মধ্যেই বেরিয়ে গিয়েছিল। বশির মিঞা। সেদিন চলে যাবার পর থেকেই আরও অনেক কাণ্ড শুনেছিল কান্ত। ভেতরে ভেতরে যে এত ব্যাপার চলছে তা এতদিন টের পায়নি সে। কোথায় সে বিয়ে করবে, বিয়ে করে বউ নিয়ে বড়চাতরায় তাদের বাড়িতে গিয়ে উঠবে, পাড়ার বউ-ঝিরা তার বউ দেখতে আসবে, এইসব স্বপ্নই দেখত সারাদিন। গদিবাড়ির কাজের ফাঁকেও বউয়ের মুখটা কল্পনা করে নিয়ে চোখ বুজিয়ে ভাবতে ভাল লাগত। কিন্তু হঠাৎ যেন কোম্পানির সব সাহেবরা চারদিকে ছুটোছুটি আরম্ভ করে দিলে। ড্রেক সাহেবের শরীর ভাল ছিল না, বালেশ্বরের বন্দরে বেড়াতে গিয়েছিল। তারপরেই কলকাতায় এসে হাজির হয়েছিল কৃষ্ণবল্লভ। ঢাকার রাজবল্লভ সেনের ছেলে। টাকাকড়ি-গয়নাগাঁটি, বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে এসে হাজির। সঙ্গে ছিল কাশিমবাজার কুঠির ওয়াটস সাহেবের চিঠি। সেই তাকে যদি এখানে সাহেবরা না থাকতে দিত তো কোনও গণ্ডগোল হত না আর।
