ক্লাইভ বললে–অত কথা শোনবার সময় নেই। কী করতে হবে তাই বলো–
উমিচাঁদ বললে–সেই কথা বলবার জন্যই তো আপনাকে এখানে ডেকে আনলুম। আপনার মতন আমারও তো সময়ের দাম আছে! আমাকে তো কারবার করেই পেট চালাতে হয়।
বলো আমাকে কী করতে হবে?
উমিচাঁদ বললে–দেখুন, যদি ইয়ার লুৎফ খাঁ’র সঙ্গে আপনারা বোঝাঁপড়া করতেন তো আমি কিছু বলতুম না। আপনারা মরজাফরকেই পছন্দ করলেন। যা হোক, সে যা করে ফেলেছেন, ফেলেছেন, আমার কিছু বলবার নেই। এখন নবাব হবার পর মিরজাফরসাহেব আপনাদের যে টাকা দেবে বলেছে, তার থেকে আমার কিছু ভাগ চাই–
তোমার ভাগ চাই!
উমিচাঁদ বললে–বেশি নয়, যা টাকা পাবেন তার শতকরা পাঁচ টাকা।
ক্লাইভ কথাটা শুনে গুম হয়ে বসে রইল। উমিচাঁদের কথায় এতদূর এগিয়ে শেষকালে কি পেছিয়ে যেতে হবে নাকি। নবাবকে চিঠি লেখা হয়ে গেছে। ইংরেজ ফৌজ মুর্শিদাবাদের দিকে যাচ্ছে; ফৌজকামান-সেপাই-সৈন্যসামন্ত সবকিছু চলে গেছে। শুধু ক্লাইভের নিজের যেতে কিছু বাকি। এতদিন উমিচাঁদই তো বুঝিয়েছে যে, সে ইংরেজের দলে। এতদিন উমিচাঁদই তো তাদের খুঁচিয়ে তুলেছে। বলেছে সমস্ত আমির-ওমরাহ সবাই নবাবের ধ্বংস চায়। জগৎশেঠকে তাদের দলে এনেছে এই উমিচাঁদই তো। এই উমিচাঁদের ঘরেই গুরু নানকের ছবিকে ধূপ ধুনো দিয়ে পুজো করা হয়। এই উমিচাঁদই ফলায় তাদের চাল-ডাল-ঘি বিক্রি করে মোটা প্রফিট করেছে। এরা ঠিক শেষ মুহূর্তে আসে। এই উমিচাঁদ, এই নন্দকুমার, এই নবকৃষ্ণের দল। যত দিন যাচ্ছে ততই যেন ক্লাইভ অবাক হয়ে যাচ্ছে এই ইন্ডিয়ানদের দেখে। সাধারণ রাস্তার মানুষ, গ্রামের চাষাভুষোরা তো এমন নয়। তারা কতবার তামাক খাইয়েছে ক্লাইভকে। তাদের বাড়ির দাওয়ার ওপর বসিয়ে সুখদুঃখের গল্প বলেছে। তারা জানে না–কে উমিচাঁদ, কে জগৎশেঠ, কে মিরজাফর। তারা তো খবরও রাখে না, কে তাদের নবাব আর কে তাদের বাদশা। তারা রামপ্রসাদের গান শুনেছে, হরির নাম শুনেছে, কৃষ্ণের নাম শুনেছে, রাধার নাম শুনেছে। ঘেঁটু, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মনসা, শীতলার নামও শুনেছে। আর এই উমিচাঁদের দল, এরাই তাদের লোভ দেখিয়ে ভয় দেখিয়ে উমিচাঁদ জগৎশেঠ হয়ে বসেছে।
পাঁচ পার্সেন্ট শুনেই চমকে উঠলেন নাকি সাহেব?
এতক্ষণে যেন ক্লাইভ সাহেবের জ্ঞান ফিরে এল। কিন্তু উমিচাঁদ জানে না যে, ক্লাইভ যদি উমিচাঁদের চালাকি ধরতে না পারবে তো সেন্ট ফোর্ট ডেভিডের কম্যান্ডার সে মিছিমিছি হয়েছিল। হাজার হাজার লাখ লাখ উমিচাঁদদের জব্দ করবার ক্ষমতা নিয়েই সে ইন্ডিয়ায় এসেছে, একথাও উমিচাঁদ হয়তো ঠাহর করতে পারেনি।
পাঁচ পার্সেন্ট হলে আমার পাওনা হয় তিরিশ লাখ টাকা মাত্র! তিরিশ লাখ টাকা এমন কিছু বেশি না।
রাত গম্ভীর হয়ে আসছে। সমস্ত প্রোগ্রাম নষ্ট করে দিয়েছে উমিচাঁদ। তবুক্লাইভ সাহেব মুখে হাসি ফুটিয়ে উমিচাঁদের দিকে চেয়ে রয়েছে।
বললে–আর?
