শুধু কান্ত কেন, কান্তর মতন আরও অনেক ছোকরাকে বাড়িতে রেখেছে, খাইয়েছে দাইয়েছে আর নিজের মতলব সিদ্ধির স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু এক এক সময় বুড়ো হতাশ হয়ে পড়ে। আর বোধহয় দেখে যেতে পারলে না। হাজি আহম্মদের বংশের পতন দেখা আর বুঝি তার কপালে নেই।
কান্ত বলত–চেষ্টা করছি তো সাহেব, চেষ্টার কসুর নেই
লেকন ওই মরিয়ম বেগমকা সাথ তেরা জান-পছান থা? ও বেগম শালী নবাবকে মদত দেয় কেন?
কান্ত প্রতিবাদ করত–কে বললে–মদত দেয়, সাহেব?
সব্বাই বলে! সবাই তো বলে হাজি আহম্মদের পোতা মরিয়ম বেগমের কথায় নড়ে বসে।
কান্ত বলে–আপনি ভুল শুনেছেন জনাব!
আমি ভুল শুনেছি?
নিজের বার্ধক্যের কথা শুনলেই খেপে যায় সারাফত আলি। নিজে জানে বুড়ো হয়ে গেছে সে, কিন্তু লোকে সেকথা বললেই দোষ। বলে–আমি ভুল শুনেছি? আমার কান কালা হয়ে গেছে? আমি কি বুড়ো হয়ে বেছি বেত্তমিজ? আমি বেওকুফ?
তারপর সেই নেশার ঘোরেই বুড়ো খাস আফগানি ভাষায় গালাগালির বন্যা বইয়ে দেয়। সে-ভাষা কান্ত বুঝতে পারে না। বুঝতে না পারলেও কান্তর রাগ হয় না। বুড়োমানুষের কথায় রাগ করতে নেই। কবে একদু’জন কোন জি আহম্মদ সারাফত আলির চরম সর্বনাশ করে গিয়েছে, সে ঘা তখনও শুকোয়নি। সেই ঘায়ের যন্ত্রণায় তখনও সারাফত আলি ছটফট করে, আর যত ছটফট করে তত আফিম খায়, তত আগরবাতি জ্বালায়, তত তামাক টানে। টানতে টানতে যখন ধোঁয়ার সমস্ত দোকান, সমস্ত স্মৃতি আচ্ছন্ন হয়, তখন আর কাউকে চিনতে পারে না। অন্য লোককেও চিনতে পারে না, নিজেকেও চিনতে পারে না। তখন শুধু ঝাপসা ঝাপসা একটা নাম মনে থাকে। সে হাজি আহম্মদ। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে ভাবে, বুঝি হাজি আহম্মদের কথাই জিজ্ঞেস করছে।
ছোটমশাই বড় মুশকিলে পড়ল। বললে—
এখানে কান্ত বলে কেউ থাকে না?
বাদশা সামনে এগিয়ে এসে বললেনা জনাব, ওনামে কেউ থাকে না এখানে। এ সারাফত আলি সাহেবের খুশবু তেলের দোকান। ইহা খুশবু তেল মিলতি হ্যায়–আপ কৌন?
