বেশ, তাই ভাল।
কিন্তু আজকে এখন তো হবে না। কাল হতে পারে। আজ আমি এখনই যাচ্ছি, সব বন্দোবস্ত ঠিক করে ভোরবেলা তোমার বাড়িতে সব পেপার নিয়ে যাব।
উমিচাঁদ বললে–আপনাদের সকলের সই চাই কিন্তু আপনি, ওয়াটসন, ড্রেক, ওয়াটস, মেজর কিলপ্যাট্রিক, বিচার–সকলের। মিরজাফরের সঙ্গে ঠিক যেমন যেমন দলিল হয়েছে, যারা যারা সই করেছে, তাতে তাদের সকলের সই থাকা চাই
ঠিক আছে, ওই কথাই রইল।
উমিচাঁদ খুশি হয়ে চলে গেল। ওয়াটস্ এতক্ষণ চুপ করে ছিল।
বললে–কর্নেল, ভালই করেছেন রাজি হয়ে। টাকা না দিলে উমিচাঁদসাহেব সব বলে দিত নবাবকে–তাতে মিরজাফর সাহেবেরও বিপদ হত, মিরজাফরসাহেব হয়তো ভয়ে শেষ পর্যন্ত পেছিয়ে যেত
ক্লাইভ বললে–না–আমি টাকা দেব না
তার মানে? আপনি কথা দিলেন টাকা দেবেন, কুড়ি লাখ টাকা দেবেন, কনট্র্যাক্ট সই করে দেবেন!
তা হোক, আমি কথা রাখবনা। স্কাউড্রেলটাকে আমি ভাল শিক্ষা দেব-আইশ্যাল টিচ হিম এ লেসন।
বলে উঠে দাঁড়াল ক্লাইভ। শেষ মুহূর্তে প্যাঁচ কষে কিছু টাকা আদায় করে নিতে চায় স্কাউড্রেলটা। সুতরাং ক্লাইভও প্যাঁচ কষবে।
ওয়াটসকে বললে–চলো, লেট আস গো
কোথায়?
ক্লাইভ বললে–এখনও বোধহয় ওরা আছে, এর পরে হয়তো সবাই চলে যাবে আর দেরি করলে চলবে না।
পেরিন সাহেবের বাগানে তখন অন্ধকার ঝিমঝিম করছে। ক্লাইভ আর ওয়াটস বাগানের গেট পেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। বড় বড় গাছগুলোর মাথায় কয়েকটা বাদুড় পাখা-ঝাপটানি দিচ্ছে। অনেক ভাবনার বোঝা নিয়ে ইতিহাস আপনার হাতে লিখে চলেছে একটা পরিচ্ছেদের পর আর একটা নতুন পরিচ্ছেদ। সৎ-অসৎ, ন্যায়-অন্যায়, উত্থান-পতনের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বারবার। এবার ইন্ডিয়ার পালা। তোমরা অনেকদিন আমাকে অস্বীকার করেছ, আমাকে অবহেলা করেছ, আমি তোমাদের কিছু বলিনি। তোমরা একবার বলেছ ভগবান আছে, একবার বলেছ ভগবান নেই। তোমরা একবার পরকালে বিশ্বাস করেছ, একবার ইহকালে। আলেকজান্ডার যে সমরকন্দের সিংহাসনে বসে একদিন সেকেন্দার বাদশা নামে বিখ্যাত হয়েছিল, সেই সিংহাসনে একদিন তৈমুর আর তার বংশধর বাবর বসেছিল। সিংহাসন তো চিরকাল কারও একচেটিয়া থাকে না। একশো দশ বছরের এক বুড়ির মুখে হিন্দুস্থানের কথা প্রথম শুনেছিল বাবর। শুনেছিল, ১৩৯৮ সালে কেমন করে তৈমুর হিন্দুস্থান দখল করেছিল। তখন থেকেই এ-দেশে আসবার আগ্রহ হয়েছিল সেই ছেলেটার। একদিন যখন বাবর দিল্লির সিংহাসনে বসল, ওদিকে বাংলাদেশে তখন আর-একজন আর-এক সিংহাসন দখল করে বসেছে। সে শ্রীচৈতন্যদেব মহাপ্রভু। হিন্দুস্থানের ইতিহাস এই সিংহাসন বদলের ইতিহাস। সিংহাসন যখন বদলেছে তখন উমিচাঁদের দল এমনি করেই দলিল সইসাবুদ করে পাকা বন্দোবস্ত করে নিতে চেয়েছে। কিন্তু ভারত ভাগ্য বিধাতার বিধানে একদিন সব দলিল, সব সই, সব বন্দোবস্ত আবার বানচাল হয়ে গিয়েছে।
স্যার!