উমিচাঁদ বললে–আর নবাবের সিন্দুকে যা গয়নাগাঁটি পাওয়া যাবে তার চার ভাগের এক ভাগ আমায় দিতে হবে। বাকি তিন ভাগ আপনারা যে-কেউ নিতে পারেন, আমি কিছু বলতে যাব না–
আর?
উমিচাঁদ বললে–আর মানে?
আর কী চাও তাই জিজ্ঞেস করছি। কারণ সব জিনিসটা আগে থেকে বোঝাঁপড়া হয়ে থাকা ভাল। আমি চাই না, শেষে কিছু মিস-আন্ডাস্ট্যান্ডিং হোক–
উমিচাঁদ বললে–আমিও তাই চাই না সাহেব। সেই জন্যেই তো সব খোলাখুলি বললুম। আপনি শেষকালে বলবেন যে উমিচাঁদ বেটা আমাকে ঠকিয়ে নিলে
কিন্তু আমি তিরিশ লাখ টাকা দিতে পারব না।
কত দেবেন?
ক্লাইভ বললে–বলব?
উমিচাঁদ বললে–বলুন, মন খুলে বলুন। আপনার সঙ্গে আমার লুকোচুরি নেই। আমি কারবারি মানুষ, সোজা কথার ভক্ত, ঘোরপাঁচ বুঝি না
ক্লাইভ বললে–আমি তিরিশ লাখ টাকা দিতে পারব না—
কিন্তু দেবেন কত তাই বলুন!
ক্লাইভ বললে–লেখাপড়া যখন হচ্ছে তখন পাকাপাকি বন্দোবস্ত হয়ে যাওয়াই ভাল। আমি বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে পারি–রাজি?
উমিচাঁদ ভাবতে লাগল। ক্লাইভও মনে মনে তখন হিসেব করছে। পঞ্চাশ লাখ দিতে হবে ইংরেজ ব্যাবসাদারদের। সেবারের লড়াইতে যাদের লোকসান হয়েছে। আরম্যানিয়ানদের দিতে হবে দশ লাখ টাকা। তারপর আমি আর নেভির জন্যে পঁচিশ পঁচিশ করে পঞ্চাশ লাখ টাকা। যারা নেটিভ কারবারি তাদেরও ক্ষতি হয়েছিল। আগুন লেগে ঘরবাড়ি সব পুড়ে গিয়েছিল। তাদের অন্তত কুড়ি-তিরিশ লাখ টাকা দিতে হবে। আর কোম্পানির জন্যে এক কোটি টাকা তো বরাদ্দ আছেই। এর থেকে তিরিশ লাখ টাকা দিতে হবে উমিচাঁদকে। টাকা দিতে আপত্তি নেই, কিন্তু তিরিশ লাখ টাকা চাইলেই সে-টাকা দিতে রাজি হলে সন্দেহ হতে পারে তাই একটু দর কষাকষি করা ভাল।
বললে–বলুন বিশ লাখ টাকা হলে রাজি কি না?
উমিচাঁদ অনেক ভেবে অনিচ্ছের সঙ্গে বললে–ঠিক আছে, বিশ লাখেই রাজি–সেই কথাই রইল। কিন্তু লেখাপড়া? জানেন তো সাহেব, আমি কারবারি লোক, লেখাপড়া সইসাবুদ করা দলিল চাই, তাতে আপনাদেরও সই থাকবে আর আমিও সই করব। নইলে যখন কাজ খতম হয়ে যাবে তখন বলবেন, টাকা দেবার কথা ছিল না
ক্লাইভ বললে–না না, সেরকম কথা বলব না, তুমি আমাদের গোড়া থেকে সাহায্য করে আসছ, আমরা অত আনগ্রেটফুল নই। তবু তুমি যখন বলছ তখন দলিলই তৈরি হবে
