কান্ত কিছু বলবার আগেই মরালী আবার বলতে লাগল অথচ দেখো, যার কপালে সুখ নেই, কোনও সুখই তাকে সুখী করতে পারে না। নইলে আমার বিয়ের রাতের আগের দিন সকালে ওই ছোট বউরানির শোবার ঘরে গিয়ে দেখেছি, সে কী ঐশ্বর্য! শোবার খাট বিছানা। মাথার কাছে ফুলের তোড়া, কেমন সাজানো ঘর। ছোটমশাইয়ের ভালবাসা পেয়ে পেয়ে ছোট বউরানির তখন ঠ্যাকারের সীমা নেই–অথচ কোথায় গেল সেসব, কোথায় গেল সেই ঠ্যাকার! আজ আমাকেই আবার সেই ছোট বউরানি চিঠি লিখেছে–কপাল এমনই জিনিস
কান্ত বললে–ছোট বউরানির যা হয় হোক, কিন্তু আমি ভাবছি আমার কথা
তোমার কথা? তোমার কথা আবার কী?
আমার জন্যেই তো তোমার এই হাল হল?
মরালী বললে–সে কথা ভেবে আর কী করবে, এও আমার কপালে ছিল মনে করে নাও
কিন্তু ভাবলেই কষ্ট হয় যে! কোথায় ছিলুম বেভারিজ সাহেবের সোরার গদিতে, কোথায় কেমন করে আবার চলে এলুম নবাব-নিজামতে। এই ক’বছরে কত কী হয়ে গেল। যেখানে আমি কাজ করতুম, সেই গদিবাড়িতে গিয়ে দেখেছি, কত বদলে গেছে, গঙ্গার ধারে ধারে কত ঘাট হয়েছে, কত বাজার হয়েছে। কলকাতায়; সবকিছু বদলে গেছে, তুমিও বদলে গেছ; আমিই শুধু সেই একই রকম রয়ে গেলুম!
মরালী বললে–বা রে, আমি কোথায় বদলালুম?
বদলাওনি তুমি? আগে কি তুমি এইরকম ছিলে?
ওমা, আগে কী রকম ছিলুম?
এখন তুমি কত সুন্দর হয়েছ, তা জানো?
মরালী হেসে বললে–ওমা, আগে বুঝি খারাপ দেখতে ছিলুম?
না, খারাপ দেখতে থাকবে কেন? সচ্চরিত্র পুরকায়স্থমশাই যখন বিয়ের সম্বন্ধ করতে এসেছিল, তখন আমাকে বলেছিল তোমার চেহারার কথা।
কী বলেছিল?
সে না-ই বা শুনলে। কিন্তু পরে যখন তোমাকে দেখলুম তখন মনে হয়েছিল সে যেমন বলেছিল তার চেয়ে তুমি অনেক সুন্দরী। তারপর যত তোমাকে দেখছি ততই যেন তুমি দিন দিন আরও সুন্দরী হচ্ছ
মরালী হো হো করে হেসে উঠল
বললে–এই বৃষ্টির রাত্তিরে নৌকোর ছইয়ের মধ্যে একলা আমার সামনে কি ও কথা বলতে আছে?
কান্ত বললে–কেন, কেউ তো শুনতে পাচ্ছে না–
শুনতে পেলে বুঝি দোষের হত?
কান্ত বললে–দোষের হত না? এইসব কথা কি সকলের সামনে বলা যায়? অন্য লোকে শুনলে তারা তো অন্য মানে করত?
কী মানে? মনে করত তুমি আমায় ভালবাসো?
হঠাৎ নৌকোটা দুলে উঠল। কান্ত আর একটু হলেই ঝাঁকুনি লেগে মরালীর গায়ের ওপর ঢলে পড়ছিল। তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে উঠে বসে বললে–ঝড় উঠল বোধহয়, ঢেউ উঠেছে গঙ্গায়–
মরালী বললে–তা হোক না, তুমি চমকে উঠলে কেন?
কান্ত বললে–দাঁড়াও, বাইরে গিয়ে দেখে আসি কী হল
মরালী বললে–কেন, ঝড় উঠলে ভয় কী?
