মরালী হাসল–কেন, এখানে আমার পাশে শুতে তোমার ভয় করে নাকি?
কান্ত বললে–ভয় করবে না? আমি তো আমি, তোমাকে কে না ভয় করে? জগৎশেঠজি থেকে আরম্ভ করে উমিচাঁদ, নন্দকুমার, মিরজাফর, মনসুর আলি, মেহেদি নেসার, এমনকী ক্লাইভসাহেব পর্যন্ত তোমাকে ভয় করে! সত্যি বলল তো এসব তুমি কোথায় শিখলে এত?
কী সব?
এই, কী করে লোকের সঙ্গে মিশতে হয়, লোকের সঙ্গে কথা বলতে হয়, কী করে সকলকে হাতের মুঠোয় আনতে হয়!
মরালী আবার হেসে উঠল। বললে–ওমা, কী যে বলো তুমি, কাকে আবার হাতের মুঠোয় আনলুম?
কান্ত বললে–কেন, জানো না?
মরালী বললে–খুলে বলো না, কাকে? নজর মহম্মদকে?নানিবেগমকে?
কান্ত বললে–কাকে হাতের মুঠোয় আনননি বলতে পারো? নবাবকে তুমি হাতের মুঠোয় আনননি? জগৎশেঠজিকে আনননি? সত্যিই তুমি জাদু জানো, না মরালী?
মরালী বললে–আর তোমার নিজের কথাটা যে বাদ দিলে?
আমি? আমার কথা ছেড়ে দাও, আমি আবার একটা মানুষ। আমাকে হাতের মুঠোয় আনা আবার কি একটা বাহাদুরি?
মরালী বললে–সত্যিই, তুমি কেন আমার জন্যে নিজের জীবনটা নষ্ট করছ বলো তো?
নষ্ট কোথায় করছি মরালী? এই যে তোমার কাছে থাকতে পারছি, তোমার কুম তামিল করতে পারছি, এটা কি আমার কম লাভ মনে করো? এক-একবার মনে হয়, তোমার জন্যে আরও কিছু করতে পারলে যেন ধন্য হয়ে যেতাম
মরালী সেই পুরনো প্রশ্নটাই আবার করে বসল।
বললে–কিন্তু আমি তোমার কে যে, আমার জন্যে তুমি এত করো?
কান্ত বললে–সে তুমি বুঝবে না। তুমি যদি পুরুষমানুষ হতে তো বুঝতে!
কেন, মেয়েমানুষ হলে বুঝি বুঝতে নেই?
কান্ত বললে–কিন্তু তুমি তো সেরকম মেয়েমানুষ নও! তুমি যে আলাদা
আমি আলাদা?
আলাদা নও? আলাদা না হলে আমার সঙ্গে তুমি এমন ব্যবহার করো? এই যে তুমি আমাকে একসঙ্গে ঘরের ভেতর বসিয়ে কথা বলতে দিচ্ছ, এ অন্য কেউ হলে করতে দিত? অন্য কেউ হলে নিজের স্বামীকে ছেড়ে চেহেলসূতুনে এসে নবাবের সঙ্গে রাত কাটাতে পারত?
কেন, আমার মতো তো অন্য অনেক মেয়ে এসে চেহেল্-সুতুনে রয়েছে!
কিন্তু তারা কি তোমার মতো? তারা তো সবাই সারাফত আলির আরক খায়, তারা নবাবকে খুশি করে টাকা-মোহর-গয়না আদায় করতে চায়। তুমি কি তাই করো?
তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে কান্ত আবার বললে–তুমি একটু শুয়ে পড়ো মরালী, নইলে কাল তোমার আবার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। আমি উঠি
মরালী বললে–কেন, এখানেই শোও না।
না মরালী, আমাকে আর লোভ দেখিয়ো না। আমার মনের জোর নেই তোমার মতো, কখন কী করে ফেলব, তখন আর আফশোসের শেষ থাকবে না!
মরালী বললে–অত যদি আফশোসের ভয় তো মুর্শিদাবাদ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেলেই পারো। অন্য কোনও চাকরি নিয়ে বিয়ে করে ঘরসংসার করতে পারো
তা যদি পারতুম!