ছোটমশাই কী করবে বুঝতে পারলে না। এত আশা করে এসেছিল। তবে কি ভুল ঠিকানা শুনেছে। জগৎশেঠজি? আরও অনেক কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল পাশের দোকানেও কোনও হিন্দু ছেলে থাকে কিনা ওই নামে। কিন্তু যেরকম হালচাল তা দেখে আর ভরসা হল না।কয রাত তখন অনেক হয়েছে। ছোটমশাই আস্তে আস্তে সেখান থেকে পা বাড়াল।
*
অবস্থা যত সঙ্গীন হয় ক্লাইভ সাহেবের মাথা তত খোলে। সংসারে এক-একজন লোক থাকে যারা বিপদ ঝঞ্জাট ঝামেলার মধ্যেই নিজের ক্ষমতার প্রকাশ দেখাতে পারে। যত ঝঞ্জাট আসে ততই যেন তারা ঝঞ্ঝাটের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে আনন্দ পায়। মিরজাফর খাঁ-কে একটার পর একটা চিঠি দিয়ে আসছে। কিন্তু অনেক দিন পরে একখানা চিঠি মাত্র এল।
মিরজাফর খাঁ লিখেছে–আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি যদিও নবাবকে কোরান ছুঁয়ে কথা দিয়েছি যে, আমি ইংরেজদের কোনওরকম সাহায্য করব না, কিন্তু আপনি জেনে রাখুন, আপনাদের সঙ্গে যে-সন্ধিপত্রে সই দিয়েছি, এখনও তা স্বীকার করছি। সেইটিই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে উমিচাঁদ এসে হাজির হল।
উমিচাঁদের মুখের চেহারা দেখে ক্লাইভ সাহেবের কেমন যেন সন্দেহ হল। তবু মুখে হাসি এনে বললে–কী খবর, উমিচাঁদসাহেব?
পাশেই ওয়াটস্ সাহেব দাঁড়িয়ে ছিল।
উমিচাঁদ বললে–আপনাদের জন্যে যা করে এলুম, তার জন্যে চিরকাল কোম্পানির সিলেক্ট কমিটি আমাকে মনে করে রাখবে
কী করেছেন?
উমিচাঁদ বললে–এই ওয়াটস্ সাহেবকেই জিজ্ঞেস করুন। আমার নিজের মুখে বললে–সেটা অহংকারের মতো শোনাবে!
ক্লাইভ বললে–তবু আপনি বলুন, আপনাকে আমি এতদিন বিশ্বাস করে সব কথা বলে এসেছি, এখনও বিশ্বাস করছি
উমিচাঁদ সাহেব হেসে উঠল। বড় সর্বনেশে সে হাসি। ক্লাইভ সাহেবের মনে পড়ল, ঠিক এইরকম হাসিই শুনেছিল উমিচাঁদের মুখে যেদিন প্রথম ক্লাইভ সাহেব উমিচাঁদের বাড়িতে গিয়েছিল দরবার করতে।
উমিচাঁদ বললে–আমরা কারবারি মানুষ সাহেব, আমরা বিশ্বাসটিশ্বাস বুঝি না।
তার মানে?
উমিচাঁদ বললে–এখানে এই বজরায় বসে তা বলা যায় না। একটু নিরিবিলি দরকার, আমার হালসিবাগানের বাড়িতে চলুন, একেবারে পাকা বন্দোবস্ত করে ফেলি।
কীসের পাকা বন্দোবস্ত?
বিশ্বাসের।
তবু ক্লাইভ সাহেব কিছু বুঝতে পারলে না।
উমিচাঁদ বললে–যেখানে তোক চলুন, হয় আমার বাড়িতে নয় আপনার পেরিন সাহেবের বাগানবাড়ির দফতরে।
এতক্ষণে কথার মানেটা ক্লাইভ সাহেবের মাথায় ঢুকল। দি স্কাউড্রেল! এইমাত্র বাগানবাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে। সবাইকে আগে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে শুধু একলা চলেছে। ঠিক এই সময়েই আবার ফিরে যেতে হবে! তবু মুখে কিছু বললে–না ক্লাইভ। হাসতে হাসতে শুধু বললে–অল রাইট
ওয়াটস বললে–কিন্তু মরিয়ম বেগমসাহেবার কী হবে কর্নেল?
মরিয়ম বেগম! একটার পর একটা প্রবলেম যেন ক্লাইভকে উন্মাদ করে দেবে। জুন মাসের রাত। একটু পরেই বোধহয় ঝড় বৃষ্টি আসবে। ওদিককার সমস্ত আকাশটা ডার্ক হয়ে গেছে। ক্লাইভ সেই দিকে একবার দেখে নিয়ে বললে–মরিয়ম বেগমের সঙ্গে কে আছে?
একজন বাঁদি! পাছে ধরা পড়ে যায় বলে হিন্দু লেডির ছদ্মবেশে রয়েছে।
বজরার মাঝিমাল্লারা? তারা কোথায়?
