তারা ফাইট করতে আসছিল, কিন্তু আমরা তাদের মুখ বন্ধ করে বেঁধে জলে ডুবিয়ে দিয়েছি। দে আর অল ডেড! কাউকে কথা বলতে দিইনি!
ক্লাইভ সাহেব অবাক হল–সেকী?
উমিচাঁদ বললে–ঠিকই করেছি সাহেব। তাদের না মেরে ফেললে নবাবের কানে পৌঁছে যেত কথাটা! এতে ভালই হল, কেউ আর জানতে পারবে না।
কিন্তু মরিয়ম বেগমকে এখন ধরে রাখা কি ঠিক হবে? বেগম নিয়ে আমাদের কী কনসার্ন?
ওয়াটস বললে–এই মরিয়ম বেগমই তো আমাদের সব কথা জেনে ফেলেছে স্যার; রাত্রে জগৎশেঠজির বাড়িতে এই বেগমসাহেবাই তো গিয়েছিল। এই-ই সব কথা জানিয়ে দিয়েছে। নইলে তো কারও জানবার কথা নয়!
ওকে নিয়ে এখন কী করব? কোথায় রাখব?
উমিচাঁদ বললে–কেন, আপনার বাগানে তো আরও একজন হিন্দু লেডি আছে, তার সঙ্গে একেও রেখে দিন। একটা ঘরে হিন্দু লেডি থাকবে, আর একটা ঘরে মুসলমান লেডি থাকবে।
ক্লাইভ বললে–না, তারা নেই, সেই হিন্দু লেডি চলে গেছে
সেকী? তাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের? ভালই করেছেন। মেয়েমানুষ যদি রাখতেই হয় সাহেব, তা বেশ ভাল মেয়েমানুষ রাখবেন। যে ফুর্তি করতে জানে, ফুর্তি দিতে জানে, সেই তো মেয়েমানুষ।
ক্লাইভ উমিচাঁদের কথা শুনে রেগে গেল। বললে–উমিচাঁদ, তোমার কাছে মেয়েমানুষ সম্বন্ধে আমি আইডিয়া নিতে চাই না। আমি অনেক দিন ইন্ডিয়াতে আছি, ইন্ডিয়ান ওম্যান আমি চিনি
এই দেখুন, আপনি রেগে যাচ্ছে। আপনার ওই তো দোষ!
স্টপ দ্যাট টপিক-ও সম্বন্ধে আর কোনও কথা শুনতে চাই না আমি, অন্য কথা বলো—
তারপর মাঝিদের দিকে ফিরে বললে–পেরিন সাহেবের বাগানের দিকে বজরা ঘোরাও।
*
ইতিহাসের সে এক কুটিল সন্ধিক্ষণ! হিন্দুস্থানের মানুষ যখন সবাই নিজের নিজের স্বার্থচিন্তার আফিম খেয়ে নেশায় আচ্ছন্ন তখন ভূগোলের এক কোণে এক জলাভূমির রঙ্গমঞ্চে বিদেশ থেকে আসা আর-একদল মানুষ নিঃশব্দে আর-এক ইতিহাস, আর-এক ভূগোেল রচনা করবার আগ্রহে আর-এক মতলব আঁটছে। তাদের কাছে কষ্ট কোনও কষ্টই নয়, বিশ্রাম ঘুম স্বাস্থ্য তাদের কাছে শুধু অভিধানের শব্দাবলী! ও কথাগুলো শুধু অভিধানে লেখাই থাক। যে-দিন এমপায়ার হবে সে-দিনকার জন্যে ওগুলো মুলতুবি রইল। এই মশা মাছি, এই সাপ-জোক, এই বিছে-মাকড়শা, এই শীত-গ্রীষ্ম সেদিন সুদে-আসলে মিলে সোনা-হিরে-জহরত হয়ে উসুল হয়ে যাবে। তখন সবাই বলবে–দি সান নেভার সেটস ইন ব্রিটিশ এম্পায়ার। সূর্য কখনও অস্ত যায় না ব্রিটিশ এম্পায়ারে। এরপর আছে আরব, আফ্রিকা, বর্মা, সিলোন, ইজিপ্ট, মেসোপটেমিয়া। আমেরিকা হাতছাড়া হয়ে গিয়ে যা লোকসান হয়েছে তা পূরণ হয়ে যাবে ইন্ডিয়ান এম্পায়ার করে।
আবার সেই পেরিন সাহেবের বাগান। যেখানে যত সেপাই-সোলজার-ফৌজ ছিল চলে গেছে। ফাঁকা হয়ে গেছে কলকাতার ফোর্ট, ফাঁকা হয়ে গেছে পেরিন সাহেবের বাগান। শুধু ওয়ান হানড্রেড সোলজার রাখা হয়েছে চন্দননগরের ফোর্ট গার্ড দেবার জন্যে। তবু দু’-একজন যারা ছিল পেরিন সাহেবের বাগান তদারক করবার জন্য, তাদের আবার ডাক পড়ল। তারা এসে আবার গেট খুলে দিলে। দফতরের দরজা খুলে দিলে।
মরিয়ম বেগমকে কোথায় রাখলে?