কান্ত বললে–আমার জন্যে ভয় নয়, ভয় তোমার জন্যে
আমার জন্যে? আমার জন্যে কীসের ভয় তোমার এত? তুমি কি মনে করেছ আমি সাঁতার জানি না?
কান্ত বললে–সাঁতার তো আমিও জানি। ছোটবেলায় একলা গঙ্গা সাঁতরে পার হয়ে কলকাতায় উঠে বেঁচেছিলম। সেজন্য বলছি না–
মরালী বললেও, এবার বুঝতে পেরেছি
কী?
ওই যে তোমাক চকবাজারে কে এক গণতকার তোমার হাত দেখে বলেছিল তুমি জলে ডুবে মারা যাবে, সেইজন্যে!
কান্ত বললে–না না, সত্যি বলছি সে জন্যে নয়! গণতকারের কথা কি আমি বিশ্বাস করি ভেবেছ? সে তো আরও অনেক কথাই বলেছিল, সব কি ফলেছে না ফলছে?
কী বলেছিল? আমার সঙ্গে তোমার আবার বিয়ে হবার কথা?
কান্ত হাসল-বাঃ, তোমার তো দেখছি সব মনে আছে!
মরালী বললে–তা তুমি কি ভাবো আমার মন বলে কিছু নেই?
কান্ত আর থাকতে পারলে না। একেবারে মরালীর কাছাকাছি সরে এল। বললে–আচ্ছা, সত্যিই বলল না, গণতকার ওকথা বললে–কেন?
ওমা মরালী সরে বসল–তুমি আবার কাছে সরে আসছ কেন? একটু মিষ্টি কথা বললেই একেবারে গলে যাও দেখছি তোমরা। ঠিক নবাব যেমন, তুমিও তেমনই
কান্ত বললে–নবাবের কথা এখন থাক, তুমি আমার কথা বলে মরালী! সত্যিই কি তুমি আমার কথা ভাবো? সত্যিই কি তুমি আমার দুঃখটা বোঝো? যা হয়ে গেছে তার কি আর কোনও পার নেই?
মরালী বললে–না, তোমাকে নিয়ে দেখছি আর পারা গেল না, ভাল মুশকিল তো করেছি তোমাকে সঙ্গে এনে
না, সত্যি বলছি, বলল না? তুমি কি আমার কথা ভাবো?
মরালী বললে–অমন করে পীড়াপীড়ি কোরো না, ওকথা জিজ্ঞেস করতে নেই
কান্ত বললে–কিন্তু তা হলে আমি কী করব বলো? আমি কী নিয়ে বেঁচে থাকব, বলো?
বলেছি তো আমার কথা ভুলে যেতে! বলেছি তো একটা বিয়েথা করে ঘরসংসার করতে।
কান্ত বললে–তা যদি সম্ভব হত তো বিয়ে করতুম না মনে করো?
কিন্তু কেন সম্ভব নয়, তা বলবে তো?
সেও তোমায় খুলে বলতে হবে? তুমি কিছু বোঝো না? তা হলে কেন তুমি আমাকে চেহেলসতুনে ডেকে পাঠিয়েছিলে? কেন তুমি আমার সঙ্গে হেসে কথা বলেছিলে? কেন তুমি আমাকে বিশ্বাস করেছিলে? কেন তুমি আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলে?
ছিঃ
মরালী হঠাৎ নিজের হাত দিয়ে কান্তর মুখটা চাপা দিয়ে দিলো বললে–ছিঃ, তোমার মুখে দেখছি কিছুই আটকায় না–
আর সঙ্গে সঙ্গে ঠিক সেই সময়েই কি নৌকোটা অমন করে দুলে উঠতে হয়? দুলে উঠতেই মরালী আর টাল সামলাতে পারলে না, একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনের দিকে। আর কাও তখন কথা বলতে বলতে এত এগিয়ে আসছিল যে মরালীর ভয় লেগে গিয়েছিল। কাস্তর মুখে হাত চাপা না দিয়ে। আর কোনও উপায় ছিল না মরালীর পক্ষে।
বাইরে থেকে তখন মাঝিটা হঠাৎ চিৎকার করে উঠেছে–হুশিয়ার-তুফান উঠেছে নদীতে