বলে আর দাঁড়াল না। ছই থেকে বাইরে বেরোতেই হঠাৎ আকাশ ভেঙে ঝমঝম করে বৃষ্টি এল। কান্ত সেই মেঘ-ভাঙা কালো অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। কী করবে বুঝতে পারলে না।
মরালী বিছানার ওপর হেলান দিয়েছিল।
বললে–দেখলে তো? আমি বললুম বৃষ্টি আসবে। দরজা বন্ধ করে দাও, জলের ছাট আসছে—
দরজা বন্ধ করে কান্ত আবার ভেতরে চলে এল।
বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টি নয় তো যেন বাজনা। বাজনা কি শুধু উৎসবেরই প্রতীক! জীবন-মৃত্যু আনন্দ-বিরহ সবকিছুই যেন সংগীত হয়ে নিজেকে প্রকাশ করে। কান্নাও তো একরকম সংগীত। কিন্তু সেই ঝমঝম বৃষ্টি-পড়া নিরিবিলি রাত্রে কান্নাই বা আসবে কেন কান্তর চোখে।
মরালী কান্তর মুখের দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল।
বললে–কী হল তোমার? কাঁদছ?
কান্ত বললে–না
তা হলে? দেখি, কাছে এসো
কান্ত কাছে গেল না। বললে–না, থাক–
মরালীই শেষপর্যন্ত উঠে কাছে এল। দু’হাত দিয়ে কান্তর দুটো কাধ ধরল। তারপর চিবুকটা ধরে মুখটা উঁচু করে তুলল।
বললে–সত্যিই কাঁদছ নাকি, না বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল-?
তারপর হাত ধরে মরালী কান্তকে নিজের কাছে এনে বসাল। বললে–তুমি দেখছি মেয়েমানুষেরও বেহদ্দ! কোথায় আমি কাঁদব, তা নয় তো তুমিই কাঁদতে শুরু করলে! কেন, কী হয়েছে তোমার বলো তো! কী হয়েছে তোমার?
নৌকোটো তখন ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে তিরের মতো গঙ্গার বুকের ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে। আর নৌকোর ভেতরে দু’জন মানুষের বুকের মধ্যে তখন বাইরের অশান্ত প্রকৃতির মতোই অশান্ত তীব্র যন্ত্রণা নিঃশব্দ আর্তনাদ করে চলেছে।
অনেকক্ষণ পরে মরালী বললে–কী যে তুমি ছেলেমানুষি করো! নিজের কষ্টটাই যেন তোমার কাছে বড় হল, আর আমার বুঝি কিছু কষ্ট হতে নেই? আমার বুঝি পাথরের বুক, আমার বুঝি কিছু বোঝবার ক্ষমতা নেই?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কান্ত বললে–কিন্তু কেন তুমি এমন করে নিজের সর্বনাশ করছ মরালী?
বা রে–মরালী হেসে উঠল বা রে, আমি আমার সর্বনাশ করেছি না তুমি আমার সর্বনাশ করেছ?
কান্ত বললে–সেই তবু তুমি আমাকেই দোষ দেবে? আমি তো তোমাকে অনেকবার বলেছি চলে যেতে! কতবার চেহেল সুতুন থেকে পালিয়ে যেতে বলেছি। তুমি রাজি হয়েছ? তুমি আমার কোনও কথা কখনও শুনেছ?
কিন্তু যখন তুমি আমাকে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে এসেছিলে তখন তোমার মনে ছিল না?
কিন্তু তখন কি আমি জানতুম যে, আমি তোমাকেই চেহেল্-সুতুনে নিয়ে চলেছি!
মরালী বললে–বেশ, তা না হয় জানতে না, কিন্তু এটা জানতে তো যে, একজন মেয়েমানুষকে নিয়ে যাচ্ছ নবাবের চেহেসূতুনে? সে না-ই বা হলাম আমি, কিন্তু সেও তো একজন মেয়েমানুষ? তারও তো সংসার আছে। তখন একবার ভাবলে না যে, তুমি আর একজনের সুখের সংসার ভেঙে দিচ্ছ?