হুজুর, যেখানে আগে জেনানারা ছিল, সেখানেই রেখে দিয়েছি।
ওয়াটস্ নিজে তদারক করে এসেছিল। বললে–দরজা বন্ধ করে দিয়ে এসেছি কর্নেল, খুব কাঁদছিল
খুব কাঁদছিল?
ওয়াটস্ বললো কর্নেল, বলছিল আমি মরিয়ম বেগম নই, আমি মরিয়ম বেগম নই–
উমিচাঁদ বললে–তখন থেকেই কেবল বলছে আমি মরিয়ম বেগম নই। ভাবতে পারেনি এমন করে ধরা পড়ে যাবে, তাই ওই বলে ছাড়া পেতে চাইছে ।
ক্লাইভ উমিচাঁদের দিকে চেয়ে বললে–তোমাকে চিনতে পেরেছে নাকি?
উমিচাঁদ বললে–আমাকে কে না চেনে সাহেব। কিন্তু আমি তাতে পরোয়া করি না। আপনি ভয় করতে পারেন, ওয়াটসন ভয় করতে পারেন। আমি হলাম কারবারি লোক, আমি জানি প্রাণের চেয়ে কারবার বড়! আপনাদের সঙ্গে যখন কারবার করতে বসেছি তখন সবকিছু জেনেশুনেই করেছি
ক্লাইভের তবু ভাবনা গেল না। বললে–কিন্তু ওদের খাবার বন্দোবস্ত করেছ?
ওয়াটস্ বললে–ইয়েস কর্নেল, ল্যাসিংটন ছিল, ওকে বলেছি
ডাকো একবার ল্যাসিংটনকে এখানে।
ওয়াটস্ ল্যাসিংটনকে ডেকে আনলে ঘরের ভেতরে। ল্যাসিংটন ভেতরে আসতেই ক্লাইভ জিজ্ঞেস করলে–কী অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছ ওদের খাওয়ার?
ওরা খেতে চাইছে না স্যার, দে আর ক্রাইং। ওরা বলছে ক্লাইভসাহেবকে ডেকে দাও।
উমিচাঁদ বললে–আপনি যানে না সাহেব। একবার ওরা আপনাকে ঠকিয়ে চিঠি চুরি করে নিয়েছিল, এবারও আবার সেই মতলব করেছে
ল্যাসিংটন আবার বললে–ওরা বলছে আপনি নাকি ওদের চেনেন
উমিচাঁদ বললে–নিশ্চয়ই চেনেন সাহেব। খুব ভাল করে চেনেন!
তারপর ক্লাইভের দিকে ফিরে বললেও নিয়ে আর সময় নষ্ট করা উচিত নয় সাহেব, আমাকেও যেতে হবে, আমাকেও যেতে হবে। আমিও সোজা মুর্শিদাবাদ থেকে আসছি, আমাকেও বাড়ি যেতে হবে, অনেক কাজ পড়ে আছে সেখানে
ক্লাইভ ল্যাসিংটনের দিকে চেয়ে বললে–ঠিক আছে, তুমি যাও, ওদের কোনও কথায় কান দিয়ো তুমি, দরজা বন্ধ করে রাখবে সবসময়, দিনরাত পাহারার বন্দোবস্ত করবে
ল্যাসিংটন চলে গেল।
ক্লাইভ উমিচাঁদের দিকে ফিরে বললে–বলল, তুমি কী বলছিলে?
উমিচাঁদ বললে–যা বলবার আমি তাড়াতাড়ি বলব সাহেব। আমি বলেইছি তো আপনাকে যে আমি কারবারি লোক, কাজ ছাড়া আমি আর কিছু বুঝি না। আমি আপনাদের জন্য কী কী কাজ এতদিন করেছি তা আপনারা জানেন। নবাবও জানে, নবাবের জন্য আমি কী কী করেছি। আজ যে চন্দননগর আপনারা দখল করে বসে আছেন, তা আমার জন্যে, একথা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন। আজ যে মিরজাফর সাহেবের সঙ্গে একটা বোঝাঁপড়া হয়েছে তাও এই উমিচাঁদের জন্যে। এও জানেন যে, এই উমিচাঁদ আপনাদের সহায় না হলে আপনারা এই কলকাতায় কলকে পেতেন না। পাততাড়ি গুটিয়ে আবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যেতে হত আর এও জানেন যে, এতদিন যে নবাব রেগে গিয়ে আপনাদের ভিটে-ছাড়া করেনি এও আমার জন্যে!