পেছন থেকে হঠাৎ ল্যাসিংটনের গলা পেয়ে ক্লাইভ ফিরে দাঁড়াল।
কী?
ল্যাসিংটন বাগান পেরিয়ে গেটের বাইরে এসে বললে–আপনি চলে যাচ্ছেন?
কেন? কিছু বলবে?
ল্যাসিংটন বললে–মরিয়ম বেগম আর তার বাঁদিটা আপনাকে ডাকছে। বলছে আপনার সঙ্গে একবার কথা বলবে।
কী কথা?
তা বলছে না।
ক্লাইভ বললে–বলল,এখন আমার সময় নেই কথা বলবার। আমি কাল ভোরেই মুর্শিদাবাদ যাচ্ছি, সেখান থেকে ফিরে এসে কথা বলব
কিন্তু ওরা কিছু খাচ্ছে না, না খেয়ে থাকলে যে মারা যাবে।
ক্লাইভ বললে–মারা যায় যাক। মরিয়ম বেগম মারা গেলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনও লোকসান হবে না
বলে সোজা অন্ধকারের মধ্যেই পা বাড়িয়ে দিলে।
.
উমিচাঁদ নিজের বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই হিসেবের খাতা বার করে বসল। মোহর টাকা জমি সম্পত্তি কারবার সব সেই খাতায় লেখা থাকে। নিখুঁত হিসেব। গুরু নানকের শিষ্য মাথার ওপর গুরুর পট টাঙিয়ে রেখে হিসেব লেখে। হিসেবের মজা বড় মজা। একের পরে একটা শূন্য বসালেই দশ হয়ে যায়। তারপর আর একটা শূন্য বসালেই একশো। আর তারপর আর একটা শূন্য বসালেই এক হাজার। আর তারও পরে একটা শূন্য বসালেই একেবারে দশ হাজার। এমনি একটা করে শূন্য বসিয়েই উমিচাঁদ লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছে আজ। আজ আবার আরও কুড়ি লাখ যোগ হল। কিছু করতে হল না। পরিশ্রম নয়, কেনাবেচা নয়, শুধু একটু বুদ্ধি খরচ। এই বুদ্ধিটারই দাম বিশ লাখ টাকা। হিসেবের খাতার পাতায় শেষ সংখ্যাটার সঙ্গে আরও বিশ লাখ যোগ করলে মোট কত হবে তারই হিসেব করতে উমিচাঁদ একবার অন্যমনস্ক হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে গুরু নানকের কথা মনে পড়ল। মাথা উঁচু করে দেয়ালে টাঙানো পটটার দিকে চেয়ে একমনে প্রণাম করে নিলে।
২.১৩ বজরা ছুটে চলছিল
তারপর রাত গভীর হল। গঙ্গার ধার দিয়ে একটা বজরা ছুটে চলছিল। ভোররাত্রে মুর্শিদাবাদ থেকে বজরাটা ছেড়েছে। তারপর সারা সকাল, সারা দুপুর, সারা সন্ধেটা কেটেছে। তারপর কখন রাত হয়েছে, রাত গম্ভীর হয়েছে তার খেয়াল ছিল না কারও।
কান্ত বললে–তোমার ঘুম পাচ্ছে, তুমি ঘুমোও, আমি উঠি
মরালী বললেতুমি কোথায় শোবে?
কান্ত বললে–বাইরে–
মরালী বললে–কালকের মতো যদি আবার বৃষ্টি আসে? ওই দেখো না, বাইরে খুব কালো মেঘ করেছে।
কিন্তু এখানে তুমি শুলে আমি কী করে সোব–
